শুচিকে আমি প্রথম দেখি, তখন সবেমাত্র ক্লাশ থ্রি থেকে ফোর-এ উঠেছি! শুকনো, শ্যামলা মতন ছোট্ট একটা মেয়ে। কানের দু'পাশে দু'টো ছোট বেণী ঘুলছে। তবু সবার মাঝে মেয়েটাকে আলাদা করে চোখে পড়ে ওর অসাধারণ হাসিটার জন্য! :#>
কি যেন একটা অসুখ ছিল ওর। স্কুলে বেশী আসত না! যখনি আসত স্যার-ম্যাডামরা ওকে অনেক আদর করত। আমরা সব হিংসেয় জ্বলে-পুড়ে যেতাম! ইশ! এরকম একটা অসুখ আমাদের কেন হয় না? স্কুলে আসতে হত না, হোমওয়ার্ক করতে হত না, দুষ্টোমি করলে স্যারডের বকাও খেতে হত না!
এরপর কেমন কেমন করে যেন শুচির সাথে আমার একটু বন্ধুত্ব হয়ে গেল। স্কুলে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল নাবিল। শুচি যখনি স্কুলে আসত আমাদের দু'জনের সাথেই বসত। নাবিল আর শুচি অনেক অনেক গল্প করত, আমি ছিলাম শ্রোতা। একটু পরেই ঝগড়া শুরু হয়ে যেত দুজনের! আমার মাথা খারাপ করে দিত দুজন মিলে! আমি রেগে-মেগে বলতাম- "ঊফফ্! তোরা দুজন একপাশে যা তো! আমাকে মাঝখানে বসিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিছিস!!
কলমটাকে খুব অদ্ভুত ভঙ্গিতে ধরতো মেয়েটা! মধ্যমাটাকে ভাঁজ করে রেখে ঠিক মধ্যমার সাথেই vertically কলম ধরতো! ছোট্ট দানা-দানা অক্ষরে কবিতা লিখত! একদিন আমাকে আর ক্লাশের অন্য কোন একটা মেয়েকে নিয়ে দুষ্টোমি করে কবিতা লিখেছিল আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম সেদিন!
ক্লাশে বসে বসে খাতায় ফুল-টুল কি সব আঁকত আর গুনগুন গ্লায় গান গাইত শুচি!
শুচির আম্মু-আব্বুও ছিলেন ভীষণ ভাল। আমার এখনো মনে আছে- ক্লাশ ফাইভে যখন বৃত্তি পায়নি বলে শুচির অনেক মন খারাপ, আন্টি বলেছিলেন- "ভাল হইছে বৃত্তি পাও নাই! বৃত্তি পেলেই সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে হত! মিষ্টি খাওয়াতে খাওয়াতে আমি ফকির হয়ে যেতাম! তুমি আমার সব টাকা বাঁচিয়ে দিছো!
আর যখন শুচি স্কুলে আসতে পারত না, ওদের পাশের বাসার মেয়েটাকে দিয়ে চিঠি লিখে পাঠাত আমাকে! নিজে হাতে খুব সুন্দর করে খাম বানিয়ে ভরে দিত চিঠিটা। পাতা ভর্তি ওর সেই দানা-দানা অক্ষর.. হাসি..দুষ্টোমি..অভিযোগ.. আর সব শেষে চোখ রাঙানি- "এবার কিন্তু ছোট্ট উত্তর দিলে হবে না! অনেক বড় একটা চিঠি লিখবি আমাকে..."
পরদিন য়দের পাথের বাসার মেয়েটা এসে জিজ্ঞেস করত উত্তর লিখেছি কিনা- আমি মাথা নাড়তাম! লেখার চেষ্টা করনি এমন নয়- চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে জান বের হয়ে যেত আমার! কত যে খাতার পাতা নষ্ট করেছি চিঠি লেখার ব্যর্থ চেষ্টায়। এরপর ক্লাশে বসেই কিছু একটা লিখে মেয়েটার হাতে গুজে দিতাম!
এভাবেই আমাদের এক একটা দিন অন্যরকম করে দিত শুচি!
একটু মন খারাপ লাগত- কত কিছুই বলার ছিল শুচিকে, অথচ বলা হল না একবারো!
এরপর আমার একি রকম কয়েকটা দিন.. তারপর একদিন আবার সেই অসাধারণ ঝলমলে হাসিটা নিয়ে শুচি ফিরে আসত স্কুলে!
এরকমই একদিন আমাদের তিনজনের ক্লাশের আড্ডায় শুচি ওর অসুখটার কথা বলল আমাদের! কি যেন একটা বিদ্ঘুতে নাম! শুচি আমার খাতায় ছোট্ট করে লিখল- থ্যালাসেমিয়া!
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সন্ধ্যা ৭:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


