আমাদের দেশে অবহেলিত শ্রেণী বললেই সর্বপ্রথম আপনার মনে হবে নারী সমাজের কথা। কিন্তু আমার ধারণা আমাদের সমাজে নারীদের চেয়েও বেশী অবহেলিত শ্রেণী হল শিক্ষিত বেকার যুবক! আর সেই বেকার বাবাজী যদি শুধু শিক্ষিত না হয়ে উচ্চ শিক্ষিত বেকার হয় তাহলেতো আর কথাই নেই! তবে আমাকে উচ্চ শিক্ষিত বেকার ক্যাটাগরিতে পুরোপুরি ফেলা যায় কিনা সেই ব্যাপারে সন্দেহ আছে। নাহ্ আপনারা যা ভাবছেন বিষয়টা আসলে সেরকম নয়, আপনারা হয়তোবা ভাবছেন আমি বড়জোর স্বল্পশিক্ষিত বেকার তাই এরকম বলছি কিন্তু আমি আসলে মাস্টার্স পাশ বেকার যদিও আমি ফুলটাইম বেকার নই মাঝে মাঝে অন্যরকম উপায়ে আমার বেশ ভালোই ইনকাম হয়, তাই নিজেকে পুরোপুরি বেকার বলতে কেমন যেন সংকোচ হয়। বিশেষ করে বইমেলার আগে আগে আমার বছরের সবচেয়ে বড় ধান্দাটা হয়! অতি উৎসাহী হয়ে আমাকে আবার আপনারা প্রকাশক ভেবে বসবেন না প্লিজ। থাক রহস্যটা প্রকাশ করেই ফেলি, আজ যেহেতু বেশ কথা বলার মুডে আছি, ওই যে বইমেলার ৩৪৯ নং স্টলে ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা টাক মাথার ভদ্রলোককে দেখতে পাচ্ছেন আপনারা, যিনি খুব হেসে হেসে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন তাঁর বইয়ে, সেই সাথে ভক্ত পাঠকদের সাথে সমানে সেলফি তুলে যাচ্ছেন; এবারের বইমেলায় ওনার মোট চারটি উপন্যাস বের হয়েছে এবং প্রতিটিই বেশ ভাল পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এই চারটি উপন্যাসের তিনটিই উনি নিজে লিখেননি, আমার ধারণা চতুর্থটিও ওনার নিজের লেখা নয় তবে চার নম্বর উপন্যাসের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই কারণ সেই একটি বাদে বাকি তিনটি উপন্যাসই আসলে আমার লেখা! আমার লিখে দেওয়া তিনটি উপন্যাসের মধ্যে দুইটিই আবার বইমেলার দ্বিতীয় সপ্তাহেই দ্বিতীয় মুদ্রণে চলে গেছে, সেই সাথে ওনার পাঠকপ্রিয়তাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। কি বিশ্বাস হচ্ছেনা? আরে মশাই, এই ঢাকা শহরে আমার মত অন্তত আরো হাজার খানেক লেখক আছে যারা অর্থকষ্টে পড়ে নিজের লেখা কবিতা,গল্প,উপন্যাস আরেকজনের নামে বিক্রি করে দেয়! এমনকি আমার পরিচিত চারুকলার বেশ কিছু চিত্রশিল্পীও আছে যাদের আঁকা ছবি দিয়ে অন্য আরেকজন নিয়মিত প্রদর্শনী করে থাকেন সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে...
কিছুক্ষণের জন্য আপনাদের সাথে কথা বলা এবার থামাতে হবে কারণ একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসছে আমার... ট্রুকলারে লেখা আসছে আরিফ দি সাউথ ব্যাংক... আমার ধারণা এই আরিফ মহাশয় কোন জাতীয় দৈনিকে কবিতা ছাপাতে চান, আমি লিখে দিব আর উনি টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে সেই কবিতা কিনে নিয়ে নিজের নামে কোন দৈনিক পত্রিকায় ছাপিয়ে নিবেন.. কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে আজকাল এসব খুব চলছে... সাহিত্যপ্রতিভা দেখিয়ে নাম কুড়ানো! কথা শেষ হলে জানাব আমার ধারণা সত্যি কিনা... আপনাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আরিফ সাহেবের প্রথম কলটি মিসড কল হয়ে গিয়েছে, আবার কল দিচ্ছেন উনি এবার রিসিভ করলাম.....
১...২...৩...৪...৫... প্রায় পাঁচ মিনিট কথা বললাম আরিফ সাহবের সাথে... আমার ধারণা প্রায় সঠিক... একটি ম্যাগাজিনের ঈদ সংখ্যায় উনি প্রেমের কবিতা ছাপাতে চান নিজের নামে... আমার দায়িত্ব খুব সুন্দর একটি প্রেমের কবিতা লিখে ওনার কাছে বিক্রি করা! আজকে আপনাদের সাথে আর কথা বলব না, আরিফ সাহেবের সাথে কথা বলে মুড নষ্ট হয়ে গিয়েছে কারণ উনি মাছের বাজারের মত কবিতা নিয়ে আমার সাথে দর কষাকষি করেছেন.. আমার লেখা প্রেমের কবিতার জন্য উনি তিন হাজার টাকার বেশী এক টাকাও দিতে রাজী নন।
আচ্ছা আমাদের মত লেখকদের সাথে পতিতাদের কি খুব বেশী পার্থক্য আছে, তারা অর্থের বিনিময়ে দেহ বিক্রি করে আর আমরা বিক্রি করি আমাদের সন্তানতুল্য সাহিত্য কর্মকে!
#ছোট_গল্প #টুলেট
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



