somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শাওন আহমাদ
স্বপ্নপূরণই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়।তাই বলে স্বপ্নকে ত্যাগ করে নয়,তাকে সঙ্গে নিয়ে চলি।ভালো লাগে ভাবতে, আকাশ দেখে মেঘেদের সাথে গল্প পাততে, বৃষ্টি ছুঁয়ে হৃদয় ভেজাতে, কলমের খোঁচায় মনের অব্যক্ত কথাগুলোকে প্রকাশ করতে...

পুরুষরাও মানুষ

২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমাদের সমাজে ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার হাজারো অলিখিত সংবিধান রয়েছে। সমাজ আপনাকে হাতে-কলমে শিখিয়ে দেবে পুরুষত্বের অসংখ্য সমীকরণ ও সূত্র। সেই সূত্রের কোনো একটা যদি ভুলবশত বাদ পড়ে যায়, তবে সমাজের পুরুষত্বের খাতা থেকে আপনার নাম কাটা যেতে এক মুহূর্তও সময় লাগবে না। একটি ছেলে শিশু শৈশব থেকেই পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখতে শুরু করে— একজন পুরুষের পুরুষত্ব টিকিয়ে রাখতে কী কী করতে হবে, আর কী করা ঘোর অপরাধ।

আপনি হয়তো স্বভাবতই নরম ও শান্ত প্রকৃতির একজন মানুষ। অকারণে উচ্চবাচ্য করা বা রাগারাগি করা আপনার ধাতে নেই। আপনি হয়তো গায়ের জোরে কিছু করতে পারেন না। কিংবা সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে ঘরের কাজে হাত লাগান, বাচ্চাদের দেখভাল করেন। ব্যাস, সমাজের চোখে আপনার পুরুষত্ব ততক্ষণে প্রশ্নবিদ্ধ!

আপনার যদি সন্তান না হয়, বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে, স্ত্রীর যদি অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্ক হয়, কোনো কারণে বিয়ে করতে কিছুটা দেরি হয়ে যায় অথবা বাই চয়েস আপনি বিয়ে করেননি— তখন আপনার চারপাশের মানুষ আপনার দিকে আঙুল তুলে ফিসফিসানি শুরু করবে। যেন জীবনের এই স্বাভাবিক উত্থান-পতনগুলোর সাথেও আপনার পুরুষত্ব নামক শব্দটির সরাসরি সংযোগ রয়েছে! শুধু তাই নয়; আপনার হাঁটার ধরন, গলার স্বর, কথা বলার প্যাটার্ন— সবকিছুই এই সমাজে পুরুষত্ব মাপার এক একটি অদৃশ্য মাপকাঠি।

কথায় কথায় সমাজের মানুষ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, ‘পুরুষের এটা করা মানায় না’, ‘ওটা করা সাজে না’। সমাজের চোখে আদর্শ পুরুষ হলো এমন এক সত্তা, যার গ্রিক দেবতাদের মতো পেশিশক্তি থাকবে, যে সিংহের মতো হুংকার দেবে। এমন এক পুরুষ, যার ভয়ে আশেপাশের সবাই তটস্থ থাকবে এবং বউ-বাচ্চা ভয়ে থরথর করে কাঁপবে। সহমর্মিতা বা ভালোবাসার চেয়ে ভয় দেখানোই যেন এখানে পুরুষত্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

সত্যি বলতে, সমাজ পুরুষকে শান্তিতে বসে থাকতে দেখতে পারে না। তাদের প্রত্যাশা— পুরুষ আজীবন কেবল ছুটে বেড়াবে, ঘামে ভিজবে, রক্তাক্ত হবে, পরিবারের ঘানি টানতে টানতে প্রায় পাগল হয়ে যাবে। এই নিরন্তর ছুটতে গিয়ে পুরুষের জুতা ছিঁড়ে যাবে, শার্টের কলার মলিন হয়ে ছিঁড়ে যাবে— আর সমাজ তা দেখে পরম তৃপ্তিতে বলবে, ‘বাহ! কী দারুণ, দেখেছো! বাবারা তো এরকমই হয়, আসল পুরুষ এমনই হয়।’ যেন পুরুষের এটাই একমাত্র জীবন! তাকে সবসময় একটা যন্ত্রের মতো খাটতে হবে, তার কোনো ক্লান্তি থাকতে পারবে না।

কিন্তু আমরা কেন ভুলে যাই যে, পুরুষরাও তো রক্তমাংসের মানুষ! মানুষ তো মানুষের মতোই আচরণ করবে, কেন তাদের সুপার হিউম্যান বা অতিমানব মনে করতে হবে? জীবনের এই বিশাল ভার বইতে গিয়ে একজন পুরুষও তো ক্লান্ত হতে পারে। তার যখন বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাবে, তখন সেও ডুকরে কাঁদবে। পুরুষেরও অসুখ করবে, সে দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে। তারও মন খারাপ হবে, আবেগ-অনুভূতি থাকবে। সে কোনো যন্ত্র নয় যে সবসময় নিখুঁত হবে; জীবনের পথে সেও ভুল করবে এবং বিপদের দিনে সেও একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজবে। পুরুষের এই স্বাভাবিক মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

অথচ, সমাজের মানুষ যেমন এই অদ্ভুত সংজ্ঞাগুলো শেখাতে সদা প্রস্তুত থাকে, তেমনি সমাজের তথাকথিত ‘আসল পুরুষ’রাও নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। পাড়ার মোড়ে, চায়ের আড্ডায় বা বন্ধুদের মজলিশে এরা নিজেদের পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে শোবার ঘরের পারফরম্যান্স নিয়ে অবলীলায় বড়াই করে। বউ পেটানোর কাহিনি তারা এমনভাবে বর্ণনা করে যেন সেটা কোনো যুদ্ধজয়ের গল্প! বাড়ির মানুষ কীভাবে তার কথায় ওঠে আর বসে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন কীভাবে তাকে ‘জি হুজুর’ করে— এসব শুনে মজলিশের অন্য পুরুষেরা বাহবা দিয়ে বলে ওঠে, "এই না হলো পুরুষ!" কী অদ্ভুত না?

দিনশেষে আপনি পুরুষ নাকি নারী, তার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো— আপনি মানুষ হিসেবে কেমন। লিঙ্গ পরিচয়ের অহংকারে ডুবে থাকার আগে, একজন ভালো মানুষ হওয়া জরুরি। একজন ভালো মানুষ হতে পারলেই আপনি প্রাকৃতিকভাবেই একজন ভালো ছেলে, ভালো স্বামী, ভালো বাবা কিংবা একজন ভালো দাদা হয়ে উঠতে পারবেন।

আপনি যে একজন পুরুষ, সেটা প্রমাণ করার জন্য আপনাকে বউ পেটাতে হবে না, হুংকার দিয়ে কাউকে ভয়ের রাজত্বে বন্দি করতে হবে না, নিজের শার্ট-জুতো ছিঁড়ে রক্তাক্ত হতে হবে না, কিংবা আড্ডায় বসে সস্তা বড়াই করতে হবে না। আপনার মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মানবোধই বলে দেবে আপনি কতটা পরিপূর্ণ। সুপার হিউম্যান হওয়ার মিথ্যা চেষ্টা বাদ দিয়ে, পুরুষ বা নারী হওয়ার আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একজন পুরুষ মানুষের পুরোটা জীবন পুরুষ হওয়ার দৌড়েই শেষ হয়ে যায়।

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হযরত ইমাম হোসেনের (রা.) পরিবর্তে ইয়াজিদী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কেন?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৪৯



সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৫ ও ৬৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৫। হে নবি! মু’মিন দিগকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর। তোমাদের মধ্যে কুড়িজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুইশতজনের উপর বিজয়ী হবে।তোমাদের মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ঢাকা দক্ষিণের নতুন সমীকরণ: রাজনৈতিক খেলায় ইশরাক কোথায়?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২

রাজনীতির মাঠে অতি-উৎসাহ কখনো কখনো যে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে, দলবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবের প্রতি বাংলার মানুষের কেন এত ক্ষোভ?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা দূরীকরণে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশটিতে বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। সৌদি আরবই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি প্রবাসীর মৃত্যুদন্ড ও রটানো গুজব

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২

আপনি যে দেশে যাবেন, সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটা আপনার দায়িত্ব।
আমেরিকায় আপনি মদ কিনতে পারবেন। কিন্তু আপনার বয়স অবশ্যই ন্যূনতম ২১ হতে হবে। ইউরোপে হয়তো এই বয়সটা ১৮।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×