somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রূপের ডালি খেলা - (আমার সোভিয়েত শৈশব)

০৯ ই আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৫:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তখন আমরা ভাবতাম যে কারাভান্নায়া রাস্তায় নিশ্চয় ঠুন- ঠুন ঘন্টি বাজিয়ে যায় ক্লান্ত ধূসর উট , ইতালিয়ানাস্কায়া রাস্তায় ইহাকে কালো-চুল ইতালিয়ানরা , আর চুমকুড়ি সাঁকোতে সবাই চুমু খায়। পরে মিলিয়ে গেছে ক্যারাভান আর ইতালিয়ানরা, রাস্তাগুলোর নাম পর্যন্ত এখন অন্য। অবিশ্যি চুমকুড়ি সাঁকোর নামটা এখনো তাই আছে।
আমাদের পাড়ার আঙিনাটা ছিল পাথরের খোয়ায় বাঁধানো। খাওয়া পড়েছিল সমান ভাবে নয়, কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। জোর বৃষ্টি হলে নিচু জায়গাগুলো জলে ভোরে যেত, উঁচু গুলো থাকতো পাথুরে দ্বীপের মতো। জুতো যাতে না ভেজে তার জন্যে আমরা দ্বীপ থেকে দ্বীপে লাফিয়ে লাফিয়ে আসতাম। তাহলে বাড়ি পৌঁছতাম ভেজা পায়েই।


বসন্তের আঙিনাটা ভোরে উঠতো পপলারের ঝাঁঝালো রাজনের গন্ধে , শরতে আপেল। আপিলের গন্ধটা আসতো মাটির টোলের কুঠুরি থেকে , সবজি জমা থাকতো সেখানে। আঙিনাটা আমরা ভারী ভালোবাসতাম। কখনোই একঘেয়ে লাগতো না। এছাড়া অনেক খেলা জানতাম আমরা। খেলতাম লুকোচুরি , ডাংগুলি,বল ছোড়াছুড়ি, ভাঙা টেলিফোন।এসব খেলা আমরা পেয়েছিলাম একটু বড়ো ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে। কিন্তু আমাদের নিজেদের বানানো খেলাও ছিল। যেমন রূপের ডালি খেলা
কার মাথা থেকে এটা বেরিয়েছিল জানি না, তবে আমাদের বেশ মনে ধরেছিলো। পুরোনো পপলার গাছের দলটা জুটলেই নির্ঘাৎ কেউ না কেউ বলে উঠত :
" আয় রূপের ডালি খেলি !"
সবাই দাঁড়াতাম গোল হয়ে , ছড়া বলে পর পর গুনে যেতাম কে মাঝখানে দাঁড়াবে :
' এনা, বেনা , রেস...'
কোনো এক দুর্বোধ্য ভাষার এই কথা গুলো ছিল আমাদের ঠোঁটস্থ :
‘কুইন্তের , কন্তের , জেস!’


কেন জানি আমার সাত নাম্বার ফ্ল্যাটের নিনকাকে মাঝখানে দাঁড় করতে ভালো বাসতাম , চেষ্টা করতাম ছড়াটা গিয়ে ঠিক ওর কাছেই শেষ হয়। চোখ নামিয়ে সে তার ফ্রকে হাত বুলাতো। আগে থেকেই তার জানা থাকতো যে তাকেই মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে রূপসী হয়ে।
এখন আমরা বুঝি যে সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা ছিল অসাধারণ অসুন্দর:
চওড়া খাঁদা নাক ছিল তার, মোটা মোটা ঠোঁট, তার চারিপাশে আর কপালে রুটির গুঁড়োর মতো ছুলি। বিবর্ণ চোখ। সোজা সোজা অঘোম চুল। হাঁটতো পা ঘষে ঘষে , পেটটা সামনে এগিয়ে দিয়ে। কিন্তু এসব আমাদের চোখে পড়তো না। যে ন্যায়পর অজ্ঞতায় আমরা তখন ছিলাম তাতে ভালো মানুষকে ধরা হতো সুন্দর আর খারাপ কে অসুন্দর !

আর সাত নাম্বার ফ্ল্যাটের নিনকা ছিল গুণী মেয়ে , তাকেই আমরা সুন্দরী করতাম।
মাঝখানে গিয়ে ও দাঁড়ালেই খেলার নিয়ম অনুসারে আমাদের 'মুগ্ধ' হতে হত ---
প্রত্যেকেই আমরা প্রশংসা করতাম বইয়ে পড়া কোনো না কোনো কথা দিয়ে।
কেউ বলতো :
'কী সুন্দর গলা , রাজহাঁসের মতো।
' রাজহাঁসের মতো নয় , মোরাল গ্রীবা,' সংশোধন করে দিয়ে আরেকজন খেই টানত,
'কী সুন্দর প্রবালের মতো ঠোঁট ...'
' কী সুন্দর সোনালী চাঁচর। '
' চোখ ওর ইয়ে ... ইয়ে....'
' কেবলি তুই ভুলে যাস ! সাগরের মতো নীল। '

জ্বল জ্বল করে উঠতো নিনকা। ফ্যাকাশে মুখে গাঢ় লাল ছোপ। পেটটা গুটিয়ে নিয়ে সে লীলাময়ীর মতো একটা পা এগিয়ে দিতো। আমাদের কথা গুলো হয়ে উঠতো আয়না, নিনকা তাতে নিজেকে দেখতো সত্যিকারের রূপসী !
' কী সুন্দর চিকন গা। '
'কী সুন্দর বাঁকা ভুরু। '
' ওর দাঁত.... দাঁত....'
'জানিস না ? মুক্তোর মতো দাঁত!'
আমাদের মনে হতে থাকতো সবকিছুই ওর মোরাল, প্রবল, মুক্তোর মতো। আমাদের নিনকার চেয়ে রূপসী আর কেউ নেই।
তারপর আমাদের উচ্ছ্বাসের ঝুলি ফুরিয়ে গেলে নিনকা কিছু একটা গল্প শোনাতো। হেমন্তের ঠান্ডা বাতাসে গা কুঁকড়ে সে বলতো :
'কাল আমি ভাই চান করেছিলাম গরম সাগরে। বেশ রাট হতেই অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠলো সাগর। আমিও জ্বলজ্বল করে উঠলাম। আমি ছিলাম একটা মাছ হয়ে .... না, মাছ নয় , মৎস্য-কন্যা।'


রূপসীরা কি কখনো বলা সাজে যে সে আলুর খোসা ছাড়িয়েছে , অথবা পড়া মুখস্থ করেছে , কিংবা কাপড় কাচতে সাহায্য করেছে মাকে।

'কাছেই হুটুপুটি করছিলো সব ডলফিন। তারাও জ্বল জ্বল করে উঠলো। '
এই সময় কেউ হয়তো আর চুপ করে থাকতে পারতো না। বলতো :
'যা: বাজে কথা ! '
হাত বাড়িয়ে দিতো নিনকা। 'বেশ , শুকে দ্যাখ। গন্ধ পাচ্ছিস ?'
'সাবানের গন্ধ। '
মাথা নাড়তো নিনকা :
' উঁহু, সাগরের গন্ধ! চেটে দ্যাখ হাত -- নোনতা নোনতা। '
চারিপাশে ঘোলাটে স্যাঁতস্যাঁতে অবশ্য, বোঝা যায় না বৃষ্টি হচ্ছে কিনা। শুধু শার্সিতে জাগছে আর ফেটে যাচ্ছে বুদ্বুদ। কিন্তু সবাই আমরা টের পেতাম না - থাকা সমুদ্রটা আছে কাছেই --- উষ্ণ , জ্বল জ্বলে , নোনা।


এই ভাবেই খেলতাম আমরা।
বৃষ্টি নামলে জুটতাম ফটকের তোলে , অন্ধকার হয়ে গেলে ভিড়তাম ল্যাম্পপোস্টের কাছে। এমনকি কড়া শীতেও আমাদের হটাতে পড়তোনা আঙিনা থেকে।

একবার নতুন বাসিন্দা এলো পাড়ায়। আঙিনায় দেখা দিলো নতুন একটি ছেলে।
ঢ্যাঙামতো , হাঁটতো একটু কুঁজো হয়ে , যেন দেখতে চাইতো যে তত ঢ্যাঙা নয়।গালে তার একটা বড়ো লম্বাটে তিল, সেটার জন্যে লজ্জা হতো তার , কথা বলার সময় অন্য গালটা ফিরিয়ে রাখতো আমাদের দিকে। নাকটা তরতর , একেবারে মেয়েলি বড়ো বড়ো চোখের রোঁয়া। চোখের রোঁয়ার জিন্যেও সংকোচ ছিল তার।
আমাদের থেকে দূরে দূরে থাকতো নতুন ছেলেটা। আমরা ওকে রূপের ডালি খেলতে ডাকি। জানতো না খেলাটা কি , রাজি হয়ে যায়। চোখ চাওয়া চাওয়ি করে আমরা ঠিক করে নিলাম রূপসী করবো .... ওকেই। মোরাল গ্রীবা আর প্রবাল ঠোঁটের কথা বলে না বলেই ও ভয়ামক লাল হয়ে পালিয়ে গেল খেলা ছেড়ে।

হেসে উঠে আমরা চেঁচালাম :
'তোকে ছাড়াই আমরা খেলবো !'
কিন্তু ফের যখন গোল হয়ে দাঁড়ালাম , হঠাৎ নিনকা পেছিয়ে এলো :


'আমিও খেলবো না.... '
হৈ-হৈ করে উঠলাম আমরা:
'এ আবার কী কথা ? কেন খেলবি না ?'
'এমনি,' আমাদের কাছ থেকে চলে গেল নিনকা।
সঙ্গে সঙ্গেই খেলার সাধ উবে গেলো আমাদের। বিচ্ছিরি লাগলো। আর নিনকা নতুন ছেলেটার কাছে গিয়ে বললে :
' রুপের ডালি খেলার সময় কেবলি আমায় বাছে।'
'তোকে ? কিন্তু তোকে কেন ? ' অবাক হলো ছেলেটা , ' তুই কি রূপসী নাকি ?'
ছেলেটার সাথে আমরা তর্ক করলাম না। শুধু হাসাহাসি করলাম ওর উদ্দেশ্যে।
আর নিনকার মুখখানা কেমন বসে গেল , মুখ আর কপালের ছুলিগুলো হয়ে উঠলো আরো কটকটে।
'কিন্তু আমাকেই বাছে।'
' খুবই খারাপ করে ,' বললে ছেলেটা ,'তাছাড়া তোদের এই সব ছেলেমানুষী খেলায় আমার আদপেই কোনো শখ নেই। '
'বটেই তো। ' কেন জানি চট করেই তার কোথায় সায় দিলে নিনকা।

নতুন ছেলেটা দেখা দেবার পর থেকে কেমন অদ্ভুত হয়ে উঠলো সে। যেমন, রাস্তায় ছেলেটার পেছু-পেছু যেত সে। যেত চুপি-চুপি, রাস্তার অন্য ধার দিয়ে , যাতে কারো চোখে না পড়ে। তবে আমাদের চোখে পড়েছিল বৈকি। ভাবলাম নিনকার মাথা খারাপ হয়েছে , অথবা কিছু একটা খেলছে। হয়তো গোয়েন্দা - গোয়েন্দা খেলা।
ছেলেটা যেত রুটির দোকানে , ও দাঁড়িয়ে থাকত উল্টো দিকে , দরজার শার্সি থেকে চোখ সরাত না। সকালেও সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত ওর জন্যে, ইশকুল পর্যন্ত যেত তার পেছু-পেছু।
নতুন ছেলেটা প্রথমে টের পায় নি যে সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা তার পেছু-পেছু ফেরে ছায়ার মতো।যখন ধরতে পারল, ভারি চটে গেল সে। ধমক দিলে :
' খবরদার , পেছু-পেছু আসবি না বলছি !'
কোনো জবাব দিলে না নিনকা। ফ্যাকাশে মেরে চলে গেল। আর ছেলেটা তার উদ্দেশ্যে চ্যাঁচালে :
'আয়নায় বরং নিজের মুখখানা একবার দ্যাখ গে যা !'


আয়নায় মুখ দেখতে বললে সে। অথচ কেমন আমাদের নাক , মুখ , থুতনি , কোথায় উঁচিয়ে উঠেছে চুল , ব্রণ বেরিয়েছে -- এসব জানার কোনো আগ্রহই আমাদের ছিল না।
নিনকাও শুধু একটা আয়্নাই জানত, রূপের ডালি খেলার সময় যে-আয়্না হতাম আমরা।
বিশ্বাস করত সে আমাদের। আর গালে তিল-ওয়ালা এই ছোঁড়াটা কিনা ভেঙে দিল আমাদের আয়নাটা।
হাসিখুশি , মায়াময়, জীবন্ত আয়নার বদলে দেখা দিল ঠান্ডা , মসৃণ , নিস্করুণ একটা জিনিস। জীবনে এই প্রথম তাতে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখল নিনকা --- রূপসীকে খুন করলে আয়না। যতবারই আয়নার কাছে গেছে নিনকা, ততবারই কী একটা যেন মরে গেছে তার ভেতর। অদৃশ্য হলো মোরাল গ্রীবা , প্রবল দাঁত, সাগর-নীল চোখ।

তখন কিন্তু সেটা আমরা বুঝি নি। মাথা কুটে মরতাম আমরা -- কী হল ওর ?
নিজেদের সইকে চিনতেই পারলাম না। কেমন পর-পর , দুর্বোধ্য হয়ে উঠল সে। আমরা সরে গেলাম ওর কাছ থেকে। সেও আসতে চাইত না আমাদের কাছে , নীরবে চলে যেত পাশ কাটিয়ে। আর গালে মস্ত তিল-ওয়ালা নতুন ছেলেটা সামনে পড়লে সে প্রায় ছুটেই পালাত।
আমাদের শহরে বৃষ্টি নাম প্রায়ই। কখনো কখনো সারা দিন-রাত ধরে। সবাই তাতে এত অভ্যস্ত যে ভ্রূক্ষেপও করে না। বড়োরা ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটে। ছোটরা এক-একটা ছুট দিয়ে যায় ফটকের এক খিলান থেকে আরেক খিলানে , লাফিয়ে যায় আঙিনার একটা পাথুরে দ্বীপ থেকে আরেকটায়।
জোর বৃষ্টি নেমেছিল সে সন্ধ্যায়। বইছিল হার-কাঁপানে বাতাস। লোকে বললে, শহরের কাছাকাছি কোথায় বান ডেকেছে। তাহলেও ফটকের খিলানের নিচে আমরা রইলাম ঘেঁষাঘেঁষি করে, বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হচ্ছিল না।
সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা কিন্তু দাঁড়িয়ে রইল নতুন ছেলেটার জানলার নিচে। ওখানে ওর দাঁড়িয়ে থাকার দরকার পড়ল কেন ? ছেলেটার ওপর কি ও একচোট নেবে ভাবছে ? নাকি ঠিক করেছে মনে মনে এক হাজার অবধি না গোনা পর্যন্ত বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকবে ? অথবা দুই হাজার। পরনে তার অনেক আগেই খাটো - হয়ে -যাওয়া একটা কোট, মাথায় ওড়না নেই। সোজা সোজা চুলগুলো ভিজে লেপটে গেছে গালের সঙ্গে , তাতে লম্বা দেখাচ্ছে মুখখানা। জমে -যাওয়া দু'বিন্দু জলের মতো জ্বল জ্বল করছে চোখ।

ঝম-ঝম করছে জল নামার পাইপগুলো , চড়বড় শব্দ হচ্ছে জানালায় , ক্যাচঁ-ক্যাচঁ করছে ছাতার চাঁদোয়া। কিন্তু কিছুই দেখছে না নিনকা, কিছুই শুনছে না। টেরও পাচ্ছে না জলের ঠান্ডা ছাট। কী একটা মরিয়া সংকল্পে তন্ময় হয়ে সে দাঁড়িয়েই জানালার নিচে।




ফটক থেকে আমরা ডাকলাম তাকে :
'নিনকা, এখানে চলে আয়! নিনকা!'
এল না সে। বৃষ্টির মধ্যে আমরাই ছুতে এসে হাত ধরলাম : মারা পড়বে যে !
' চলে যা বলছি !' স্রেফ খেঁকিয়েই উঠল আমাদের ওপর।

চলে এলাম আমরা। ওর দিকে পেছন ফিরে দেখতে লাগলাম রাস্তা। ছাতা মাথায় দিয়ে তাড়াতাড়ি করে হাঁটছে লোকে।
মনে হয় যেন ভয়ঙ্কর সব কালো কালো প্যারাশুটে পুরো একদল সৈন্য নেমেছে শহরে।

পরে আমাদের চোখে পড়ল নিনকার মা এসেছে তার কাছে। অনেকখন ধরে মা তাকে চলে আসার জন্যে বোঝালো।
শেষ পর্যন্ত তাকে বৃষ্টি থেকে নিয়ে গেল সদর দরজায়। মিটমিটে আলো জ্বলছিল।
তার দিকে মুখ তুললে নিনকার মা , তাকে বলতে শুনলাম :
' চেয়ে দ্যাখ আমার দিকে। তুই কি ভাবিস , আমি সুন্দরী ?
অবাক হয়ে নিনকা তাকালে মায়ের দিকে , আর নিশ্চয় কিছুই সে দেখতে পলে না।
মা কি কখনো সুন্দরী হতে পারে , কিংবা অসুন্দরী ?


'জানি না,' কবুল করলে নিনকা।
' এত দিনে তোর জানা উচিত ছিল ,' রূঢ়ভাবে বললে নিনকার মা , ' আমি মোটেই সুন্দরী নই , স্রেফ কুৎসিত। '
'না, না !' বলে উঠল নিনকা।
মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সে কেঁদে ফেললে। আমরা বুঝতে পারলাম না কার জন্যে ওর কষ্ট , মায়ের জন্যে না নিজের জন্যে।
'সেটা কী এমন ভয়ঙ্কর ব্যাপার ? কিছুই না ,' এবার শান্ত গলায় বললে নিনকার মা , ' কেবল সুন্দরীরাই সুখী হয় এমন নয়।অসুন্দরীরও বিয়ে হয়। '

' বিয়ে আমি করবো না!'রেগে জবাব দিলে নিনকা। এ ব্যাপারে আমরাও ওর সঙ্গে একমত।
' হ্যাঁ , হ্যাঁ , সে তো বটেই ,' যেন সচেতন হয়ে উঠলো মা , ' বিয়ে করতেই হবে এমন কী কথা আছে....'
তারপর বৃষ্টি মতে নিয়ে ওরা চলে গেল রাস্তার দিকে।
নিজেরা কোনো বলা-কওয়া না করেই আমরাও পিছু নিলাম , কৌতূহলের বসে আর কি।
না , আমাদের মনে হল আমাদের হয়ত দরকার পড়বে নিনকার।

হঠাৎ আমাদের কানে এল নিনকা জিজ্ঞেস করছে :
' তোমার বর ছিল?'
'না।'
'কিন্তু আমার বাবা তো কেউ ছিল ?'
মা জবাব দিলে না। যেন তার কানেই যায় নি প্রশ্নটা। রেগে গিয়ে নিনকা বেশ রুঢ়ভাবেই বললে :
' বলতে চাও আমায় বকের কাছ থেকে পেয়েছ?'
'হ্যাঁ রে , ' চাপা ফিস-ফিস করলে মা , ' বক উড়ে এল তোকে নিয়ে। তারপর উড়ে গেল। তুই রয়ে গেলি। '

যাচ্ছিল তারা অন্ধকার গলি দিয়ে , ছাতা ছিল না। কিন্তু কিছুই যেন তাতে এসে যায় না ওদের।
বৃষ্টি পড়ছে , পড়ুক। অথচ ভেজা ঠান্ডায় কাঁপছিলাম আমরা।

' তার মানে বক আমার বাবা ?' সামান্য হেসে বললে নিনকা, ' চমৎকার ! আমি যখন মাস্টারনী হব, তখন আমায় লোকে ডাকবে নিনা বক-কন্যা। কে জানে , ডানাও গজাতে পারে আমার।
তুমি যদি আমায় বাঁধাকপির মধ্যে কুড়িয়ে পেতে, তাহলে কত খারাপ হত দ্যাখো তো। '
'হাসি রাখ', মা বললে।
'মোটেই আমি হাসছি না। ' সত্যিই তখন হাসছিলো না নিনকা , গলা ওর কাঁপছিল, ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। ' কিন্তু কোথায় সে... বক ? '
মা মুখ ঘুরিয়ে বৃষ্টির জল মুছে নিলে গাল থেকে।
' সেও দেখতে কুৎসিত ছিল ?'


নিনকা থেমে গিয়ে জোরে মায়ের বাহুপাশ চেপে ধরে তাকালে তার মুখের দিকে।
এমনভাবে সে মায়ের দিকে দেখছিল যেন কী একটা ভুল হয়ে গেছে , তার পাশে -পাশে যে হাঁটছে সে যেন তার মা নয় , অচেনা কোনো মেয়ে।
মাকে যেন সে দেখছে এক ঠান্ডা নিষ্করুণ আয়নায়। ঠিক যেমনটি , তেমন। বাড়ির অন্ধকার দেয়াল ঘেঁষে আমরা , পরের ছেলেমেয়েরা তাকে যেমন দেখছি। ওদের কাছ থেকে আমরা এত কাছে ছিলাম যে সাবান আর জীর্ণ পোশাকের গন্ধ পর্যন্ত টের পাচ্ছিলাম।

আর আমাদের না দেখলেও সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা যেন আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়েই একেবারেই অন্যরকম গলায় শান্তভাবে বললে :
' এসো মা, তোমার সঙ্গে রূপের ডালি খেলি। '
' ঢঙ রাখ !'
'না, না, মা, এসো খেলি। আমি তোমায় শিখিয়ে দেব।' এসো মা, তোমার সঙ্গে রূপের ডালি খেলি। '
' ঢঙ রাখ !'
'না, না, মা, এসো খেলি। আমি তোমায় শিখিয়ে দেব।তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনো আমি যা বলছি। '
আরো জোরে সে মায়ের হাত চেপে ধরে আস্তে -আস্তে শুধু ঠোঁট দিয়েই আমাদের খেলার সেই কথাগুলো বলতে লাগলো, নতুন ছেলেটা আসার আগে যা আমরা তাকে শোনাতাম :


'মা , তোমার কী সুন্দর মরাল গ্রীবা , বড়ো বড়ো চোখ তোমার সাগরের মতো নীল।
কী সুন্দর তোমার লম্বা সোনালী চুল , প্রবালের মতো ঠোঁট....'


অদৃশ্য মেঘ থেকে অঝোরে বৃষ্টি নামল। পায়ের তোলে জেগে উঠল তুহিন সমুদ্র।
শহরের সবকিছু লোহা আর তিন বাজছিল ঝম-ঝম শব্দে। কিন্তু বাতাসের গর্জন , শেষ হেমন্তের কনকনে শীত আর অন্ধকার ভেদ করে জীবন্ত উষ্ণ ধারায় বয়ে চলল দুঃখ-হরা কথার স্রোত :

'কী সুন্দর তোমার চিকন গা... বাঁকা ভুরু.... মুক্তোর মতো দাঁত...'


গায়ে গা ঘেঁষে তারা এগিয়ে চলল সামনে। কথা আর কিছু বলছিল না। তারা তখন শান্ত হয়ে এসেছে।
আমাদের বানানো খেলায় উপকার হয়েছে ওদের।
এনা, বেনা , রেস... এর ওর আস্তিন ধরে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম দেয়াল ঘেঁষে ,
চেয়ে রইলাম অন্ধকার কুহেলীতে তারা মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত। কুইন্তের , কন্তের , জেস …


সাত নম্বর ফ্ল্যাটের নিনকা মারা যায় ১৯৪২ সালে মগার কাছে ফ্রন্টে। নার্স ছিল সে।










আমার কথা :
ছোটবেলায় পড়া ছোট কিন্তু বিশাল একটা গল্প।বলা যেতে পারে , এটা আমার পড়া সেরা একটা গল্প। গল্পই কি শুধু ???
কারো না কারো কোথাও এই বইটি মনে হয় কারো কাছে এখনো অমলিন।
খুব ছোট্টবেলার শৈশব টা আঁকড়ে ধরে পরে আছি। আমার সোভিয়েত শৈশব।
অমলিন ভালোবাসা ছড়িয়ে যাক।

আরো সোভিয়েত শৈশব :
১। সাত বন্ধু ইয়ুসিকের - ( আমার সোভিয়েত শৈশব )
২।রূপের ডালি খেলা - (আমার সোভিয়েত শৈশব)
৩। জ্যান্ত টুপি (আমার সোভিয়েত শৈশব)
৪।সভ্য হওয়া - (আমার সোভিয়েত শৈশব)
৫। মালপত্র (আমার সোভিয়েত শৈশব)
৬।শেয়ালের চালাকি ১ (আমার সোভিয়েত শৈশব)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:০২
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সত্যিই কি দারিদ্র্য মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৬ শে মে, ২০২২ সকাল ৯:২৩


মাত্র আট বছর বয়সে কবি নজরুলের পিতৃবিয়োগ ঘটে। ওনার মা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এটা কবি মেনে নিতে পারেন নি। মায়ের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
শুরু হয় কঠিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রামের সুন্দর মুহুর্তগুলো।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৬ শে মে, ২০২২ সকাল ১০:১০

গ্রাম্য শিশু বালিকা বেশে।


শিশুটির বয়স খুবই কম। কিন্তু সে মোবাইল চালনায় বিশেষ পারদর্শী। সাজুগুজুর কথা বললে তো কথায় নেই; প্রথম কাজ হলো ঠোঁটে লিপিস্টিক দেওয়া এবং বিশেষ ভঙ্গিমায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহা!! ই-পাসপোর্ট !!

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৬ শে মে, ২০২২ সকাল ১০:৫২



আমার সর্বশেষ এমআরপি পাসপোর্টটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ই ডিসেম্বর ২০১৭ইং তারিখে।
তারপরে নানার কারণে (মূলত আলসেমী ও প্রয়োজন না থাকা এবং শেষে করনার উসিলায়) আর পাসপোর্ট তৈরি করা হয়নি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাছ তেল বেগুনি : একটি জীবনঘনিষ্ঠ গল্প

লিখেছেন বিবাগী শাকিল, ২৬ শে মে, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:১০



“আপনি কে?”
প্রশ্নটি যে করেছে, তাকে আমার কাছে মনে হলো বিশ-বাইশ বছরের তরুণী। তার পরনে বহুল ব্যবহৃত মলিন শাড়ি। মাথায় লম্বা ঘোমটা। ঠিকমতো কপালও দেখা যাচ্ছে না। কথা বলছে কীরকম আড়ষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৭৮টি মালটি-নিক থেকে কি কারণে ব্লগার চাঁদগাজীর উপর আক্রমণ চালানো হয়েছিলো?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৬ শে মে, ২০২২ রাত ৯:৪৫



কয়েক'শ মালটি-নিক বানায়ে ব্লগার চাঁদগাজীকে আক্রমণ করা হয়েছিলো; কি কারণে আক্রমণ চালানো হয়েছিলো, ব্লগার চাঁদগাজী ব্লগে দিনরাত বসে কি করছিলেন?

ব্লগটিম বলেছেন যে, তাঁরা এসব মালটি-নিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×