somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোকসানা লেইস
স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

এঞ্জেল ফেইরি

১৯ শে এপ্রিল, ২০২০ ভোর ৫:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জিয়ানা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অনেক্ষণ। লক ডাউন হওয়ার পর কেবল এই গ্রোসারি দোকানো আসা হয়। জিয়ানা শুরু থেকেই গ্রোসারি দোকানে প্রতিদিন আসছিল। দশ থেকে পনের ব্যাগ দিন দশেকের মতন খাদ্য সামুগ্রির প্যাকেট ও কিনছিল। তারপর কিছু বৃদ্ধ মানুষের দরজায় রেখে আসছিল। গত তিনদিন ধরে সামাজিক দূরত্বের নিয়ম ছয় ফুট করার পর দোকানে ঢুকার নিয়ম বদলে গেছে। এখন গ্রোসারি দোকানে এসেই ঢুকা যায় না। দশ পনের বিশ জন করে ঢুকতে দেয় দোকানের আয়তন অনুযায়ী। কিছু মানুষ বেড়িয়ে এলে আবার কিছু ঢুকতে দেয়া হয়। অপেক্ষার সময়টা বড় বেশি হয়ে গেছে।
প্রায় পনের মিনিট জিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ লক্ষ করে ওর পিছনে বয়স্ক একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। খুব বাতাস হচ্ছে মাঝে মাঝে বরফও পরছে আজ। বৃদ্ধ তাও ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরে খাবার না থাকলে বাইরে বেরুতেই হবে।
জিয়ানা পিছনে তাকিয়ে বৃদ্ধকে বলল, তোমার বাজারের লিষ্ট আমাকে দিলে আমি তোমার বাজারটা করে দিতে পারি। তুমি বরং গাড়িতে গিয়ে বসে থাকো। এক মুখ হেসে বৃদ্ধ বলে, খুব ভালো প্রস্তাব কিন্তু আমার সাথে গাড়ি নাই, প্রিয় সুইট হার্ট।
আহা তুমি কতদূর থাকো, ফিরবে কিভাবে?
আমি হেঁটে যাবো এই তো দু রাস্তা পার হলেই আমার বাড়ি।
জিয়ানা বলল, কিছু মনে না করলে তুমি আমার গাড়িতে গিয়ে বসে থাকো। আমি তোমার বাজার সদাই করে আনছি, তোমাকে পৌঁছে দিব বাড়িতে।
বৃদ্ধ ততক্ষণে কাঁপছে শীতের প্রোকপে। ঠাণ্ডায় হাঁটা চলে বাইরে কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলে শীতে খুব বেশি লাগে। তুমি একটা এঞ্জেল দেখছি বলে, বৃদ্ধ কাগজে লেখা একটা লিষ্ট জিয়ানার হাতে এগিয়ে দিল। তারপর টাকা দেয়ার জন্য মানিব্যাগ খুঁজছে। ওর হাত কাঁপছে। জিয়ানা গাড়ির চাবি এগিয়ে দিয়ে বলল। ঐ যে সাদা গাড়িটা প্রথম রোতে সেটাই আমার গাড়ি ওখানে যাও।
টাকা পরে নেয়া যাবে। সময় লাগবে বসে থাকো ততক্ষণ আরাম করে হিট চালিয়ে দিও।
এক গাল হাসি দিয়ে বৃদ্ধ ধীর পায়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে জিয়ানা ফিরে এলো অনেকগুলো বাজারের প্যাকেট নিয়ে। পেমেন্ট করতেও অনেক অপেক্ষা করতে হয়।
বৃদ্ধ আরামে ঘুমিয়ে পরেছে গাড়ির ভিতরে তখন। ওকে বাড়িতে নামিয়ে বাজারের ব্যাগগুলো ঘরে তুলে দিয়ে, বাই বলে চলে যাচ্ছে জিয়ানা । বৃদ্ধ বলছে তোমার টাকা নিয়ে যাও এঞ্জেল।
লাগবে না এই সদাই গিফট তোমার জন্য। নেক্সট টাইম আমাকে ফোন দিও তোমার বাজারের দরকার হলে। বৃদ্ধ অবাক দৃষ্টিতে মাত্র আঠারো বছরের মেয়েটির দিকে একরাশ ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে আছে। জিয়ানা তখন ছুটছে অন্যদের বাজারগুলো পৌঁছে দেয়ার জন্য।
প্রতিদিন বৃদ্ধ মানুষদের বাজার করে দেয়ার এই দায়িত্বটা নিজে থেকে নিয়ে নিয়েছে জিয়ানা। আর নিজের স্কুলে ভর্তি হওয়ার জমানো টাকাটা খরচ করছে এর জন্য। ভর্তির সময় এলে দেখা যাবে। এখন এই বৃদ্ধ মানুষগুলো ঘরে থেকে ভালো থাকুক। কোভিড ১৯ এর প্রথম আক্রমণে জিয়ানা হারিয়েছে ওর প্রিয় গ্রাণ্ডমাদারকে। যার সাথে জীবনের অনেক সুখের স্মৃতি। হাসপাতালে যাওয়ার পর নেনার সাথে আর একদিনও দেখা হলো না। বড় নিভৃতে একা শেষ বিদায় নিয়েছে গ্রাণ্ডমা । এমন যেন আর কারো গ্রাণ্ডমার জীবনে না ঘটে।
ওর স্বল্প সঞ্চয়ে স্বল্প সামর্থে যতটুকু করা যায় প্রাণ দিয়ে করে যাচ্ছে। এ্যাথেলেট জিয়ানা ভলিবল ট্যুরনামেম্ট খেলে গত চার বছরে জমিয়ে ছিল কিছু টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য। জিয়ানা গ্রাণ্ডমাদারের সাথেই থাকত। কিন্তু ও গিয়েছিল অন্য একটি শহরে খেলার জন্য। আর গ্রাণ্ডমাদার বাজার করতে গিয়ে কোভিড ১৯ এর ভাইরাস শরীরে নিয়ে আসে। ভীষণ শরীর খারাপ হলে স্পেশাল টিম এসে নিয়ে গেছে হাসপাতালে। খেলাটা বাতিল হয়ে যায় পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার জন্য। চারদিন পর ফিরে এসে নেনার সাথে আর দেখা হয় না জিয়ানার। শূন্য বাড়িতে একা চোখের জল ফেলতে ফেলতে মাত্র একদিন কথা বলতে পেরেছিল হাসপাতালে নেনার সাথে। প্রচণ্ড কাশির দমকে কথা বলতে পারছিল না নেনা। তার পরদিনই আসে সেই ভয়ংকর খবর, নেনা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
মা বাবা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল জিয়ানার ছয় বছর বয়সের সময়। তারপর থেকে এই নেনাই তার একমাত্র আপনজন। তিনদিন নিথর হয়ে বসে থেকে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে জিয়ানা। পাড়ায় পাড়ায় খুঁজে বের করেছে, একা থাকা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের । তাদের নাম লিস্ট করে তখন থেকে একাই বাজার করে তাদের পৌঁছে দিচ্ছে প্রতি পনের দিন অন্তর এক একজনকে।
সবাই অনেক ভালোবাসে জিয়ানাকে। এঞ্জেল ফেইরি বলে ডাকে ওকে। একজন গ্রাণ্ডমাদার হারিয়ে অনেক গ্রাণ্ডমাদার গ্রাণ্ডফাদারের আদর পেয়েছে জিয়ানা। নেনা যেন ওর পাশে গাড়িতে বসে থাকে ছায়া হয়ে। প্রতিদিন ওর কাজকামের হিসাব রাখে আর অনেক খুশি হয় জিয়ানার উপর। আর অনেকগুলো চামড়া কুচকে যাওয়া সাদা চুল, শীর্ণ শরীরের বয়সের ভাড়ে নুয়ে পরা মানুষ, ফোকলা মুখে বয়স্ক চোখের দৃষ্টির মায়ায় ওর দিকে চেয়ে প্রাণ ভরানো হাসি হাসে।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০২০ ভোর ৫:২৯
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাদীস সংগ্রাহক

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে মে, ২০২০ দুপুর ১২:২৬



হাদীস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন মুসলমানদের জন্য।
যদিও দুষ্টলোকজন হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে থাকেন। তাতে সমাজে বিরুপ প্রভাব ফেলে। ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে হয় মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুড ওল্ড নাইন্টিজ

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৭ শে মে, ২০২০ বিকাল ৪:৪২



আমরা গল্প করছিলাম সাত্তার মিয়ার চায়ের দোকানে বসে। সাত্তার মিয়া জঘন্য চা বানায়। আমার বন্ধু সোবহানের মতে এই চা ঘোড়ার মুতের সমতূল্য। সাত্তার মিয়ার সামনেই এসব আলোচনা করা হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাহায্যও নাকি আবার বেআইনী হয়? দুনিয়ার ম্যাঁওপ্যাঁও

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২২



আমি কুইন্স বরোর সীমানার সাথে লাগানো, লংআইল্যান্ডের একটা এলাকায় বেশ কিছু সময় চাকুরী করেছিলাম; এক সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে এক সাদা রমনীকে সাহায্য করে, ধন্যবাদের বদলে হুশিয়ারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি নিয়ে আসলে রাজনীতি করেছে কারা, ছবির জন্য নামাজ পড়িয়েছে কারা

লিখেছেন গুরুভাঈ, ২৭ শে মে, ২০২০ রাত ৮:২৪



ছবি দেখুন। আমাদের যে ছবিটা দেখানোর জন্য এই নামাজের আয়োজন করা হয়েছে আমরা শুধু সেই ছবিটাই দেখেছি এবং অনেকে দ্বিদ্ধানিত আছি এই ভেবে যে হয়ত আসলেই শুকনা জায়গা ছিলোনা বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেমন কাটালাম এবারের ঈদ!

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৭ শে মে, ২০২০ রাত ৯:১৩

(পোস্টটা গতকালের লেখা)

গতকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর গত হয়ে গেল! মনের মাঝে আনন্দ বিষাদের বিচিত্র সব অনুভূতি খেলা করে চলছিল সেই সকাল থেকেই। এবারের রোযার মাসটা আল্লাহতা’লার অশেষ রহমতে খুব ভাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×