৪ ঘণ্টা হল বাসে বসে আছি। এতক্ষণে বাড়ি গিয়ে ঘুম দেবার কথা ছিল। অ্যাক্সিডেন্ট হইছে- তাই রাস্তা বন্ধ। যা জ্যাম বাঁধছে তাতে রাস্তা খুলে দিলেও লাভ নাই। বাড়ি পৌছাতে অনেক দেরি..
এই ৪ ঘণ্টায় আম্মা ৭ বার ফোন করে বকাবকি করেছে- কেন এতরাতে রওনা দিলাম সেই জন্য। আমি যথারীতি বকা খেয়ে হেসে ফেলি- আম্মা আর কিছু বলতে পারে না। আমার হাসির অনেক মূল্য- সেটা আমার কোনদিন অজানা ছিল না!
বোকা মেয়েটা রেগে আছে। আমি মাত্র ৩৬ ঘণ্টার জন্য বাড়ি যাচ্ছি- এবং বাড়ি আসার কারণ তাকে বলছি না! সে জানে আমি কখনোই এসব কোশ্চেন এর রিপ্লাই করি না- তবু জেনে-শুনেই রাগারাগি করে! ফোনটা অফ করে দিলে ভালো হত, আম্মার কারণে পারছি না!
আমি যে কাজটা করিনা সেটা করায় মন দিলাম! স্মৃতি হাতরালাম..
আমাদের প্রকান্ড বাড়িটা- সাজানো একটা ছাদ! আমার বন্ধুদের খুব প্রিয় ছিল। বোকা মেয়ের প্রিয় ব্যালকুনিটা। আমার কাছে কোনটা প্রিয়? বোধহয় গানটা-
"আমি যে এই বাড়িতে নাকি
বাড়িটাই ভবঘুরে.."
আমার ভালো লাগে এই বাড়িটায় আমার ছেলেমানুষ আব্বুকে..আবেগী আম্মাকে.. আর চশমা পরা পাঁজিটাকে।
ছোট্ট শহরটাকে ভাল লাগে। চির পুরাতনের একটা গন্ধ আছে এই শহরে। আছে অনেক অনেক আধ-ভাঙা পুরনো দো'তলা বাড়ি আর শতবর্ষি গাছ।
আমার শৈশব কেটেছে জানালার ফ্রেমে বাধানো আকাশ দেখে! কৈশোরটা দাপিয়ে বেড়িয়েছি খুব! আমার বন্ধুরা কেউ আমার মত ছিল না..ওরা সবাই সাঁতার জানতো, গাছে উঠতে পারতো, ধুলো মেখে খেলার অনেক স্মৃতি ছিল ওদের! আর আমার ছিল নিয়ম ভাঙার সহজাত এক সাহস! আমিও যখন ওদের হয়ে গেলাম, আমাদের ঠেকাবার মন্ত্র কারো জানা ছিল না! আমাদের দিনগুলো যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছিল!
লোকে শুনলে আঁতেল বলবে- আমরা বন্ধুরা কোনদিন অ্যাডাল্ট ফিল্ম নিয়ে আলোচনা করিনি! বোকা মেয়েটা, মিতুল আর আমার প্রিয় শ্যাওরাবৃক্ষবাসিনী যে মেয়ে- আর চির হতাশ তনু, জ্ঞানী আবির কিংবা কিংশুক যে ছেলে ছিল- এই বিষয়টাও মাথায় আসে নি কোনদিন! আসাটাও বোধহয় অন্যায় হত! এসবের থেকে আদারে-বাদারে ঘোরা অনেক বেশি ইমপোর্ট্যান্ট ছিল আমাদের কাছে!
এক্সাম খারাপ হলে আমরা হাঁটতে হাঁটতে শহরতলী ছাড়িয়ে যেতাম..ধানক্ষেতের ধারে বসে আড্ডা চলত যতক্ষণ ক্ষিদের জ্বালা অসহ্য হয়ে না উঠতো! বাড়ি ফিরলে আম্মা জিজ্ঞেস করত পরীক্ষা কেমন হয়েছে- আমি দাঁত কেলিয়ে বলতাম- "খারাপ হইছে আম্মা!
অন্য কেউ হলে আম্মা কষে একটা থাপ্পড় দিত- কিন্ত আগেই বলেছি- আমার হাসির মুল্য আছে! আমি সেটা জানতাম!
আম্মার খুব পানির ভয়! আমি তার নিষেধ কখনো মানি নি..সুযোগ পেলেই চলে যেতাম নদীর ঐ পাড়ে- হাঁটতাম কাশের বন ধরে। শহরতলীর নিরব রাস্তায় সাঁই-সাঁই করে সাইকেল ছোটানোর নেশা ছিল আমাদের। ডানা ছাড়াই উড়ে বেরানোর নেশা ছিল! নেশা ছিল জারুল, কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু ফুলে ভরা রাস্তাগুলোর!
ঘুড়ি ওড়াতে জানতাম না- তবু আকাশ ছুঁতে চাওয়া ঘুড়ি দেখার নেশা ছিল আমার! রঙিন ঘুড়ি কিনে এনে দিতাম পাড়ার পিচ্চিগুলোকে- ছাদে বসে দেখতাম আকাশটাকে রঙিন করছে ঘুড়িগুলো.. সন্ধ্যাবেলা একে একে যখন নেমে আসত ঘুড়িগুলো, আমারও ঘরে ফেরার সময় হত। নিজেকে মনে করিয়ে দিতাম- আমিও ঐ ঘুড়িগুলোর মতই.. নাটাই পড়ে আছে শক্ত, বোবা ঐ ভুমিতে!
চলবে..
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সন্ধ্যা ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


