অফিস থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হবার সময় রাস্তার অপর পাড়ে প্রাইভেট ব্যাংকটি দেখেই রহমান সাহেবের সেই ব্রাঞ্চের ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা রিলেশনশিপ ম্যানেজারের কথা মনে পড়ে গেল। সেইদিনের ছোকরা, লোন লাগবে শোনার সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করে চাচা আপনার বেতনটা জানতে পারি? জানবার পর বিজ্ঞের মত বলে, এই বেতনে বড়জোর দেড় লাখ লোন দিতে পারবে, পাঁচ লাখ কোনভাবেই সম্ভব না! ভাবখানা এমন বাপের বয়সী মানুষটিকে যেন সে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ধার দিচ্ছে!রহমান সাহেব একবার ভাবলেন দেখা করে আসবেন কিনা পরক্ষনেই সেই চিন্তা বাদ দিলেন। সন্ধ্যা সাতটায় নিশ্চয় তিনি কোন ব্যাংকে চাইলেই ঢুকতে পারেন না- একথা ভাবতে ভাবতেই হাটছিলেন, হঠাৎ তাঁর সামনে একটি লোকাল বাস এসে ব্রেক করল। বাসে দাড়ানোর কোন জায়গা নেই তারপরও কনডাক্টর ছেলেটা রামপুরা বাড্ডা বলে বেশ অনেকক্ষণ চিৎকার করল। অন্যদিন হলে রহমান সাহেব ধাক্কাধাক্কি করে ঠিকই বাসে উঠে যেতেন কিন্তু আজ সোজা হাটা দিলেন। বেশ ভালই খিদে পাওয়ায় পরিচিত ছোট্ট হোটেলে বসতে না বসতেই হোটেল বয় প্রতিদিনের মত চা আর পুরি নিয়ে এল। কিন্তু রহমান সাহেব ছেলেটিকে অবাক করে দিয়ে পুরি ফেরত দিয়ে ডাবল ডিমের মোগলাই পরটার অর্ডার দিলেন। শুধু তাই নয় খাওয়া শেষে বেলাল নামের ছেলেটিকে প্রথমবারের মত বখশিস দিলেন দশ টাকা! হোটেল থেকে বের হয়েই সস্তা সিগারেটের বদলে বেশ আয়েশ করে দামী সিগারেট ধরালেন।জিলাপির দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় প্রতিদিন নিজেকে সংবরণ করেন অথচ আজ বড় বড় দুইটা জিলাপিও খেয়ে ফেললেন। এরপর কি মনে করে যেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া আর মেয়ে রিয়ার মোবাইলে একশ টাকা করে রিচার্জ করে দিলেন। দুইজনই নিশ্চয় খুব অবাক হবে কে হুট করে মোবাইলে টাকা ভরে দিল! রাস্তায় জুতা পালিশওয়ালাকে দেখে মনে করার চেষ্টা করলেন তাঁর পরনের জুতো জোড়ার বয়স কত, কিন্তু পারলেন না। কি মনে করে এপেক্সের দোকানে ঢুকে নতুন এক জোড়া জুতো কিনে ফেললেন। এপেক্সের দোকানের ঠিক উপরেই সাইফুরসের অফিস দেখে মনে পড়ে গেল, একমাত্র ছেলে কদিন আগে মায়ের কাছে আইইএলটিএস কোচিং করবার জন্য দশ হাজার টাকা চেয়েছিল। মা এক ধমক দিয়ে ছেলেকে চুপ করে দিয়েছিল, রহমান সাহেবও শুনেও না শোনার ভান করে চুপ করে ছিলেন।আর সেই তিনিই আজকে সাইফুরসের অফিসে গিয়ে ছেলের জন্য আইইএলটিএস কোচিং ফরম নিয়ে আসলেন। তারপর অনেক অনেক দিন পর রাবেয়ার প্রিয় রসমালাইয়ের প্যাকেট নিয়ে সিএনজিতে উঠে পড়লেন- এই বছর প্রথমবারের মত সিএনজি করে অফিস থেকে বাসায় যাচ্ছেন তিনি। তখনও রহমান সাহেব জানেন না বাসায় রাবেয়ার মেজাজ কি পরিমাণ খারাপ হয়ে আছে... রাবেয়া কিছুতেই ভেবেই পাচ্ছে না বুড়ো মানুষটাকে সে কিভাবে বলবে বাড়িওয়ালা আগামী মাস থেকে দুহাজার টাকা বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।
রাতে ঘুমানোর সময় বাসা ভাড়া বেড়ে যাবার দুঃসংবাদটি খুব ভয়ে ভয়ে স্বামীকে জানাল রাবেয়া।কিন্তু রহমান সাহেব তাকে অবাক করে দিয়ে মন খারাপের বদলে বান্দরবান যাবার চারটি বাস টিকেট হাতে দিলেন!
রহমান সাহেবের বাসায় পত্রিকা কিংবা টিভি কোনটিই নেই, তাই সারাদিনে সংসারের হাজারটা ঝামেলায় নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী এই মাস থেকেই সরকারি কর্মচারীদের প্রায় দ্বিগুণ বেতন কার্যকর হবার সুখবরটি রাবেয়ার এখনও পর্যন্ত জানা হয়নি।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




