somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শাওন আহমাদ
স্বপ্নপূরণই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়।তাই বলে স্বপ্নকে ত্যাগ করে নয়,তাকে সঙ্গে নিয়ে চলি।ভালো লাগে ভাবতে, আকাশ দেখে মেঘেদের সাথে গল্প পাততে, বৃষ্টি ছুঁয়ে হৃদয় ভেজাতে, কলমের খোঁচায় মনের অব্যক্ত কথাগুলোকে প্রকাশ করতে...

ডিগ্রি যখন বিবেক গিলে খায়!

০৪ ঠা জুন, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একজন মা যখন জানতে পারেন তার গর্ভে নতুন একটি প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, সেদিন থেকেই শুরু হয় তার এক অন্তহীন ত্যাগের সফর। নিজের শরীরের রক্ত, পুষ্টি আর নিঃশ্বাস দিয়ে তিল তিল করে বড় করে তোলেন সন্তানকে। অসহ্য প্রসববেদনা সয়ে যেদিন সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, সেদিন নিজের সব কষ্ট ভুলে হাসেন মা।


এরপর শুরু হয় বিনিদ্র রজনী। সন্তান একটু অসুস্থ হলে মায়ের চোখের পাতা এক হয় না, সন্তান না খেলে মায়ের পেটে দানাপানি রোচে না। নিজের জীবনের সব স্বপ্ন, সব ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে মায়ের একটাই লক্ষ্য থাকে—সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা, সমাজের উঁচুতলায় পৌঁছে দেওয়া।


কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মায়ের এই আজীবন সাধনার শেষ পরিণতি সবসময় মধুর হয় না। যে সন্তানকে উঁচুতলায় পৌঁছে দিতে মা নিজের জীবনের সব সিঁড়ি ভেঙেছেন, সেই উঁচুতলার আলোতে গিয়ে সন্তানরা প্রায়শই ভুলে যায় পেছনের অন্ধকার দিনগুলোর কথা। এই চরম অকৃতজ্ঞতা আর অবহেলার চিত্র যখন আমাদের সামনে আসে, তখন থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে হয়—


আমরা কোন সমাজে বাস করছি? যে সন্তানকে মা নিজের বুক দিয়ে আগলে বড় করলেন, সেই সন্তানরা বড় হয়ে মা-বাবার সাথে কী আচরণ করছে? তথাকথিত 'উচ্চশিক্ষা' আর 'সামাজিক প্রতিষ্ঠা' কি আমাদের ভেতরের ন্যূনতম মানবিকতা আর কৃতজ্ঞতাবোধও কেড়ে নিচ্ছে?

সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বিবেকের দেয়ালে সজোরে এক ধাক্কা দিয়েছে, থমকে দিয়েছে পুরো সমাজকে।


রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে গত ১ জুন রাতে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ। যখন ঘর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, তখন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ এসে দরজা খোলে। ভেতরের দৃশ্যটি ছিল শিউরে ওঠার মতো।


মৃত নুরজাহান বেগমের সন্তানরা কিন্তু সমাজের তথাকথিত 'সফল' ও উঁচুতলার মানুষ।

ছেলেদের একজন সরকারের যুগ্ম সচিব।
আরেকজন দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষক।
অন্য এক ছেলে থাকেন কানাডায়।
এমনকি তার মেয়ের জামাতাও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক।


এই সফল সন্তানদের জন্মদাত্রী মা নিজের ফ্ল্যাটেই চরম অবহেলায় মরে পড়ে রইলেন। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, বৃদ্ধা ওই ফ্ল্যাটে তার মেয়ের সাথেই থাকতেন। কিন্তু তাকে রাখা হয়েছিল সম্পূর্ণ আলাদা, অন্ধকার আর আবর্জনাভরা একটা নোংরা ঘরে। একই ছাদের নিচে থেকেও গত এক সপ্তাহেও মেয়ে বা পরিবারের অন্য কেউ ওই মায়ের কোনো খোঁজ নেননি! ঘরের কোণায় মা কখন মারা গেছেন, কীভাবে মারা গেছেন, তা এই উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা বলতে পারেন না। অবহেলায়, যত্নের অভাবে মারা যাওয়ার পর মায়ের শরীরে পচন ধরেছিল, কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল তার দেহ।


আমরা জিপিএ-৫, বড় বড় ডিগ্রি আর সমাজের উঁচু পদের পেছনে ছুটছি। ভাবছি, সন্তানকে বড় অফিসার বা প্রফেসর বানাতে পারলেই বুঝি জীবন সার্থক। কিন্তু মিরপুরের এই ঘটনা আমাদের চোখ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ড্রয়ারভরতি সার্টিফিকেট আর পকেটভরতি টাকা থাকলেই মানুষ 'মানুষ' হয় না।


যে মা নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো সন্তানদের পেছনে বিলিয়ে দিলেন, জীবনের শেষ বয়সে এসে তার কপালে জুটল বীভৎস অন্ধকার, নোংরা ঘর আর এক সপ্তাহের নিঃসঙ্গ পচন? যে সন্তানরা সমাজের বড় বড় জায়গায় দাঁড়িয়ে নীতিবাক্য শোনান, দেশ চালনার নীতি নির্ধারণ করেন, তাদের নিজেদের মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্যতা বা সময় কোনোটাই ছিল না তাদের। এটা শুধু একজন মায়ের লাশের পচন নয়, এটা আসলে আমাদের সমাজের নৈতিকতার পচন।


মা-বাবা কোনো ফেলে দেওয়ার মতো বস্তু নন যে, বয়স হয়ে গেলে কিংবা প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ঘরের কোণায় আবর্জনার মতো ফেলে রাখা হবে। মনে রাখা দরকার, আজ আমরা আমাদের মা-বাবার সাথে যে আচরণ করছি, আমাদের সন্তানরাও কিন্তু তা দেখছে। প্রকৃতির নিয়ম বড় নির্মম, আজ যা দিচ্ছেন, তা একদিন দ্বিগুণ হয়ে নিজের কাছেই ফেরত আসবে।


আসুন, অন্ধকারের এই গল্পগুলো থেকে আমরা শিক্ষা নিই। আসুন, সুশিক্ষার নামে আমরা যেন কাগজের মানুষ তৈরি না করি, বরং সন্তানদের হৃদয়ে আলো ছড়াতে শেখাই। পৃথিবীর সব মা-বাবা ভালো থাকুক, কোনো মা-বাবাকে যেন জীবনের শেষ দিনগুলোয় এমন নির্মম অবহেলার শিকার হতে না হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ সকাল ১০:৪৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ডায়োজেনিস সিন্ড্রম

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১২:০১



ডায়োজেনিস সিন্ড্রমে আক্রান্ত মানুষের ঘর

আমার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কিছু অদ্ভুত আচরণ দেখে বুঝতে চাচ্ছিলাম যে তার এমন আচরণ কোনো মানসিক সমস্যা কিনা। তার আচরণের বর্ণনা দেই ইন্টারনেটে, আর তখন জানতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-৩০)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১:০৩



সূরাঃ ৩০ রূম, ৩২ নং আয়াতের অনুবাদ-
৩২। যারা নিজেদের দীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে।প্রত্যেক দল নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।

সূরাঃ ৩০ রূম, ২৯ নং... ...বাকিটুকু পড়ুন

হামে শিশুদের মৃত্যুর দায় ডঃ ইউনুস গভার্নমেন্টের

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১:০৪

ইউনিসেফ হামের টিকা কেনার জন্যে গত তত্তবধায়ক সরকার প্রধান ড' ইউনুসকে বারবার অনুরোধ করেছিলো। আমরা এখনো ইউনুস স্যারের উত্তর পাই নাই। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনিসেফকে প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত যেতে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাশূন্যের অন্তহীন দিগন্তে: আগামীর মহাকাশ গবেষণা, মানবসভ্যতা এবং আল কুরআনের বিস্ময়কর দিকনির্দেশনা

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫

মহাশূন্যের অন্তহীন দিগন্তে: আগামীর মহাকাশ গবেষণা, মানবসভ্যতা এবং আল কুরআনের বিস্ময়কর দিকনির্দেশনা

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা:

মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিল তখন সেই বিশাল নীলিমা তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুগে যুগে সারদা দেবী

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯



নদীর নাম রুপসা।
জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায়ও রূপসা নদীর কথা বলেছেন। এই নদীতে স্নান করেছেন- রবীন্দ্রনাথের মা এবং স্ত্রী। বর্ষাকালে রুপসা নদী যেন যৌবনে ফিরে যায়। কি তেজ! কি জলের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×