সেই ছোটবেলা থেকেই দেখতাম- ভদ্রলোক অদ্ভুত সুন্দর করে হাসেন। হাসলে চোখের কোনায় ভাঁজ পড়ে। তখন তাঁকে আরো সুন্দর দেখায়! আমার খালি মনে হত আমার চোখের কোনায় কেন ভাঁজ পড়ে না কেন? মন খারাপ হত! আর এখন ভাবি-
ভাঁজ? হায় হায়!! বুড়া হয়ে গেলাম তো!
বড় হলে বোধহয় অনেক কিছুই বদলে যায়। কেন বড় হলাম বল তো?
কোথাও পড়েছিলাম- ''পৃথিবীর খুব কম ছেলেই তাদের বাবার মত হয়, বাকীরা হয় তাদের বাবার থেকেও জঘন্য!''
আমিও জঘন্য হইছি!
আব্বু হল সুকুমার রায় আর আমি তার রামগরুড়ের ছানা!
বইগুলো হারিয়ে ফেলেছি- ছড়ার বই, ছবির বই, গল্প আর ভুতের বই!
কি যেন একটা বই....
''তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম" -আব্বু পড়ে শোনাত..
'আমরা ছাঁকনি চড়ে সাগর পাড়ি দেব
দেবই দেব!'
এই লাইনটা এখনো আমার মাথায় ঘোরে! ছাঁকনি চড়ে সাগর পাড়ি দিতে মন চায়!
রোজ সকালে সাইকেলের বেল বাজত- টিং টিং টিং! আমি সাইকেলে বসে পা দুলাতাম!
দেখতে দেখতে চলে আসত আমার ইস্কুল। সন্ধ্যাবেলা পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে চলত আমাদের পড়াশোনা- আমার আর আব্বুর পড়াশোনা!
মেলায় গিয়েছ কখনো? আমি গিয়েছি- আব্বুর তর্জনীটা শক্ত করে ধরে রেখেছি- 'আব্বু আমাকে একটা রেলগাড়ি কিনে দিবে?'
এইটুকুন ছিলাম- যখন আব্বু লাল সাইকেলটা কিনে দিল আমাকে। আমাকে যখন নীল শার্ট পরা কাকতাড়ুয়াটা এনে দিল আমি সেটাকে কোলে নিয়ে ঘুরতে লাগলাম! আমার থেকে বড় কাকতাড়ুয়া- খড়-কালিতে আমার জামা নোংরা হয়ে একাকার! আম্মু বকা দিসে!
আমি কি জানতাম নাকি কাকতাড়ুয়া কোথায় ঘুমায়? জেনেই বা কি লাভ হল? আমার কি ইয়া বড় বড় মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত আছে নাকি যে ওকে ওখানে রাখব?
আব্বু তখন আমার কাকতাড়ুয়াকে ছাদের কোণে দাঁড় করিয়ে দিল! দুর থেকে দেখা যেত আমাদের লাল ইটের সবুজ একটা বাড়ি- তার ছাদে নীল জামা পরা কাকটাড়ুয়া!
বড় হয়েছি আব্বুর ছেলেবেলার প্রিয় ছড়াগুলো শুনে-
"জানো, কাল কি হয়েছে ভুমিকম্পে?
কলকাতা বলে গেছে একদম বোম্বে!
কাশ্মির চলে গেছে পাঞ্জাব-লাশাতে
পেশোয়ার বোসে আছে আমাদেরই বাসাতে!!"
আব্বু এখনো ঠিক আগের মতই চমৎকার কবিতা পড়েন। কিন্ত এখন আর লেখেন না! আমার মতই ফাঁকিবাজ হয়ে গেছে আব্বু!
এখনো রাস্তায় পড়ে থাকা বিড়াল-বাচ্চা, কুকুর-ছানা বাসায় নিয়ে আসেন। এখনো ছোট বাচ্চার মত তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলেন নাতীদের সাথে! পুরো বাড়ি-ভর্তি গাছগুলো, এখনো আমার থেকেও বেশি পায় আদর! আর আমি এখনো আব্বুর অসাধারণ রান্না খেয়ে মুখ কুঁচকে বলি- "ভাল হয় নাই"।
এখনো আব্বু হাসলে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি- চোখের কোণায় ভাঁজ পড়ে আব্বু হাসলে!
কে বলে আমি বাবার মত?
দু' ছেলের পড়ার খরচ দাদা চালাতে পারতেন না বলে আমার ভাল ছাত্র আব্বু হায়ার সেকেন্ডরীর পর পড়া ছেড়ে দেন! চাকরী করেছেন যতদিন না ছোটভাইয়ের গ্র্যাজুয়েশন শেষ না হয়! এরপর নিজেও গ্র্যাজুয়েশন করেছেন।
আর আমি জন্মেছি সত্যিকারের রাজপুত্র হয়ে। চাইবার আগেই গোটা রাজ্য আমার ইচ্ছে পুরণে ব্যস্ত!!
কে বলে আমি বাবার মত?
আমি বলি- আমার মাঝে যা কিছু ভাল সবটাই আমার আব্বুর..বাকীটা আমার অর্জন!
যখন ক্লাশ থ্রি-তে পড়তাম - নতুন ইস্কুল, নতুন বন্ধু! একদিন স্কুল শেষে রনি এল আমাদের বাড়িতে। সারা বিকেল আমার সাথে খেলে বাড়ি ফিরল।
কি আশ্চর্য! সন্ধ্যাবেলা আবার এল রনি- সাথে ওর বাবা। এরপর যা জানা গেল তার সারমর্ম এই- বোকা রনিটা বাসায় গিয়ে অনেক কান্না-কাটি করেছে! বলেছে- আমার আব্বুটা এত সুন্দর, ওর আব্বুটা এমন কেন?? হাঃহাঃ!
এখন বড় হয়ে ভাবি- আমিও যদি আব্বুর মতই হতাম!
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০২২ দুপুর ১:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


