somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া ..... (শেষ পর্ব)

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ৯:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১ম পর্বের লিংক: Click This Link

দু:সময়ে কেউ পাশে থাকলে ভালো হয় । প্রথমেই মনে পড়লো শাকিল ভাইয়ের কথা । উনি তারানার বড় ভাই । কাছেই থাকেন । সব পরিবারেই একজন বটবৃক্ষ থাকেন । উনি এই পরিবারের বটবৃক্ষ । উনার মোবাইলে ফোন দেয় তৌহিদ ।
-হ্যালো, কে?
-আমি, তৌহিদ।
-কী খবর তোমার?
-ভাই, তারানা আজকে দুপুরে ফার্ম গেটে গেছে, তারিকের পুরস্কারটা আনতে
শাকিল ভাই ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
-হ্যাঁ, সেটা তো শুনেছিলাম । এখন খবর কি বল?
-তারানার চারটার মধ্যেই বাসায় ফিরার কথা, কিন্তু এখনো ফিরেনি । আর ওকে মোবাইলেও পাচ্ছি না ।
বোনের চিন্তায় ভাইয়ে গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ,
-তোমরা যে কি করো না! এখন আমি ওকে কোথায় খুঁজবো?
দুপ্রান্তেই কিছুক্ষনের নীরবতা, উত্তরটা জানা নেই কারো ।
ওপ্রান্ত থেকে শাকিল ভাই আবার শুরু করে,
-ঠিক আছে, আমি দেখছি কী করা যায় ।
বড় সম্বন্ধী শাকিল ভাইকে জানানোর পর ছোট সম্বন্ধী সাইফুল ভাইকে ফোন দিল ।
-হ্যালো, সাইফুল ভাইয়ের গলা ।
তৌহিদ সংক্ষেপে তারানার নিখোঁজের সংবাদটা জানালো । সাইফুল ভাইয়ের মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না । খুব সহজ ভাবেই ওকে উপদেশ দিল অপেক্ষা করতে । উনার ধারণা, নিশ্চয়ই কোন পুরনো বান্ধবীর সাথে দেখা হয়ে গেছে, দুজনে গল্পে মশগুল হয়ে আছে, মোবাইলটা হয়তো ব্যাগের মধ্যে বন্ধ হয়ে আছে কোন কারণে । উনি খুব বন্ধু পাগল এই বয়সেও । তাই ব্যাখ্যাটা সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই । কিন্তু তৌহিদ জানে, তারানা এতোটা দায়িত্বহীন নয় । কোন বান্ধবীর সাথে গল্পে মশগুল হওয়ার আগে একটা ফোন করে ওকে জানাতো যে ওর আসতে দেরী হবে ।
তৌহিদ নিজেই নিজেকে বলে,
-এখন তোমাকে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে, কোন ভাবেই মাথা গরম করা যাবে না ।
শাকিল ভাইয়ের কথার সূত্র ধরে তারানাকে খোঁজার বিষয়টা ওর মাথায় এলো । ফার্মগেটে কোচিং সেন্টারের অফিসে স্বশরীরে যাওয়া যায় । ওরা নিশ্চয়ই কিছু বলতে পারবে । কিন্তু মিরপুর থেকে যাবে কিসে? বাসে করে গেলে অনেক দেরী হয়ে যাবে । শাকিল ভাইয়ের থেকে উনার গাড়িটা চাবে? ও কখনো নিজের কাজে চায়নি । উনি নিজেই কোন দাওয়াত থাকলে উনার তিনটা গাড়ির কোন একটা ছোট বোনকে দেন – তারানার নিজে কখনো চায় না । গহনা পরে এই ঢাকা শহরে ভাড়া গাড়িতে করে অতি সাহসী অথবা অতি বোকা ছাড়া কেউ দাওয়াতে যায় না ।
গাড়ির চেয়ে তো মটরসাইকেল হলে ভালো হয়, দ্রুত টান দিয়ে চলে যাওয়া যায় । শরীফের মটরসাইকেল আছে । তুহিনের ভাগ্নী জামাই, কাছেই থাকে । তৌহিদ ওকে ফোন দেয় । প্রথমে কুশল বিনিময়ের পর ওকে তারানার নিখোঁজের খবরটা বলে । শরীফ বাসায় নেই, একটু দূরে কোথাও আছে । তবে শরীফ আশ্বস্ত করে যে ও আসছে ।
তৌহিদ লুঙ্গিটা বদলে দ্রুত একটা প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে নেয় । অপেক্ষা করছে শরীফের জন্য । কিন্তু অপেক্ষার সময় যে এত দীর্ঘ হয় ওর জানা ছিল না । মিনিট পাঁচেকেই ও অস্থির হয়ে ওঠে । শরীফ আসার আগের সময়টা ও কাজে লাগাতে চায় । পাশের ফ্ল্যাটের পাভেল ভাই আর ভাবীকে ব্যাপারটা জানানো উচিত । প্রতিবেশীর সাথে ওদের বেশ খাতির । ভালো-মন্দ কিছু একটা রান্না করলে ভাবী ওদের পাঠাবেই । এরকম নতুন প্রতিবেশী পেয়ে তারানাও বেশ খুশী । ভাবীর সাথে আলাপ করে ওর সময়টাও বেশ ভালোই কাটছে । কলিং বেল টিপে তৌহিদ দাঁড়িয়ে থাকে । পাভেল ভাই দরজা খুলে । তারানার নিখোঁজের খবরটা উনাকে সংক্ষেপে জানায় । তৌহিদ উনার কাছে র‍্যাবের কোন নম্বর আছে কি-না জানতে চায় । উনার কাছে নেই । উনি ভাবীর নাম ধরে ডাক দিলেন । ভাবী এসে সব শুনে তৌহিদকে সান্তনা দিতে লাগলো,
-ভাই, আপনি কোন চিন্তা করেন না, আমি ভাবীকে ফোন করছি ।
তাই তো, অনেকক্ষণ ওকে ফোন করা হয়নি । তৌহিদ বাসায় ফিরে তারানাকে আবারও ফোন দেয় । নাহ, কোন সাড়া নেই । শাকিল ভাইকে ফোন করে ফার্মগেটে যাওয়ার ব্যাপারটা বলার জন্য । উনার বড় ছেলে সাদত ফোন ধরে জানায় যে উনি মাগরিবের নামাজের জন্য বেরিয়ে গেছেন, মোবাইল নেননি ।
-ফুফা, কোন খোঁজ পেলেন?
-না, তবে শরীফকে ফোন করেছিলাম । ওর সাথে মটরসাইকেলে করে কোচিংয়ের অফিসে যাবো ।
-আচ্ছা, ঠিক আছে । কোন খবর পেলে জানাইয়েন, আব্বা খুব অস্থির হয়ে আছে। আমিও ট্রাই করছি ফুফুকে।
-ঠিক আছে, বলে হতাশ হয়ে লাইনটা কেটে দেয় তৌহিদ ।
এর মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেল । রাত আসার সাথে সাথে অমঙ্গল আশংকাটা তৌহিদকে আরো পেয়ে বসে । ওজু ছুটে গিয়ে ছিল । ওজু করে মাগরিবের আজানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে । আ্জ আর মসজিদে যাবে না । কখন শরীফ আসে, কে জানে?
নামাজে দাঁড়িয়েও তারানার কথা মনে পড়ছে । দুরাকাত না তিন রাকাত পড়েছে মনে করতে পারছে না তৌহিদ, সহু সেজদা দিয়ে নামাজ শেষ করলো । আবারও তিন রাকাত ফরজ নামাজের জন্য দাঁড়ালো । এবার দ্বিতীয় রাকাতে বসতে ভুলে গেল । সহু সেজদা দিয়ে নামাজ শেষ করলো । ওর সাধারণত: এমন হয় না । নিজের অজান্তেই ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে । দুহাত তুলে বলছে, “হে আল্লাহ, তোমার এই পাপী বান্দাকে ক্ষমা করে দাও । আর তারানা যেন নিরাপদে বাড়ি ফেরে”।
কোন মতে নামাজটা শেষ করেই তারানাকে ফোন করে । রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে । আহ্, কেউ ধরেনা কেন?
মুক্তিপণ চেয়ে হলেও কেউ ফোনটা ধরুক – তৌফিক আর পারছে না । রিং টা কেটে গেল । আবার ফোন করলো – রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে
-হ্যালো, তারানার কন্ঠ ।
তৌহিদ চুপ করে থাকে । তা্রানার কন্ঠটা যেন পঁচিশ বছর আগের সেই তরুণীর মোলায়েম কন্ঠের মতো লাগছে । বার বার শুনতে ইচ্ছে করছে ।
-হ্যালো, তৌহিদ ।
-হ্যাঁ, বলে সমস্ত টেনশন পানির হেস পাইপের মত গলা দিয়ে বের করে দিল । দিলটা ঠান্ডা এক গ্লাস লাচ্ছা সরবতের মত ঠান্ডা হয়ে গেল ।
একটু থেমে তৌহিদ জানতে চায়,
-তোমার মোবাইলে কী হয়েছিল?
-এখানে নেট ওয়ার্ক ছিল না । আর এরা একটার পর একটা বক্তৃতা দিয়েই গেছে । তাই এতো দেরী ।
-হ্যাঁ, বাঙালি তো মাইক হাতে পেলে আর কারো কথা মনে থাকে না । একটা সিএনজি নিয়ে তাড়াতাড়ি আসো ।
- এক ভাবী আমাকে তাঁর গাড়িতে মিরপুর দশ পর্যন্ত লিফট দিবে । সুতরাং তোমার চিন্তার কিছু নেই ।
- আচ্ছা, রাখি । বলে তৌহিদ ফোন কেটে দেয় ।
ছোট বেলায় ঈদের চাঁদ দেখে যেমন আনন্দ হতো, তৌহিদের তেমন আনন্দ হচ্ছে । ও মোবাইলে সবাইকে তারানার প্রাপ্তি সংবাদটা জানালো ঈদের খুশি নিয়ে ।

.
.
.
রাজপুত্র আর রাজকন্যার গল্পের মতো এখন বলতে হচ্ছে,”অত:পর তারানা-তৌহিদ সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল”। কিন্তু তনু-রূপার মতো হতভাগ্যরা, যাদের পরম কাছের মানুষরা, এখনো শুনতে পায়, “এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না । অনুগ্রহ করে ....”, তাঁদের কথা কি আপনার মনে পড়ে? চোখ দুটোকে কি জলে ভরে ওঠো না? কানে কী বাজে না “এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না । অনুগ্রহ করে ....” ।

(সমাপ্ত)

মো: শামছুল ইসলাম

তাং - ১১/০৯/২০১৭

সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ৯:৫৫
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

লিখেছেন কিরকুট, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সুখ

লিখেছেন সামিয়া, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৬



পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে সুমনের, জিপিএ ৫ পেয়েছে জানার পর পুরো দিনটিই বদলে গিয়েছে ওর আনন্দে।যেন পৃথিবীর সব খুশির দরজা একসঙ্গে খুলে গেছে ওর জীবনে।
ছেলেটা ওর বাবা মায়ের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভেষজ চায়ের সঙ্গে আমার অব্যাহত প্রেম!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৩



ভেষজ চায়ের সঙ্গে আমার অব্যাহত প্রেম!

জীবনে অনেক কিছুই শেষ করেছি- কিন্তু ভেষজ চায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি!
সবুজ চা, লেবু-আদা-তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ-লবঙ্গ, গোলমরিচ, পুদিনা-রোজেলা, জাফরান, জেসমিন থেকে শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×