১ম পর্বের লিংক: Click This Link
দু:সময়ে কেউ পাশে থাকলে ভালো হয় । প্রথমেই মনে পড়লো শাকিল ভাইয়ের কথা । উনি তারানার বড় ভাই । কাছেই থাকেন । সব পরিবারেই একজন বটবৃক্ষ থাকেন । উনি এই পরিবারের বটবৃক্ষ । উনার মোবাইলে ফোন দেয় তৌহিদ ।
-হ্যালো, কে?
-আমি, তৌহিদ।
-কী খবর তোমার?
-ভাই, তারানা আজকে দুপুরে ফার্ম গেটে গেছে, তারিকের পুরস্কারটা আনতে
শাকিল ভাই ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
-হ্যাঁ, সেটা তো শুনেছিলাম । এখন খবর কি বল?
-তারানার চারটার মধ্যেই বাসায় ফিরার কথা, কিন্তু এখনো ফিরেনি । আর ওকে মোবাইলেও পাচ্ছি না ।
বোনের চিন্তায় ভাইয়ে গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ,
-তোমরা যে কি করো না! এখন আমি ওকে কোথায় খুঁজবো?
দুপ্রান্তেই কিছুক্ষনের নীরবতা, উত্তরটা জানা নেই কারো ।
ওপ্রান্ত থেকে শাকিল ভাই আবার শুরু করে,
-ঠিক আছে, আমি দেখছি কী করা যায় ।
বড় সম্বন্ধী শাকিল ভাইকে জানানোর পর ছোট সম্বন্ধী সাইফুল ভাইকে ফোন দিল ।
-হ্যালো, সাইফুল ভাইয়ের গলা ।
তৌহিদ সংক্ষেপে তারানার নিখোঁজের সংবাদটা জানালো । সাইফুল ভাইয়ের মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না । খুব সহজ ভাবেই ওকে উপদেশ দিল অপেক্ষা করতে । উনার ধারণা, নিশ্চয়ই কোন পুরনো বান্ধবীর সাথে দেখা হয়ে গেছে, দুজনে গল্পে মশগুল হয়ে আছে, মোবাইলটা হয়তো ব্যাগের মধ্যে বন্ধ হয়ে আছে কোন কারণে । উনি খুব বন্ধু পাগল এই বয়সেও । তাই ব্যাখ্যাটা সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই । কিন্তু তৌহিদ জানে, তারানা এতোটা দায়িত্বহীন নয় । কোন বান্ধবীর সাথে গল্পে মশগুল হওয়ার আগে একটা ফোন করে ওকে জানাতো যে ওর আসতে দেরী হবে ।
তৌহিদ নিজেই নিজেকে বলে,
-এখন তোমাকে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে, কোন ভাবেই মাথা গরম করা যাবে না ।
শাকিল ভাইয়ের কথার সূত্র ধরে তারানাকে খোঁজার বিষয়টা ওর মাথায় এলো । ফার্মগেটে কোচিং সেন্টারের অফিসে স্বশরীরে যাওয়া যায় । ওরা নিশ্চয়ই কিছু বলতে পারবে । কিন্তু মিরপুর থেকে যাবে কিসে? বাসে করে গেলে অনেক দেরী হয়ে যাবে । শাকিল ভাইয়ের থেকে উনার গাড়িটা চাবে? ও কখনো নিজের কাজে চায়নি । উনি নিজেই কোন দাওয়াত থাকলে উনার তিনটা গাড়ির কোন একটা ছোট বোনকে দেন – তারানার নিজে কখনো চায় না । গহনা পরে এই ঢাকা শহরে ভাড়া গাড়িতে করে অতি সাহসী অথবা অতি বোকা ছাড়া কেউ দাওয়াতে যায় না ।
গাড়ির চেয়ে তো মটরসাইকেল হলে ভালো হয়, দ্রুত টান দিয়ে চলে যাওয়া যায় । শরীফের মটরসাইকেল আছে । তুহিনের ভাগ্নী জামাই, কাছেই থাকে । তৌহিদ ওকে ফোন দেয় । প্রথমে কুশল বিনিময়ের পর ওকে তারানার নিখোঁজের খবরটা বলে । শরীফ বাসায় নেই, একটু দূরে কোথাও আছে । তবে শরীফ আশ্বস্ত করে যে ও আসছে ।
তৌহিদ লুঙ্গিটা বদলে দ্রুত একটা প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে নেয় । অপেক্ষা করছে শরীফের জন্য । কিন্তু অপেক্ষার সময় যে এত দীর্ঘ হয় ওর জানা ছিল না । মিনিট পাঁচেকেই ও অস্থির হয়ে ওঠে । শরীফ আসার আগের সময়টা ও কাজে লাগাতে চায় । পাশের ফ্ল্যাটের পাভেল ভাই আর ভাবীকে ব্যাপারটা জানানো উচিত । প্রতিবেশীর সাথে ওদের বেশ খাতির । ভালো-মন্দ কিছু একটা রান্না করলে ভাবী ওদের পাঠাবেই । এরকম নতুন প্রতিবেশী পেয়ে তারানাও বেশ খুশী । ভাবীর সাথে আলাপ করে ওর সময়টাও বেশ ভালোই কাটছে । কলিং বেল টিপে তৌহিদ দাঁড়িয়ে থাকে । পাভেল ভাই দরজা খুলে । তারানার নিখোঁজের খবরটা উনাকে সংক্ষেপে জানায় । তৌহিদ উনার কাছে র্যাবের কোন নম্বর আছে কি-না জানতে চায় । উনার কাছে নেই । উনি ভাবীর নাম ধরে ডাক দিলেন । ভাবী এসে সব শুনে তৌহিদকে সান্তনা দিতে লাগলো,
-ভাই, আপনি কোন চিন্তা করেন না, আমি ভাবীকে ফোন করছি ।
তাই তো, অনেকক্ষণ ওকে ফোন করা হয়নি । তৌহিদ বাসায় ফিরে তারানাকে আবারও ফোন দেয় । নাহ, কোন সাড়া নেই । শাকিল ভাইকে ফোন করে ফার্মগেটে যাওয়ার ব্যাপারটা বলার জন্য । উনার বড় ছেলে সাদত ফোন ধরে জানায় যে উনি মাগরিবের নামাজের জন্য বেরিয়ে গেছেন, মোবাইল নেননি ।
-ফুফা, কোন খোঁজ পেলেন?
-না, তবে শরীফকে ফোন করেছিলাম । ওর সাথে মটরসাইকেলে করে কোচিংয়ের অফিসে যাবো ।
-আচ্ছা, ঠিক আছে । কোন খবর পেলে জানাইয়েন, আব্বা খুব অস্থির হয়ে আছে। আমিও ট্রাই করছি ফুফুকে।
-ঠিক আছে, বলে হতাশ হয়ে লাইনটা কেটে দেয় তৌহিদ ।
এর মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেল । রাত আসার সাথে সাথে অমঙ্গল আশংকাটা তৌহিদকে আরো পেয়ে বসে । ওজু ছুটে গিয়ে ছিল । ওজু করে মাগরিবের আজানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে । আ্জ আর মসজিদে যাবে না । কখন শরীফ আসে, কে জানে?
নামাজে দাঁড়িয়েও তারানার কথা মনে পড়ছে । দুরাকাত না তিন রাকাত পড়েছে মনে করতে পারছে না তৌহিদ, সহু সেজদা দিয়ে নামাজ শেষ করলো । আবারও তিন রাকাত ফরজ নামাজের জন্য দাঁড়ালো । এবার দ্বিতীয় রাকাতে বসতে ভুলে গেল । সহু সেজদা দিয়ে নামাজ শেষ করলো । ওর সাধারণত: এমন হয় না । নিজের অজান্তেই ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে । দুহাত তুলে বলছে, “হে আল্লাহ, তোমার এই পাপী বান্দাকে ক্ষমা করে দাও । আর তারানা যেন নিরাপদে বাড়ি ফেরে”।
কোন মতে নামাজটা শেষ করেই তারানাকে ফোন করে । রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে । আহ্, কেউ ধরেনা কেন?
মুক্তিপণ চেয়ে হলেও কেউ ফোনটা ধরুক – তৌফিক আর পারছে না । রিং টা কেটে গেল । আবার ফোন করলো – রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে
-হ্যালো, তারানার কন্ঠ ।
তৌহিদ চুপ করে থাকে । তা্রানার কন্ঠটা যেন পঁচিশ বছর আগের সেই তরুণীর মোলায়েম কন্ঠের মতো লাগছে । বার বার শুনতে ইচ্ছে করছে ।
-হ্যালো, তৌহিদ ।
-হ্যাঁ, বলে সমস্ত টেনশন পানির হেস পাইপের মত গলা দিয়ে বের করে দিল । দিলটা ঠান্ডা এক গ্লাস লাচ্ছা সরবতের মত ঠান্ডা হয়ে গেল ।
একটু থেমে তৌহিদ জানতে চায়,
-তোমার মোবাইলে কী হয়েছিল?
-এখানে নেট ওয়ার্ক ছিল না । আর এরা একটার পর একটা বক্তৃতা দিয়েই গেছে । তাই এতো দেরী ।
-হ্যাঁ, বাঙালি তো মাইক হাতে পেলে আর কারো কথা মনে থাকে না । একটা সিএনজি নিয়ে তাড়াতাড়ি আসো ।
- এক ভাবী আমাকে তাঁর গাড়িতে মিরপুর দশ পর্যন্ত লিফট দিবে । সুতরাং তোমার চিন্তার কিছু নেই ।
- আচ্ছা, রাখি । বলে তৌহিদ ফোন কেটে দেয় ।
ছোট বেলায় ঈদের চাঁদ দেখে যেমন আনন্দ হতো, তৌহিদের তেমন আনন্দ হচ্ছে । ও মোবাইলে সবাইকে তারানার প্রাপ্তি সংবাদটা জানালো ঈদের খুশি নিয়ে ।
.
.
.
রাজপুত্র আর রাজকন্যার গল্পের মতো এখন বলতে হচ্ছে,”অত:পর তারানা-তৌহিদ সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল”। কিন্তু তনু-রূপার মতো হতভাগ্যরা, যাদের পরম কাছের মানুষরা, এখনো শুনতে পায়, “এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না । অনুগ্রহ করে ....”, তাঁদের কথা কি আপনার মনে পড়ে? চোখ দুটোকে কি জলে ভরে ওঠো না? কানে কী বাজে না “এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না । অনুগ্রহ করে ....” ।
(সমাপ্ত)
মো: শামছুল ইসলাম
তাং - ১১/০৯/২০১৭
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সকাল ৯:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



