somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সামাজিক প্রেক্ষাপটে #me_too (১)

২৩ শে নভেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলায়, মুরুব্বীদের মুখে একটা কথা শুনতাম, ‘বেটি-মাটি’, অর্থাৎ মেয়ে মানুষকে হতে হবে, মাটির মতো নমনীয়, যার ত্যাজ থাকবেনা, প্রতিবাদী মনোভাব থাকবেনা, অনায়াসে সোয়ে যাবে অনেক কিছু (অন্যায়কেও) এবং বক্তব্য থাকবে কম। সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে, মাটির মতো নমনীয়, ঠাণ্ডা এবং নিম্ন মুখী। অতটুকু বয়সে যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করার মতো জ্ঞান আমর ছিলোনা, কিন্তু কথাটা মেনেও নিতে পারতাম না। সে যাই হোক, এই ‘বেটি-মাটি’ হওয়ার দরুন, সামাজিক রঙ্গ মঞ্চের গ্রিন রুমে ঘটে যায় অনেক গল্প। সেই গল্প গুলো দিয়েই নাহয় শুরু করি.........

শামীমার বিয়ে হলো এইতো সেই দিন, কীভাবে যেন পার হয়ে গেলো ১০ টি বছর। ইতিমধ্যে দুই সন্তানের মা হয়েছেন, একেবারে ভরা সংসার, স্বামীর সাথে ব্যস্ততার মাঝেও হেসে খেলে পার হয়ে যাচ্ছে দিন। সব ভালোর মাঝেও, গত দশ বছরে সেই মনের খচ খচ-টা আজও শামীমার মন থেকে যায়নি। স্বামীকে অনেক বার বলবো বলবো করেও বলতে পারেনি, শৈশবের সেই বিস্মৃতিময় ঘটনাটা……… শোনার পর তার স্বামী কি তাকে আর গ্রহন করবে???

নোভা বেশ ভাল একটা চাকরি করছিলো, বেতন, বোনাস, ফ্যাসিলিটি, কোন দিক থেকে কম নয়। কিন্তু হঠাৎ করে চাকরিটা ছেরে দিলো। বন্ধু-বান্ধব আর পরিবার থেকে আসা প্রশ্ন বাণে নোভা জর্জরিত, ‘এতো ভাল চাকরিটা কেন ছাড়লি?’ নোভা সঠিক কোন উত্তর দিতে পারে না। নোভা বুঝে পায়না, এতো প্রভাবশালী এই লোকটার কথা ও কীভাবে সকলকে বলবে? সেই দিনও পত্রিকার অর্থনীতির পাতায় লোকটার হাস্যজ্জল চেহারা দেখে ঘিন্নায় থুতু ছিটাতে ইচ্ছা করছিলো। লোকটা যেদিন নোভা কে কক্ষে ডেকে নিলো, সেই দিনের অশ্রীল ছোঁয়া গুলো, নোভাকে আজও গুমরে গুমরে কাঁদায়।

মফঃস্বল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলো মিতু, প্রথম সেমিস্টারেই প্রেমে জড়িয়ে পড়লো, সিনিয়র ব্যাচের এক ছেলের সাথে। এর পর হর হামেশাই, দেখা, কথা। একদিন বন্ধুদের ফাঁকা একটি ম্যাসে গিয়ে, দুজন দুজনের প্রতি আর আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। মিতু প্রথমে চায়নি, এমনকি মিতু জানতোনা ম্যাসটা ফাঁকা, কিন্তু মিতুর প্রেমিক এমন কিছু আশ্বাস দিলো……… সরল বিশ্বাসে শেষ পর্যন্ত মিতু কাজটা করেই ফেলল। এই ঘটনার আজ দুই বছর, মিতু চোয়াল শক্ত করে চোখের পানি ফেলে, আজকেও তাকে যেতে হবে সেই ছেলেটার ঠিক করে রাখা কোন খদ্দেরের কাছে, আর না হলে ভিডিও লিক………

স্বামী, সন্তান সহ, উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় এসেছিলো সালমা। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারের ইতি টানতে, ঢাকায় এসেই অস্থায়ী গৃহকর্মী হিসাবে বেশ কয়েকটা বাসায় কাজ নিলো সালমা। সালমার স্বামীকে ‘কওই কাম কি নাহি’ বললে ভুল হবে না, তাই সংসার খরচ পুরোটাই পড়েছে সালমার ঘাড়ে। ম্যাডাম কিছু দিনের জন্য ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন, তাই আগের দিনই সালমাকে পই পই করে বলে রেখেছেন, স্যরের নাস্তা-পানি, দুপুরের খাবার যেন ঠিকঠাক মতো রেডি করে দিয়ে যায়। এক মনে কাজ করছিলো সালমা, পিছন থেকে কিছু উক্তি কাটতেই, সে ঘুরে তাকাল। অমনি ম্যডামের স্বামী তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো, সেই সাথে তার কাছে জানতে চাইলো, ‘কত টাকা চাই’। আটপৌরে শাড়ীটার আঁচল দিয়ে চোখ মুচতে মুচতে সালমা সেদিন ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো, কাউকে কিছু বলতে পারেনি, সমাজ কি তাকে বিশ্বাস করবে?

এমনই অসখ্য শামীমা, নোভা, মিতু, সালমাদের গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে আমাদের এই সমাজে। এই সমস্ত অন্যায়ের বিচার তো দুরের কথা, কজনই বা পারছেন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে? যদিও বা কেউ মুখ খুলেছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে পরতে হয়েছে সামাজিক নিয়মের রোষানলে, কারণ ‘তুমি মেয়ে মানুষ......’ ‘চুপ করে থাকো, কাউকে বলোনা’, ‘বললে বিয়ে-শাদি হবেনা’। আর অন্যায়কারী যদি হয়ে থাকেন প্রভাবশালী, তাহলে তো কথাই নাই, ‘একদম মুখ খুলবি না, জানে মেরে ফেলব’, ‘ক্যেইস উঠা নাইলে, তোর বাব, ভাই, মা, বইন কেউ আস্তা থাকবনা’। অতএব ‘বেটি-মাটি’-র কনসেপ্টে বেটির কথা গুলো মাটিতেই মিশে যায়।
ছাড়া ছাড়া এই গল্প গুলোর স্বীকৃতির অভাব কিন্তু শুধু আমাদের সমাজেই নয়, অতি আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজেও আছে এই স্বীকৃতির অভাব, তাই প্রয়োজন পরেছিলো একটি প্লাটফর্মের, যার নাম ‘#me_too’. সুদূর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের ওপাড় থেকে, এই প্ল্যাটফর্মটি বিরাজ করেছে আমাদের এই উপমহাদেশেও। কীভাবে এলো? কেন হলো? এই বৃত্তান্ততে আর যাচ্ছিনা, এই ব্যপারে মোটামটি আমরা সকলেই জানি।

আপাত দৃষ্টিতে #me_too, একটি বিচার পাওয়ার প্ল্যাটফর্ম না হলেও, স্বীকারোক্তি, স্বীকৃতি এবং অন্যায়কারীকে চিহ্নিতকরণের জন্য, আমি মনে করি এই প্ল্যাটফর্মটি সময়ের দাবী। অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘যখন হইসে, তখন বলনাই, এতদিন পরে কেন?’ যারা এই প্রশ্ন গুলো করেন, আমি জানিনা তারা এমন কোন বিরূপ আচরণের শিকার হয়েছেন কি না। নিজেকে একটি বার ঘটনার ভিকটিম হিসাবে ভেবে দেখেছেন কি? একটি মানুষ এমন পরিস্থিতিতে কি পরিমাণ ট্রমাটাইসড হতে পারে? এই ট্রমা কাটিয়ে, নিজের সাথে অন্যায় আচরণের কথাগুলো শক্ত হাতে লিখতে পারার মতো সাহস আমাদের কয়জনেরই বা আছে, একটু ভেবে দেখবেন।

চলবে………
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৫২
৬টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালো শিক্ষার্থী কখনো পরীক্ষা পেছাতে চায় না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

কারণ একজন প্রস্তুত শিক্ষার্থী জানে, পরীক্ষা যত দ্রুত শেষ হবে, সে তত দ্রুত জীবনের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবে। অনিশ্চয়তা, বারবার সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষা—এসব কারও জন্যই কল্যাণকর নয়।

বৃষ্টি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারত কোন ভাবেই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশে সৈন্য পাঠায়নি!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৬


ভারত কোন ভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য সৈন্য পাঠায়নি! সৈন্য পাঠিয়েছিল পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে ও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানকে লুটপাট করার উদ্দেশ্যে। প্রতিবেশি দূর্বল হলে দাদাগিরি করতে পারবে এটাই ছিল ইন্দ্রিরাগান্ধির ভিষন... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপপোকায় খাওয়াচ্ছ

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮


তোমার ফসলী মাঠের ফসল.
কেন উইপোকায় খাওয়াচ্ছ
কিছুদিন পর করবেটা কি
পাগল পাগল হবেই. শুনি!
পড়ালেখা করে একদিন বড় হবে
এটাই তো স্বপ্ন দেখি ওগো সোনাধন
তোমার সুনাম ভরে যাবে পাড়ায় পাড়ায়
গর্বে ভরে ওঠবে বাবা মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত- এই বিশ্বাসকে নিজের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে রেখেছি সারাজীবন। কতবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সুযোগ, এমনকি ন্যায্য অভিমানও গিলে ফেলেছি। কতবার চুপ থেকেছি, শুধু এই বিশ্বাসে যে ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকাল বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষ যে কারণে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়

লিখেছেন এমএলজি, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৪

বছর দশেক আগের কথা। আমি তখন কানাডায় ব্যবসারত অস্ট্রেলিয়ান এক ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সিনিয়র স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করি। আমার এক সহকর্মী ছিলেন যার বয়স কমবেশি ৪৫ বছর। বেশ ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×