খবরের কাগজ প্রতিদিন পড়ি। কতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে! শিশু হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা। এরকম পুরুষদের অত্যাচার নিয়ে প্রতিদিনই খবর বেরোয়। হাজার হলেও পুরুষ শাসিত সমাজ। নারীরা নিগৃহীত হয়, অত্যাচারিত হয়, মরে। এরকম প্লট নিয়ে গল্প লেখা যায়। কিন্তু সেতো খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে সবার । সাংবাদিকরা প্রতিনিয়তই লিখছেন। আবার পরকীয়াও একটি দারুণ প্ল্লট গল্পের। কিছুদিন আগে এক লেখিকা এধরনের এক গল্প লিখে তো হট-ফেবারিট হয়ে গেছেন। পক্ষে-বিপক্ষে কতো না মতামত! ভদ্র-মহিলার ভাগ্য আছে বলতে হয়! নামকরা লেখিকা না হয়েও লাইম-লাইটে এসেছেন শুধুমাত্র ঐ গল্পের গুণে।
ভাবছি পুরুষ নির্যাতন নিয়ে লিখি। তাও সম্ভব না। নারীবাদীদের ভয়। এমনিতেই পুরুষ শাসিত সমাজ। এখানে আবার পুরুষ নির্যাতন কী? কিল একটাও মাটিতে পড়বে না তখন। তবে আমাদের সাংবাদিকরা মাঝে মাঝে জানান দেয়। যেমন ধরুন- মীরপুরে স্বামীকে 18 টুকরো করে গুম করে স্ত্রী, মোহাম্মদপুরে নিজের দু'টি শিশু সন্তানকে হত্যা এবং বাড্ডায় বালির নিচে নব-জাতককে জীবন্ত চাপা দেয়া। এসব অবশ্য ধন-সম্পদের লোভ বা পরকীয়াজনিত ছিলো। তবুওটাতো পুরুষ নির্যাতন বা হত্যাতো ছিলো!? কিন্তু পত্রিকার এমন খবর নিয়ে গল্প লিখলে পাবলিক খাবে না। গল্প হতে হবে শৈল্পিক। সেই চিন্তাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না বলেই সমস্যা।
আপাতত একটা সত্য ঘটনা দিয়েই শুরু করি। কবিতার কল্পনা মাথায় খেললেও গল্প আসে না। কবিতায় অল্প কথায় বেশি মেসেজ দেয়া যায়। কিন্তু গল্প অসহ্য! এতো ধৈর্য্য মানুষ পায় কোত্থেকে? কী করে যে এতো বড়ো বড়ো গল্প লেখে!? যাক, বলছিলাম সত্য ঘটনার কথা। ভদ্রলোকের সাথে প্রতিদিনই দেখা হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে গেলে। বিকালে চায়ের আড্ডায়। কিংবা রাতে ঘরে ফেরার সময়। বড়ো কষ্টের জীবন তার। আমাকে বন্ধু ভাবেন ভদ্রলোক। তাই জীবনে কষ্টের কথা, গল্প বলেন। আগে একটু দূরে ছিলো বাসা। কিন্তু সেই সত্য ঘটনার পর আমার পাশেই বাসা নিয়েছে। সেই সূত্রে বন্ধুত্বও হয়েছে। আমিও পেয়ে যাচ্ছি গল্পের প্লট। ভদ্রলোক মাঝে মাঝে অনুরোধ করেন- ভাই আপনি লেখক মানুষ, আমাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখুন। আমি বলি- আমি কবিতা লিখি, বড়োজোর ছোটোগল্প। উপন্যাস আমার দ্বারা হবে না। তবে উপলব্ধি করি তাঁর যে জীবন-সংগ্রাম, দুঃখ-কষ্ট বা বিয়োগান্তক ঘটনা- তা নিয়ে অন্তত 10টি উপন্যাস হয়ে যাবে। শুধুমাত্র সত্যিকারের লেখকদের খোঁজ পাবার অপেক্ষা।
বলছিলাম ভদ্রলোকে আগের বাসার কথা। সেটা ছিলো তাঁর শ্বশুরালয়। তবে ভাড়া দিতেন নিয়মিত। এমন কী শ্বশুরের গোষ্ঠির অনেক বোঝা টানতেন। সাথে রাখতেন এক শ্যালক। সে ঢাকায় কম্পিউটার সায়েন্সে পড়তো। হাত খরচ কোত্থেকে আসতো তাতো আর বুঝে নিতে অসুবিধা হবে না কারো। আরও থাকতো শ্বশুরপক্ষের এক ভাগি্ন। সে পড়তো হোম ইকনোমিক্সে। তার খরচ অবশ্য বাড়ি থেকেই আসতো। তবুও তো আশ্রয় দিয়েছিলেন ভদ্রলোক। পাশেই অবশ্য তাঁর বউয়ের বড়ো ভাই- মানে সম্বন্ধী থাকতো। সে এসবের ঝামেলায় যেতো না সম্বন্ধী । কারণ তার বউয়ের অনীহা। এতোকিছুর পরও ভদ্রলোক শ্বশুরের ঐ বাসায়ই থাকতো। কারণ ভদ্রলোক চাকরি নিয়ে দূরে ট্যুরে যেতো। মাঝে মাঝে বিদেশেও যেতে হতো। তাই বাসার নিরাপত্তা বা বাচ্চাদের দেখাশুনা চিন্তা করে সম্বন্ধীর কাছাকাছিই থাকতো। মানে নিজের খরচে সাধের ঘরজামাই হবার মতো ঘটনা আর কী।
বলছিলাম ভদ্রলোকের দিলদরিয়া হৃদয়ের কথা। নিজের আত্মীয়-স্বজনকেও কম দেননি বা করেননি। ভাই, ভাতিজা বা ভাগিনা অনেককেই মানুষ করেছেন। টাকা দিয়েছেন ব্যবসায় কিংবা নিজের অফিসে চাকরি পর্যন্ত দিয়েছেন। এক ভাগিনাকে তো সব ভাই মিলে সেই ছোটেকাল থেকে মানুষ এবং চাকরি পর্যন্ত জোগাড় করেও দিয়েছেন। বাসায় অনেক লোকের যাতায়াত, অনেক খরচ। কিন্তু তাতে কী? ভদ্রলোকের বউ-ও দেদারছে খরচ করেন। দামী শাড়ি. গহনা, কসমেটিকস, ফাস্টফুড নিয়মিত প্রিয় তার। আর একটা কথা বলে রাখি ভদ্রলোকের বউ দারণ সুন্দরী। মানে চোখে পড়ার মতো। বাচ্চা দু'জন। খুব ছোটো সুখী সংসার তাকে নিয়ে। এক ছেলে বয়স সাড়ে 5 বছর আর এক মেয়ে বয়স আড়াই মাস মাত্র।
হ্যাঁ, বলছিলাম গল্প লিখবো। তবে আজ আর গল্প বোধ হয় লেখা হবে না। হাতে সময় একদম নেই। আর গল্পের মতো এতো বেশি লেখার ধৈর্য্যও কম। তাই চিন্তা করছি আরেকদিন লিখবো। তবে গল্পের প্লট কিন্তু পেয়ে গেছি। ভদ্রলোক বলেছিলেন তাঁর বাসা ছাড়ার কথা, জীবনের দুঃখের কথা। আমিও রেডি হয়ে গেছি সুন্দর বিয়োগান্তক একটা গল্প লিথবো বলে। কিন্তু আজকে তো নয়, আর একদিন। তবে যাবার আগে বিয়োগান্তক ঘটনাটা না জানিয়ে গেলে পাঠকদের সাথে নাফরমানি করা হবে। বলছি শুনুন।
ভদ্রলোকের স্ত্রী হঠাৎ করে ছেড়ে গেছেন তাকে। ফেলে গেছেন আড়াই মাসের দুধের বাচ্চা। আর সাড়ে 5 বছরের ছেলেটিকেও। কোথা থেকে পালিয়ে গেছে? সেই শ্বশুরারয় থেকেই। সাথে করে প্রচুর সোনা-দানা, টাকা-পয়সা। ভদ্রলোক ট্যুরে গিয়েছিলেন তখন। কার সাথে জানেন? ভদ্রলোকের আপন ভাগিনার সাথে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- খোঁজাখুঁজি করনে নি? উত্তরে ভদ্রলোক বললেন- করেছি, তবে যখন ডিভোর্স এবং তাদের কোর্ট ম্যারেজের কাগজ হাতে পেয়েলিাম তখন আর এগুয়নি। মামলা-মোকদ্দমাও করেন নি। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারি, মান-সমআন বিংবা সাংবাদিকদের মুখরোচক কাহিনীর ভয়ে। বললাম কতো বছর আগের ঘটনা? ভদ্রলোক বললেন- 2003 সালের 23 এপ্রিল। এতোদিনে তাঁর প্রাক্তন শ্বশুর বাড়ির লোকেরা মেনে নিয়েছে নতুন জামাইকে। সে ঘরে নাকি নতুন যমজ সন্তান এসেছে। বলালাম- আপনার ছেলে-মেয়ের খবর কী? ভদ্রলোক বললেন- ছেলেকে তো প্রতিদিনই দেখেন। আর মেয়েটিকে আমার বড়ো ভাই পালেন। তাঁর নিজের মেয়ে নেই। খুব আদর করেন। ভদ্রলোকের দু'চোখ সজল হয়ে এলো। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
ভদ্রলোকের সাথে সকালে অফিসে যাবার পথে দেখা হয়। ছেলেটিকে স্কুলে রেখে তিনি প্রতিদিন অফিস করতে যান। দুপুরে তাঁর নতুন বিয়ে করা বউ স্কুল থেকে ছেলেকে নিয়ে আসে আসেন। ভাবতাম -বেশতো, ভদ্রলোক সুখেই আছেন। নিয়মিত অফিস করেন ছেলে-মেয়ে সংসার। নতুন সংসারে ছোট্ট মেয়েটি বেশ ফুটফুটে হয়েছে। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পিছনে যে এত্তো এতো ঘটনা আগে জানতাম না। কারণ আমার বাসার পাশে আসার পরই তাঁর সাথে বন্ধুত্ব। আপনারা পাঠকরাই বলুন- এসব ঘটনা নিয়ে কী গল্প-উপন্যাস লেখা যায়? তাও আবার নারীদের বিপক্ষ কাহিনী নিয়ে! সেই মহিলাকে কী মা-মাতা-ভগি্ন বলা যায়? যে মহিলা এখনও তা নিজের বাচ্চাদের খবর পর্যন্ত নেয় না, এমন কী তার আত্মীয়রাও!।
29.07.2006
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০০৬ ভোর ৪:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



