
আমাদের সমাজে ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার হাজারো অলিখিত সংবিধান রয়েছে। সমাজ আপনাকে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেবে পুরুষত্বের অসংখ্য সমীকরণ ও সূত্র। সেই সূত্রের কোনো একটা যদি ভুলবশত বাদ পড়ে যায়, তবে সমাজের পুরুষত্বের খাতা থেকে আপনার নাম কাটা যেতে এক মুহূর্তও সময় লাগবে না। একটি ছেলে শিশু শৈশব থেকেই পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখতে শুরু করে— একজন পুরুষের পুরুষত্ব টিকিয়ে রাখতে কী কী করতে হবে, আর কী করা ঘোর অপরাধ।
আপনি হয়তো স্বভাবতই নরম ও শান্ত প্রকৃতির একজন মানুষ। অকারণে উচ্চবাচ্য করা বা রাগারাগি করা আপনার ধাতে নেই। আপনি হয়তো গায়ের জোরে কিছু করতে পারেন না। কিংবা সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে ঘরের কাজে হাত লাগান, বাচ্চাদের দেখভাল করেন। ব্যাস, সমাজের চোখে আপনার পুরুষত্ব ততক্ষণে প্রশ্নবিদ্ধ!
আপনার যদি সন্তান না হয়, বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে, স্ত্রীর যদি অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্ক হয়, কোনো কারণে বিয়ে করতে কিছুটা দেরি হয়ে যায় অথবা বাই চয়েস আপনি বিয়ে করেননি— তখন আপনার চারপাশের মানুষ আপনার দিকে আঙুল তুলে ফিসফিসানি শুরু করবে। যেন জীবনের এই স্বাভাবিক উত্থান-পতনগুলোর সাথেও আপনার পুরুষত্ব নামক শব্দটির সরাসরি সংযোগ রয়েছে! শুধু তাই নয়; আপনার হাঁটার ধরন, গলার স্বর, কথা বলার প্যাটার্ন— সবকিছুই এই সমাজে পুরুষত্ব মাপার এক একটি অদৃশ্য মাপকাঠি।
কথায় কথায় সমাজের মানুষ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, ‘পুরুষের এটা করা মানায় না’, ‘ওটা করা সাজে না’। সমাজের চোখে আদর্শ পুরুষ হলো এমন এক সত্তা, যার গ্রিক দেবতাদের মতো পেশিশক্তি থাকবে, যে সিংহের মতো হুংকার দেবে। এমন এক পুরুষ, যার ভয়ে আশেপাশের সবাই তটস্থ থাকবে এবং বউ-বাচ্চা ভয়ে থরথর করে কাঁপবে। সহমর্মিতা বা ভালোবাসার চেয়ে ভয় দেখানোই যেন এখানে পুরুষত্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
সত্যি বলতে, সমাজ পুরুষকে শান্তিতে বসে থাকতে দেখতে পারে না। তাদের প্রত্যাশা— পুরুষ আজীবন কেবল ছুটে বেড়াবে, ঘামে ভিজবে, রক্তাক্ত হবে, পরিবারের ঘানি টানতে টানতে প্রায় পাগল হয়ে যাবে। এই নিরন্তর ছুটতে গিয়ে পুরুষের জুতা ছিঁড়ে যাবে, শার্টের কলার মলিন হয়ে ছিঁড়ে যাবে— আর সমাজ তা দেখে পরম তৃপ্তিতে বলবে, ‘বাহ! কী দারুণ, দেখেছো! বাবারা তো এরকমই হয়, আসল পুরুষ এমনই হয়।’ যেন পুরুষের এটাই একমাত্র জীবন! তাকে সবসময় একটা যন্ত্রের মতো খাটতে হবে, তার কোনো ক্লান্তি থাকতে পারবে না।
কিন্তু আমরা কেন ভুলে যাই যে, পুরুষরাও তো রক্তমাংসের মানুষ! মানুষ তো মানুষের মতোই আচরণ করবে, কেন তাদের সুপার হিউম্যান বা অতিমানব মনে করতে হবে? জীবনের এই বিশাল ভার বইতে গিয়ে একজন পুরুষও তো ক্লান্ত হতে পারে। তার যখন বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাবে, তখন সেও ডুকরে কাঁদবে। পুরুষেরও অসুখ করবে, সে দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে। তারও মন খারাপ হবে, আবেগ-অনুভূতি থাকবে। সে কোনো যন্ত্র নয় যে সবসময় নিখুঁত হবে; জীবনের পথে সেও ভুল করবে এবং বিপদের দিনে সেও একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজবে। পুরুষের এই স্বাভাবিক মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
অথচ, সমাজের মানুষ যেমন এই অদ্ভুত সংজ্ঞাগুলো শেখাতে সদা প্রস্তুত থাকে, তেমনি সমাজের তথাকথিত ‘আসল পুরুষ’রাও নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। পাড়ার মোড়ে, চায়ের আড্ডায় বা বন্ধুদের মজলিশে এরা নিজেদের পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে শোবার ঘরের পারফরম্যান্স নিয়ে অবলীলায় বড়াই করে। বউ পেটানোর কাহিনি তারা এমনভাবে বর্ণনা করে যেন সেটা কোনো যুদ্ধজয়ের গল্প! বাড়ির মানুষ কীভাবে তার কথায় ওঠে আর বসে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন কীভাবে তাকে ‘জি হুজুর’ করে— এসব শুনে মজলিশের অন্য পুরুষেরা বাহবা দিয়ে বলে ওঠে, "এই না হলো পুরুষ!" কী অদ্ভুত না?
দিনশেষে আপনি পুরুষ নাকি নারী, তার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো— আপনি মানুষ হিসেবে কেমন। লিঙ্গ পরিচয়ের অহংকারে ডুবে থাকার আগে, একজন ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। একজন ভালো মানুষ হতে পারলেই আপনি প্রাকৃতিকভাবেই একজন ভালো ছেলে, ভালো স্বামী, ভালো বাবা কিংবা একজন ভালো দাদা হয়ে উঠতে পারবেন।
আপনি যে একজন পুরুষ, সেটা প্রমাণ করার জন্য আপনাকে বউ পেটাতে হবে না, হুংকার দিয়ে কাউকে ভয়ের রাজত্বে বন্দি করতে হবে না, নিজের শার্ট-জুতো ছিঁড়ে রক্তাক্ত হতে হবে না, কিংবা আড্ডায় বসে সস্তা বড়াই করতে হবে না। আপনার মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মানবোধই বলে দেবে আপনি কতটা পরিপূর্ণ। সুপার হিউম্যান হওয়ার মিথ্যা চেষ্টা বাদ দিয়ে, পুরুষ বা নারী হওয়ার আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একজন পুরুষ মানুষের পুরোটা জীবন পুরুষ হওয়ার দৌড়েই শেষ হয়ে যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


