ক্রিং-ক্রিং-ক্রিং বেজে উঠলো কয়েকবার। সঙ্গে সঙ্গে শীতের ঢাকনা গরম লেপটা সরায়ে বেরিয়ে আসলো একটা হাত। যেন এর জন্যই প্রস্তুত ছিলো হাতখানি। ওপাশে মেয়েলী কণ্ঠ- হ্যালো! টু-থ্রি-এইট-নাইন-জিরো-ওয়ান? এপাশে বাইশের কোঠার এক যুবক। কণ্ঠ খোলার আগে তার মাথায় ভাবনা ঢোকে। তবে কি রপ্তানী মেলার সেই মেয়েটি?
গত ডিসেম্বরে শেরেবাংলা নগরে রপ্তানী মেলা বসেছিলো। কাউন্টারে টিকিট কাটতে যাচ্ছিলো একটি যুবক। হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখে তার দৃষ্টি স্থির হ'য়ে যায়। মনে মনে ভাবে আর দেখে স্রষ্টার সৃষ্টির মহিমা। আহা! কী অপরূপ রূপ আর দেহের গড়ন!
তারপর যা ঘটে তাই। মেয়েটির পশ্চাদানুসরণ। যতোগুলো স্টলে মেয়েটি ঢোকে সেটাতেই যুবকটি যায়। মাঝে মাঝে মেয়েটির মা'র দৃষ্টি এড়িয়ে তাকে মৃদু টিজও করে। তার এ আচরণ মেয়েটিকে উত্যক্ত করে। কিন্তু সেতো নাছোড়বান্দা। যতোণ মেলা থেকে না বেরোয় তারা ততোণ পশ্চাদানুসরণ চলতেই থাকে। এতে মেয়েটি অপ্রস্তুত হলেও তার মাকে কিছুই জানায় না। গেট থেকে দু'রিক্সা আগে পিছে ছুটলেও নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দু'দিকেই মোড় নেয়। উঠন্ত যৌবনের কিছু শিহরণ ছড়িয়ে রিক্সা দু'টো সেদিনকার মতো আপন গন্তব্যেই পেঁৗছে।
তারপর থেকে ছেলেটি আর স্থির থাকতে পারে না। দেখেছি অনেক- কিন্তু মনের মতো পেয়েছি কয়জন? সাপ্তাহিক বিচিত্রার ব্যক্তিগত এই বিজ্ঞাপনটি তাকে আকৃষ্ট করে। এক সময় বিজ্ঞাপনে কথার মালা সাজিয়ে সেও পাঠিয়ে দেয়- রপ্তানী মেলার সেই ছেলে বলছি, যে তোমাকে সারাণ উত্যক্ত করেছিলো, এক সময় কুটির শিল্প স্টলে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিলো, আর দেখছিলো তোমার অপরূপ রূপ। সত্যিই তোমাকে ভালো লেগেছে। ফোন করবে? যোগাযোগ- 238901।
ভাগ্যক্রমে নির্দিষ্ট সংখ্যার বিচিত্রাটিও রপ্তানী মেলার সেই মেয়ের হাতে পড়ে। মেয়েটি বিজ্ঞাপন পড়ে আর হাসে। ভাবতে ভাবতে এক সময় তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে- দেই শালাকে ঘোল খাইয়ে- খুব মজা হবে।
এদিকে বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর দুপুর থেকে রাত অব্দি যুবকটি বাসায়ই থাকে। আশায় আশায় অনেক রাতও নির্ঘুম কাটিয়ে দেয় সে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রিং মেলে না তার। এক সময় সে প্রায় হাল ছেড়েই দেয়। এমন সময় একদিন মধ্যরাতে বেজে ওঠে- ক্রিং-ক্রিং-ক্রিং। ফোনটিও সে সঙ্গে সঙ্গেই হাতে তোলে। আলাপ হয় শুরু। অনেকক্ষণ চলে সে আলাপ এ কথা, সে কথায়। কিন্তু মেয়েটির মুখ থেকে কিছুতেই বেরোয় না সে যে সেই রপ্তানী মেলারই মেয়ে। ছেলেটি একটু ঘাবড়ে যায়, চিন্তায়ও পড়ে।
এভাবে ফোনের আলাপ চলতে থাকে দিনের পর দিন। মেয়েটি মজা করার প্রয়াসে অগ্রসর হলেও নাছোড়বান্দা যুবকটির প্রশ্নে একদিন বলতে বাধ্য হয় সে-ই সেই রাপ্তানী মেলার মেয়ে। তারপর চলতে থাকে ভালোলাগার কথা। এ ভালোলাগা থেকেই একদিন মনের অজান্তে ভালোবাসার কথাও উভয়প ব'লে ফেলে।
ক্রিং-ক্রিং-ক্রিং। -হ্যালো! শোনো কাল কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে। আর জোড়াজুড়ি করোনা লক্ষ্মীটি। তোমাকে কিন্তু ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। সেই যে রপ্তানী মেলা আর তো দেখা নেই। আসবে কিন্তু! সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিমের গেটে বিকাল ঠিক 4-00 টায়- এই প্রথম মেয়েটির মুখ থেকে হঁ্যা-সূচক উত্তর শুনে ভীষণ উত্তেজিত হয় যুবকটি।
দুপুরে ঘুমাতে যেয়েও মেয়েটি আজ ঘুমুতে পারছে না। শুধুই স্মৃতিতে ভাসছে তার রপ্তানী মেলা আর আপন মনে হাসছে সে। মনে মনে ভাবে- এ হবে তার জীবনের প্রথম অভিসার। নির্দিষ্ট সময়ের আধ ঘন্টা আগেই ভালোভাবে সেজেগুজে বান্ধবীর বাসার নাম ক'রে বাসা থেকে বেরোয় সে।
আজ ফেব্রুয়রির 14 তারিখ। সব কিছুই যেন নতুন লাগছে আজ। প্রকৃতি তার সজীবতায় ভ'রে দিযেছে সব কিছুই। বসন্তেও আগমনে কোকিলও শোনাচ্ছে তার গান। মেয়েটি এ বসন্তেই তার জীবনের নতুন গানে সুর ঝরাতে যাচ্ছে। ডায়েরী ক'রে রাখার ইচ্ছাটাও সে মনে মনে ভাবে ।
হঠাৎ তার অপেক্ষা ও চিন্তাকে উপেক্ষা ক'রে বুলেটের শব্দ গর্জ ওঠে দূরে। সে এক মুহূর্ত চিন্তার অবসর নেয়। এটা কী কিছুক্ষণ আগে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসা সেই মিছিলের উপর গুলীবর্ষণ! তারপর সিদ্ধান্ত স্থির ক'রে রিক্সা ডেকে সোজা বাসার দিকে পথ ধরে। এতাণে রাস্তার লোকজন ছুটোছুটি শুরু ক'রে দিয়েছে।
সন্ধ্যায় মেয়েটি ত্রস্ত-ব্যাকুল কণ্ঠে ডায়ার করে থ্রি-টু-এইট-নাইন-জিরো-ওয়ান! ওপাশে অপরিচিত কণ্ঠের উত্তর- হঁ্যা ও আজ ভার্সিটি থেকে এখনও ফেরেনি। শুনলাম- ভার্সিটিতে নাকি আজ খুব বড়ো মিছিল হয়েছে এবং মিছিলে গুলীবর্ষণ হয়েছে। আমাদেও বাসার সবাই চিন্তায় আছে। আব্বা-আম্মা বেরিয়ে পড়েছে ওর খোঁজে। একরাশ ভাবনার কালো মেঘ ঘিরে ফেলে মেয়েটির মনের আকাশ।
দিন যায়। মাস যায়। বছরও যায়। থ্রি-টু-এইট-নাইন-জিরো-ওয়ান! এরপর এপাশে রপ্তানী মেলার মেয়েটির ফোন ঘুরলেও ওপাশ থেকে কাঙ্ক্ষিত কণ্ঠের উত্তর মেলে না কোনোদিন।
08.02.1984
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




