somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শামছুল ইসলাম
নিঃসীম নীল আকাশে পাখী যেমন মনের আনন্দে উড়ে বেড়ায়, কল্পনার ডানায় চড়ে আমিও ভেসে চলেছি মনের আনন্দে--রূঢ় পৃথিবীটাকে পিছনে ফেলে।

আত্মকথন ১০ঃ নিজেরে খুঁজি

০৫ ই জুন, ২০১৬ দুপুর ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৭২ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে, খালাম্মা-ডাক্তার দু’জনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। গত তিনটা দিনের কষ্টগুলো দু’জনে সংসার জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলোর মত ভাগাভাগি করায় সেই কষ্টের মধ্যেও খালাম্মা একটা সুখ খুঁজে পান।কিন্তু এবার আরোক চিন্তা মাথায় ঢুঁকেছে-যদি ইনফেকশন হয়।তাই নিজেই একটা কাগজে সুন্দর করে হাতে লেখে রোগীর দরজায় জুতা খুলে প্রবেশে বার্তা টাঙ্গিয়ে দিলেন। এমনকি ডাক্তার সাহেবকেও সেই নিয়ম মানতে বাধ্য করলেন।ছেলের কখন কি ওষুধ খাবে, তা একটা ডাইরিতে লিখে ফেললেন-কোন এন্টিবায়েটিক যাতে বাদ না যায়। এত বড় একটা ধকল গেল ছেলের উপর দিয়ে,তাই স্যুপ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন হাসপাতালের ডাক্তার।বিদ্যুৎ খেতে চায়না, বিস্বাদ লাগে-মা জোর করে খাওয়ান।
- আর একটু, আর একটু খাও, বাবা।
- না, না।
মা-ছেলের এই দৃশ্যটা ডাক্তার খুব উপভোগ করেন, শিশু বিদ্যুতকেও এভাবেই জোর করে ওর মা দুধ খাওয়াতে।
মার সাথে না পেরে ছেলে বাবার কাছে অনুযোগ জানায়ঃ
-বাবা, আমি সুস্থ হয়ে গেছি না, মাকে একটু মানা কর না!
খালাম্মা কড়া চোখে ডাক্তারের দিকে তাকান।
-তুমি এখনো বেশ দুর্বল, তাই তোমার মার কথা মত খাওয়া-দাওয়া কর।
অবশ্য বন্যা থাকলে পরিবেশটা একটু পাল্টে যায়।
বিদ্যুতকে লক্ষ্য করে বলেঃ
-ভাইয়া, এত ন্যাকামো করিসনা।
তখন বিদ্যুতও সুর পাল্টে ফেলেঃ
-দেখ, আমি তোর বড় ভাই, আমার সাথে ভাল ভাবে কথা বলবি।
-উরে আমার বড় ভাই, মাত্র তো কয় বছরের বড়, তাই এতো।
খালাম্মা দু’জনকেই ধমকে দেন।
এমনি করে এক সপ্তাহ কেঁটে যায়, মেডিকেল থেকে বিদ্যুৎ বাসায় ফেরে।

প্রতিদিন বিকেলে মাঠের কোণায় সাদা টয়োটাটা দেখা যায়, অনেক রাত অবধি গাড়িটা সেখানেই থাকে। একজন অসুস্থ ছেলেকে ঘিরে একটা ভালবাসার জগতে তিন তলার সেই বাসায় চারজন ক্রমশঃই লীন হতে থাকে।

কিন্তু বাস্তবতা মানুষকে আবার কঠিন পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সামনেই বিদ্যুতের এইচএসসি পরীক্ষা, প্রাকটিক্যাল জমা দেওয়া – এই সব ভেবে খালাম্মা ডাক্তারকে বাসায় আসা কমিয়ে দিতে বলে। ডাক্তর এতদিন যে ঘোরের মধ্যে ছিলেন, তা কেঁটে গেল। একটু সুস্থ হয়ে মাসখানেক পর বিদ্যুৎ কলেজে যাতায়াত শুরু করল।

কিন্তু বাসে করে যাতায়াতে ডাক্তারের প্রবল আপত্তি, নিজেই গাড়ি চালিয়ে ছেলেকে কলেজে আনা-নেওয়া করেন। অবশ্য খালাম্মা চাননি, আবার ছেলের দুর্বল শরীরের কথা চিন্তা করে শেষে রাজী হয়েছেন।মাসখানেক ক্লাস চলল, তার পর টেস্টের তারিখ দিয়ে কলেজ বন্ধ।এই মাসখানেক বাবার পাশে বসে কলেজে যাতায়াত করতে করতে বাবা-ছেলের মধ্যে অনেক বিষয়ে কথা হয়, দু’জনের মধ্যে একটা অলিখিত শক্ত বন্ধন গড়ে ওঠে।

বিতর্ক নিয়ে বিদ্যুৎ অনেকটা সময় কাঁটিয়ে ছিল, ভেবে ছিল পরে পুষিয়ে নেবে। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় প্রায় দেড়মাস সময় নষ্ট হয়ে গেল।তাই এইচএসসির ফলাফলটা ওর প্রত্যাশিত হলো না।ফলাফলের পর মা-বাবা খুব উৎসাহ দিলেন ভাল করে প্রস্তুতি নিয়ে প্রকৌশলে ভর্তি হবার জন্য, মেডিকেলে ওর উৎসাহ নেই। পরের কয়েকটা মাস খুব পরিশ্রম করল। কিন্তু বুয়েটে হলো না।
ভাঙ্গা মন নিয়ে যখন ভাবছে কী করবে, তখন বাবাই ওকে দেশের বাইরে আবেদন করতে বলল।কিন্তু ওর এত টাকা কোথায়?তাই মা রাজী না।ডাক্তার বললেন, খরচ তিনি দিবেন।খালাম্মা তাতে রাজী ছিলেননা, আবার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সম্মতি দিলেন। তবে একটি শর্তে, ‘এই টাকা উনি ডাক্তারকে শোধ করে দিবেন, প্রতি মাসে কিছু কিছু করে দিয়ে’।ডাক্তার তার স্ত্রীকে চেনেন, তাই শর্তটা মেনে নিলেন।

আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সব কাগজপত্র এসে গেল।যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হলো।যাওয়ার দিন যতই এগিয়ে আসতে লাগল, খালাম্মার মন ততোই খারাপ হতে লাগল। কিছুদিন আগে একটা দুর্ঘটনায় যখন ছেলেকে হারাতে বসেছিলেন, সেই স্মৃতিগুলো বারে বারে মনে পড়ে – সেই যক্ষের ধনকে আবার হারাতে বসেছেন।তবে ছেলের চোখে-মুখে বাইরে পড়তে যাবার উৎসাহ দেখে মনের কথা মনেই রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন সময়সূচীতে ও যোগ দিবে। তাই শীতের কাপড় নিতে হবে। খালাম্মা বিদ্যুতকে সাথে নিয়ে সেগুলো কিনে দেন, প্রয়োজনীয আরও অনেক কিছুই কিনতে হয়, সেই কেনাকাটায় অনেক সময় ডাক্তারও থাকে।কখনো কখনো কেনাকাটা শেষে নিউমার্কেটের খাওয়ার দোকানেও বসা হয়।

সবকিছু চলছে আপন নিয়মে, শুধু রাতের বেলা খালাম্মার ঘুম কমে গেছে।নিজের অজান্তেই বিছানা ছেড়ে গভীর রাতে ছেলের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ান, ডিম লাইটের আবছা আলোয় ছেলের মুখটা দেখে মনে হয়, দূর কোন দেশের রাজপুত্র শুয়ে আছে, কিন্তু তাকে ছুঁযে দেখতে উনার ভয় হয় – হারানোর ভয়।

যাওয়ার আগের দিন এমনি করে ছেলেকে দেখছেন শেষবারের মত, একটা বিড়াল খাটের নীচ থেকে হঠাত বেরিয়ে দৌড় দিল, উনি চমকে ওঠেন, ড্রেসিং টেবিলের ওপর ঢেঁকে রাখা কাঁচের গ্লাসটায় হাত লেগে গড়িয়ে পড়ে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়, বিদ্যুতের ঘুম ভেঙ্গে যায়।অবাক হয়ে মার দিকে তাকিয়ে থাকে, অস্ফুট কন্ঠে ডাকেঃ
-মা।
খালাম্মা নিজেকে আর সম্বরন করতে পারেননা, এগিয়ে এসে ছেলের মাথার কাছে বসেন,ছেলেকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠেন-হতবিহ্বল বিদ্যুৎ বুঝতে পারে কঠিন শিলার নীচে বয়ে চলেছে স্নেহের অনন্ত ফল্গুধারা !!!!


ঢাকা
০৫ জুন ২০১৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১৬ দুপুর ১২:৫০
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে ফিরে আসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬


সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলে নিতে হয়,
তোমার শরীর জুড়ে যখন
অভিজ্ঞতার গল্প পাঠের আসর,
তখনও ছেলে ভোলানো ছড়ায়
নিজেকে ভোলালে চলে?

আঁজলা ভরে সময়ের যন্ত্রণাকে পান কর,
পান কর সত‍্যকে।
পান কর... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্পত্তি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৪৭

সম্পত্তি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

মায়ের কোলে থাকা অবস্থায়
বাবা ইন্তেকাল করেন।
দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন মা
বাবার অর্জিত কোনো সম্পত্তি ছিল না।
ওয়ারিশ সূত্রে কিছু খণ্ড খণ্ড জমি
এখনও বিদ্যমান বা আছে।
শৈশবে দেখেছি একটি জমিতে
চার-পাঁচটি কদম গাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×