ছেলেটির নাম জনি। কৈশোর ছেড়ে সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। তাই নব যৌবনের উন্মাদনা তাকেও মাঝে মাঝে আক্রান্ত করে। পরীার ফল বেরুতে এখনও অনেক দেরী। জনি ভাবলো এ ছুটির মাঝে কিছুটা দিন শহরে আমোদ প্রমোদে কাটানো যাবে।
বাসায় তাকে খুব একটা কাজ করতে হতো না। মাঝে মাঝে বাজার করতো আর ভাবীর কাজে সাহায্য করতো। আর সারাটা দিন আনন্দে ঘুরে বেড়াতো। একদিন বাজার করতে বেরিয়েছে। আর অমনি তার চোখে পড়লো একটি মিষ্টি মেয়ে। মেয়েটি তাদের বাসার পাশেই ফরসা গাছ তলায় ফলসা কুড়াচ্ছিলো। যাবার সময় ছেলেটি ও মেয়েটির মাঝে একবার চোখাচোখি হলো। বাজার থেকে আসার সময়ও জনি দেখলো মেয়েটি এখনও ফলসা গাছ তলায় রয়েছে। তাকে দেখে মেয়েটি একভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। জনি এটা দেখে বাসায় ঢুকে পড়লো।
বাসায় গিয়ে জনি তার ভাবীকে ডাকলো এবং জানালা দিয়ে দেখিয়ে ফলসা গাছ তলার মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করলো। সে জানতে পারলো পারলো তার রিয়া। বয়স চৌদ্দ বছরের মতো হবে। মনে হলো কয়েক মাসের মধ্যেই যৌবনের প্রথম ঢল নামবে তার গায়ে। কিন্তু হাত-পা-শরীরে ভালোই বেড়েছে সে। ভাবীকে জনি বললো- ভাবী, ও মেয়েটিকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। ওর সাথে কি ভাব করা যায়? ভাবী বললো- তা কেমন করে হয়? তুমি ভিনদেশী মানুষ। এখানকার ভাড়াটে। আজ আছো কাল নাই। তোমার সাথে ও প্রেম করবে কেন?
এরপর থেকে ছেলেটির বারবার মনে পড়তে লাগলো সেই মেয়েটির কথা। মাঝে মাঝে মেয়েটি ফলসা গাছ তলায় ফলসা কুড়াতে আসতো। আর ছেলেটি অধীর আগ্রহে অপো করতো সেই ণটির জন্য। জানালা দিয়ে তাকিয়ে মেয়েটিকে শুধুই দেখতো। মেয়েটিও তার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নানা ভাবভঙ্গি করতো। আর মেয়েটি বাঁকা চোখে হাসিমুখে ছেলেটির দিকে তাকাতো। সেই থেকেই মেয়েটিকে ছেলেটির ভালো লেগে গেলো।
ছেলেটি ছিলো কালো- শ্যামলা প্রকৃতির। শরীরও ছিলো লিকলিকে। তাই সে ভাবতো তাকে কী কেউ ভালোবাসবে? এরপর ছেলেটি মাঝে মাঝে মেয়েটি সম্বন্ধে ভাবীর কাছে আলাপ করতো। কেমন করে মেয়েটির সাথে গল্প করা যায় তাও ভাবতো। একদিন ভাবীকে বলেই বসলো রিয়ার সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে। ভাবীটিও বেশ রসিক ছিলো। সেও নিজেও প্রেম করে বিয়ে করেছে। তাই পাশের বাসার সুমিকে দিয়ে রিয়াকে ডেকে পাঠালো। কিছুটা আকার ইঙ্গিতে ব্যাপারটা বলেও দিলো। সত্যি সত্যিই দেখা গেলো মেয়েটি সুমির সাথে চলে এসেছে। সেদিন রিয়ার সাথে জনির কোনো আলাপ হলো না। জনি শুধু পাশের কামরা থেকে তিনজনের কথোপকথন শুনছিলো। যাবার সময় মাত্র একবার রিয়া ও জনির চার চোখের মিলন হলো।
এমন করে কিছুদিন কেটে গেলো। এর মধ্যে জনির সাথে রিয়ার আলাপ হয়। প্রথম দিন জনি শুধু বলে- তুমি কোন স্কুলে পড়ো? কোন্ কাশে? তোমরা কয় ভাইবোন? এরকম কথাবার্তা। কিন্তু সরাসরি কখনো বলে না যে তাকে জনির ভালো লেগেছে। হয়তো সুমি মেয়েটিকে এ ধরণের কোনো ঈঙ্গিত দিয়ে থাকবে। মেয়েটি কিন্তু বসে রইলো না। সেও জনি সম্পর্কে সুমি ও ভাবীর কাছে থেকে সব জেনে নেয়। এও জানিয়ে জানিয়ে রাখে তার ভাবীকে জনি যেন পরীার ফল বেরুবার পর তাদের শহরেরই সরকারী কলেজে ভর্তি হয়। মেয়েটি দেখতে মোটামুটি, গায়ের রং ফর্সাই। দেখতে অতোটা ভালো না হলেও জনির খুব ভালো লাগে। এরপর থেকে মেয়েটি মাঝে মাঝে বাসায় আসতো। জনি তাদের বাবাসর গাছের ফলসা মেয়েটিকে পেড়ে এনে খাওয়াতো। মেয়েটিও জনিকে পছন্দ করতো কিনা বোঝা যেতো না। কিন্তু ছেলেটি তাকে সত্যিই পছন্দ করতো। সুমির কাছ থেকে যা শুনতো জনি তাতেই সে উৎফুল্ল হতো। এতে সুমির প্রতিহিংসা হতো কিনা কে জানে! কিন্তু সুমির বয়সও ছিলো প্রেমে পড়ার মতো।
জনির পরীক্ষার ফল বেরুলো। জনি বরাবরই ভালো ছাত্র। সুতরাং পরীক্ষার ফল সবারই মনঃপুত হলো। জনি গ্রামের বাড়িতে চলে এলো। তার স্কুলে গেল সবার সাথে দেখা করতে। এরমধ্যে একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেলো। সুমি জনি ও রীতা সম্পর্কে অন্যান্যদের কাছে বানিয়ে বেশি বলেছিলো কিনা কে জানে! তাতেই পারিপাশ্বর্িক সবাই কানঘুষা করলো- জনি রিয়াকে বিয়ে করার জন্য পাগল। পরিস্থিতি উত্তপ্ত করলো পাড়ার বখাটে ছেলেরা। বাধ্য হয়ে রিয়ার মা জনির ভাবীর কাছে এলো। কিন্তু আসল ঘটনা ও জনির পরীার ভালো রেজাল্টের কথা শুনে রিয়ার বরং খুশী মনেই বাড়ি ফিরলো।
এরপর জনি আবার শহরে ভাবীর কাছে এলো। ভাবলো ভর্তির আগের সময়টা কাটিয়ে যাবে এখানে। আর রিয়ার সাথেও ততোদিনে ভাব জমে যাবে নিশ্চয়। কিন্তু রিয়া আর এদিকে আসতো না তেমন। আসলেও তেমন কথা বলতো না। লোকের ভয়েই কিনা কে জানে! জনি ভাবীর কাছে ঘটে যাওয়া ঘটনা সব শুনলো। তার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু রিয়াকে সে কোনোক্রমেই ভুলতে পারলো না।
এরপর একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটলো। ভাবীর এক বান্ধবী জুলির সাথে জনির আলাপ হলো। সে ছিলো রিয়ার বাসার পাশের মেয়ে। বয়স জনির চেয়েও বেশি। জনি তাই তাকে বড়ো বোন হিসেবে মানলো। জনি ও রিয়ার ব্যপিারটাও জুলি জানলো। জনি জুলির মারফত রিয়ার কাছে একটা চিঠি পাঠালো। চিঠিটা রিয়া পেলো কিনা জনি তা আর জানতে পারেনি।
ইতোমধ্যে জনি কলেজে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু রিয়াদের শহরে নয়। সকলের উৎসাহে রাজধানী শহরের ভালো এক কলেজে। এবার জনির বিদায়ের পালা। কিছুদিন পর তার কলেজ খুলবে। তার ভাবী গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাবেন। জুলি বললো রিয়া তাকে চিঠি লিখতে বলেছে। তার ঠিকানায় রিয়াকে চিঠি দিতে বলে জুলি। অবশ্য রিয়া তাদের বাসায়ও এসেছিলো বিদায়কালে।
ভাবী তার গ্রামের বাড়িতে এলো। এসেই জুলির ঠিকানায় জনি রিয়ার কাছে চিঠি লিখলো। কিন্তু কোনো উত্তর চায়নি চিঠির লেখায়। তার কারণ আগের চিঠির উত্তর সে পায়নি। একটু অভিমান ছিলো তার হৃদয়ে। কিন্তু দেখা গেলো উত্তর ঠিকই এসেছে। রিয়া লিখেছে জনির নামে। চিঠিতে কি লেকা ছিলো জনিই পড়লো শুধু। চিঠিকানা পড়ে ভাবীকে শুধু বললো- যে তাকে ভালোবাসে সে তাকে ঘৃণা করে কিভাবে? কীভাবে যে এটা সম্ভব হলো কিছুই বুঝলো না জনি। জনির বুকে শুধু চাপা-কান্নার হাহাকার বইতে লাগলো। তার প্রথম ভালোবাসার অপমৃত্যু দিনদিন তাকে আরও নিঃস্ব করে দিলো যেন। এরপর কিশোর জনি কাউকে আর প্রেমের চিঠি লেখেনি।
02.11.1981
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



