somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাবাদের গল্প......

২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবি: গুগল

১.
২০১৪ সালে আব্বার হার্নিয়া অপারেশন হয়।খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেছিলো।ভয়াবহ অসুস্থতার সময় বেশ কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি, বেশ কিছু অনুভূতির জেগেছে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে কাটানো রাত গুলোতে!
বাঁচা মরা সন্ধিক্ষণে যখন বন্ডে সাইন করতে হচ্ছে ছেলে হিসেবে তখন হাত থেকে কলম পড়ে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটলো। রতন দা পিঠে হাত দিয়ে বললো, মানসিকভাবে প্রস্তুত হও!

দুঃসময়ে অনেকমানুষের মধ্যে একা মনে হয়েছিলো সে সময়। ধরে নিয়েছিলাম ভয়াবহ দুঃসংবাদ নিয়ে ভেড়ামারা ফিরে যেতে হবে। অবশেষে আব্বা আল্লাহর অশেষ রহমতে বাড়ি ফিরে আসেন।

হাসপাতালে বিভিন্ন রকমের রুগীর আনাগোনা ছিলো। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ, বিচিত্র মানুষ, বিচিত্র অসুখ।

এক দাঁড়িওয়ালা মুরুব্বী রুগী ভর্তি হলো রাত বারোটার দিকে। একপাশ সম্ভবত পরে গেছে। রাত চারটার দিকে উঠে বলতে লাগলো , "আমারে অজু করায় দাও! আজান দিবো।" ফরজের ওয়াক্তে একহাত কানের কাছে দিয়ে তিনি অতি কষ্টে আজান দিলেন। আমি করিডোরে দাঁড়িয়ে আজান শুনছি। আজান শেষ হলে ওয়ার্ডে ঢুকে দেখি তাঁর চোখে পানি। বুড়ো মানুষটার বয়স ৭০। তিনি ৫০ বছর ধরে আজান দেন।

আমার আব্বা ঘোরের মধ্যে ক্লাস নেন। আমি চুপচাপ বসে বসে শুনি! ভালোই লাগে, গিয়াস কি ক্লাসে গ্যাছে? ভগবানের স্কুলের রেজাল্ট তো ভালো না।
তিনি আছেন স্কুল নিয়ে শিক্ষা নিয়ে। তাঁর চোখেও পানি দেখা যায়।

৫০ বছর আজান দেয়া মুরুব্বীর চোখের পানি আর ৪০ হেডস্যারের দায়িত্ব পালন করা চোখের পানিই এক। কোথাও কোন আনন্দ লুকিয়ে আছে কিংবা কোথাও কোন আক্ষেপ। নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের আনন্দজল অথবা... থাক, সবকিছু বলতে হয় না।


২। ১৮ই নভেম্বর ১৯৮৮ সালের জন্মদিনের ছবি। আমাদের সেই মাটির ঘর। রাতে রেডিওতে বাংলা নাটক আর আমার অসংখ্য রাশিয়ান বইয়ের দিনগুলি। পিছের মাটির দেয়ালে জন্মদিনের ডেকোরেশন দেখা যাচ্ছে । হ্যাপি বার্থডের আর্ট ওয়ার্কটা মেজচাচা করে দিয়েছিলেন। শৈশবের মূহুর্ত গুলো একেকটা গল্প । ছবিটা দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম , আমার ছেলেটা মাঝে মাঝে আমার মতোই তাকায়। ঐ চোখেরো একটা গল্প আছে । সেই গল্প বাবু বড় হয়ে নিজেই লিখবে।



৩.
১৯৯৬ সালের মে মাসের ৩ তারিখের ছবি। ছবিতে আম্মা আর আব্বা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে । আম্মার চুল ছোট। না আসলে ছোট করে কাটা নয়। ক্যামোথ্যারাপির পর চুল ফেলে দেয়া হয়েছিল। চুল বড় হতে শুরু করেছে কেবল। একজন ক্যান্সার রুগীর মুখে হাসি। হাসিমুখে পাশে দাঁড়িয়ে আব্বা।
এই ছবির একটা গল্প আছে। হার না মানার গল্প । ক্যান্সার সারভাইবের গল্প । পাশে থাকার গল্প । জীবন যুদ্ধের গল্প । শিক্ষক আন্দোলনের গল্প । হাসিমুখের গল্প । কিংবা চেপে রাখা ভীষণ আক্ষেপের গল্প । হাসির মুখের আড়ালে লুকানো অনেক কিছু । যা কখনোই আমারা দেখতে পাইনি। অনেক বছর কেটে গেছে ।
আব্বা সুস্থ থাকলে হয়তো প্রতিদিনের মত আজকেও আম্মার ঘুম ভাঙতো আব্বার বানানো চায়ে। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপেও গল্প থাকে। গল্প থাকে খটমটা টোস্ট বিস্কুটে।

সেই সব গল্প পরে হবে। গুছিয়ে বলবো একদিন।
আমরা ভাইবোনেরা সবাই বড় হয়ে যাচ্ছি বলে তাঁরাও বুড়ো হচ্ছেন । আমরা বড় না হলে তাঁরাও হয়তো বুড়ো হতেন না।


৫.
খুব সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়। রাশান রাজপুত্র সচরাচর ঘুমিয়ে থাকে। আজ দেখি জেগে গেল। আমি তখন রেডি হচ্ছি ।দেখে বলে, ' বাআআপ' । আমি বলি, 'অফিস যাচ্ছি বাবা। ' আমাকে ইশারায় ডাকে আদর করার জন্য। আমি বলি, 'তোমার জন্য কি আনতে হবে?' রাজপুত্র উত্তর দেয়, 'ডিম!' আমি অবাক হয়ে হাসি । ওর মা হাসে।

বাসা থেকে নামতে নামতে ইচ্ছে হলো পৃথিবীর সমস্ত ডিম কিনে ফেলি কিংবা একটা মুরগীর খামার দেই। বাবারা কি এভাবেই ভাবেন? প্রতিদিন যেন একেকটা গল্প তৈরী হয়। বাবাদেরও তো গল্প থাকে কারণ বাবারাও তো একদিন ছোট ছিল!


৬.
রেল লাইন পাড় হয়ে বাবার হাত ধরে বাড়ির পথে যাচ্ছে ছেলেটি। ছোট্ট ছেলের মুখে অনেক প্রশ্ন। একের পর এক বাবাকে প্রশ্ন করে। বাবাও আগ্রহ নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়।ইচ্ছে করলেই তারা রিকশা নিতে পারে , কিন্তু ছেলেটা নেবে না। হেঁটে গেলে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাবে , সময় পাওয়া যাবে। ছেলেটি বাবাকে জিজ্ঞেস করে , ''আচ্ছা বাবা সবাই ভালো হয় না কেন ?'' বাবা চুপ করে থেকে ছেলে উল্টা প্রশ্ন করেন , ''আচ্ছা তুমিই বলো - সবাই খারাপ হয় না কেন ?''
প্রশ্ন শুনে ছেলেটি বাবার মুখের দিকে তাকায়। বাবা মিটিমিটি হাসেন। ছেলেটি ভাবে , থাক। আরেকটু বড় হলে ঠিক জেনে যাবে। তখন এই উত্তর বাবাকে দেবে।

আঁধার নেমে আসছে ,অন্ধকার হচ্ছে চারপাশ। রাস্তার শেষ প্রান্তের বাড়িতে আলো জ্বলে উঠলো , আলোকিত হয়ে উঠলো । এটা ওদের বাড়ি। অন্ধকারেই আলো চেনা যায়।

ছেলেটা বাবার মুখের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসে। উত্তরটা সম্ভবত সে পেয়ে গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২৭
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেল পাকলে কাকের কী?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২৫ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:১৫

বন্ধু বান্ধব বিয়ে করছে। কিন্তু তাদের মনে অনেক দুঃখ। কত আশা ছিল সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করবে অথচ জুটছে মোটা, কালো সব মেয়ে। বর্ণবৈষম্য হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। তবে এটা কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্র রাজনিতি বন্ধ করতে হবে। বিশ্বের সভ্য কোন দেশেই ছাত্রদের লাঠিয়াল বাহিনি হিসেবে ব্যবহার করেনা।

লিখেছেন নতুন, ২৫ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:২৭



দেশের ভবিষ্যত নেতা তৌরির কারখানা হিসেবে অনেকেই ছাত্ররাজনিতির দরকার আছে বলে ধারনা করে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্ররাজনিতিকদের কাজে বোঝা যায় সময় এসেছে বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার। ছাত্ররা বর্তমানে রাজনিতিক দলের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সত্যিকারের দেশপ্রেম কী?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে মে, ২০২২ দুপুর ১:২৬


বাংলাদেশে দেশপ্রেম বলতে আওয়ামীলীগের ক্ষেত্রে ভিন্ন মতের বিষোদগার করা, মাইকে গলা ফেটে বঙ্গবন্ধু গুনকীর্তন গাওয়া, বঙ্গবন্ধু কন্যার গুনকীর্তন করা, জাতীয় দিবসগুলোত ফুলদিয়ে শ্রদ্ধা করা এবং ভিন্নমতকে রাজাকার, দেশবিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতিচারণঃ নজরুল

লিখেছেন জাদিদ, ২৫ শে মে, ২০২২ দুপুর ২:১৮


ছবি সুত্রঃ shadow.com

নজরুলের মাহযাবঃ
আমি সাধারনত পাগল, ছাগল এবং আঁতেল এই তিন শ্রেনীর মানুষ দেখলেই সাথে সাথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় তা সম্ভব হয় না, নুন্যতম ফরমালিটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

এত বড় কবি কেন দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পেলেন না?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৫ শে মে, ২০২২ রাত ১০:৪০



বাংগালীরা পড়তে ও লিখতে জানতেন না, যারা সামান্য লেখাপড়া জানতেন, তাঁদের বড় অংশ ছিলেন দরিদ্র, যাদের সামর্থ ছিলো, তারা বই কিনতো না; এই কারণে, কবির তেমন আয় ছিলো না। তখনকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×