somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোকসানা লেইস
স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

অনুরূপ

০৫ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ১১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাজের মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করছেন মা। নতুন এসেছে বয়স দশ এগারো বছর হবে। গ্রাম থেকে আসা মেয়েটার হাতে একটা পুটলি কাপড়ের। মেয়েটি নিঃশব্দে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জড়োসর ভঙ্গিতে। গেটের দারোয়ান মেয়েটিকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ওর দূর সম্পর্কের ভাগনি মেয়েটি। মামা চলে যেতে অপরিচিত কিছু মানুষের সামনে, মেয়েটি যেন একটি মহা সমুদ্রে পরেছে, এমন মনে হলো আমার। অনেকক্ষণ জিজ্ঞেস করার পর, মেয়েটি আস্তে আস্তে এক সময় বলল, ওর নাম সারা।
মা সাথে সাথেই বললেন, তোকে তো সারা নামে ডাকতে পারব না। আমার মেয়ের নামও সারা। তোকে একটা নতুন নাম দিতে হবে। মা দুই মিনিট সময়ও নিলেন না মেয়েটাকে একটা নাম দিয়ে দিলেন। যেন মা আগে থেকেই জানতেন, একটা নতুন নাম কাজের মেয়েটাকে দিতে হবে। তোর নাম টুনি। আজ থেকে টুনি ডাকলে বুঝবি, এটা তোর নাম। মনে থাকবে? মেয়েটি নাম বলা ছাড়া আর একটি কথাও বলেনি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তখন থেকে।
ঘরের ভিতর আমরা অনেক অপরিচিত নতুন মানুষ মেয়েটির সামনে। বাবা, মা ভাইয়া, আপা, আমি, ড্রাইভার এতগুলো মানুষের সামনে সে নতুন পরিচয় পেয়ে, সেটা মেনে নিল কিনা জানার চেষ্টা কেউ করল না।
মায়ের দেয়া নতুন নামটা তার মনে থাকবে কিনা মা, বারে বারে জানতে চাইলেন মা, মাথাটা ডানপাশে কাত করে জানাল, তার মনে থাকবে কিন্তু মুখে কিছু বলল না। চুপ চাপ একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল নিরবে।
মা ওকে সাথে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন। সারা, নামের মেয়েটি আমাদের বাড়িতে টুনি হয়ে জীবনের বেশ অনেকটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে। প্রথমে মা তাকে দেখতে পারতেন না। চুরি করে খায় কিনা, কোন কিছু চুরি করে নিজের পুটলিতে ঢুকিয়ে রেখেছে কিনা এজন্য সব সময় চোখে চোখে রাখতেন। প্রায় সময় পুটলি খুলে চেক করে দেখতেন। দেখিয়ে দেওয়া কাজের এদিক সেদিক করলে দুএকটা চড় থাপ্পরও লাগিয়ে দিতেন। আর সব সময় ভয়ে থাকতেন, কখন যেন টুনি পালিয়ে যায়। চুরি করে,পালিয়ে যাবে, যার সম্পর্কে এমন ধারনা, তাকে কাজের প্রয়োজনে বাড়িতে রাখা, আবার পালিয়ে যাবে বলে আতংকে থাকা। এমন দ্বিধান্বিত অবস্থায় বেশ কিছু কাল কাটার পর, মা নিশ্চিন্ত হলেন মেয়েটি চুরি করে না। পালিয়েও যাবে না। বরং বিশ্বস্ততা বাড়ল তার উপর। মা চোখ বন্ধ করে টুনির উপর সংসার ছেড়ে দিয়ে বেশ আরামে সময় কাটিয়েছেন, সারা নামে টুনি হয়ে যাওয়া মেয়েটি আমাদের বাসায় আসার পর। এক সময় টুনি বেশ বড় হয়ে গেলে, টুনির বিয়েও নিজে দেখে শুনে মা দিয়েছেন। এখন টুনি মাঝে মধ্যে মায়ের কাছে বেড়াতে আসে, স্বামী বাচ্চা নিয়ে। টুনি আসলে টুনি নিজেই রান্না করে খায় এবং খাওয়ায় ওর পরিবারকে। নিজের বাবার বাড়িতেই যেন টুনি আসে।

আমি যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমার একজন টিচারকে খুব পছন্দ হলো। অল্প বয়স্ক অনেক স্মার্ট একজন মহিলা। উনাকে প্রথম দেখায় আমার খুব ভালো লেগে গেল। উনার সাথেই আমি এসাইনমেন্ট করব ঠিক করলাম। উনার নাম আমার নামে, সারা। আমি সারা সামিয়া । টিচার সারা হাবীব। আর আমাদের কাজের মেয়ে টুনির নামও সারা ছিল কিন্তু ওর কোন লাস্ট নেম ছিল না।
সারা হাবীবের সাথে আমাদের সাত জনের গ্রুপের এসাইনমেন্ট। সেদিন আমি একাই গিয়েছিলাম উনার রুমে। এসাইনমেন্ট বিষয়ে জানতে। যা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।
উনি খুব সুন্দর করে হেসে আমাকে অর্ভথনা করলেন। খুব ভালো করে এসাইনমেন্টের বিষয়ে কি করতে হবে বুঝিয়ে দিলেন। খাতা কলম গুছিয়ে আমি যখন উঠতে যাচ্ছি তখন উনি আমাকে বললেন, তোমার সারা নামটা অফ করে দিবে ভার্সিটিতে। তুমি সামিয়া নামে পরিচিত হবে। সবাইকে বলবে তোমার নাম সামিয়া। সারা নামটা বলবে না একদম। আমার ভয়ানক রাগ হলো। আমার বন্ধুরা অলরেডি আমাকে সারা নামে ডাকে অনেকে। তারা এখন সামিয়া বলে ডাকবে আমাকে! এটা হয় নাকি। আমার সারা নাম কেন লুকিয়ে ফেলতে হবে।
আমি মুখ গম্ভীর করে উঠে চলে এলাম। অনেক দিন আগে সারা নামের মেয়েকে টুনি করা হয়েছিল আমাদের বাসায়, সেই দৃশ্যটা মনে ভাসতে লাগল। খুব জানতে ইচ্ছা করল এতদিন পরে, টুনির তখন কেমন লেগেছিল নাম বদলে দেওয়ায়।
আমার বলার অপেক্ষায় না থেকে সারা হাবীব ম্যাডাম, পরের ক্লাসে সবাইকে বলে দিলেন তারা যেন আমাকে সামিয়া ডাকে এখন থেকে। এবং তিনি বারবার আমাকে সামিয়া, সামিয়া বলে ডাকতে লাগলেন। যদিও সামিয়া নামটা আমার নামের অংশ তবু আমার ভীষণ রকম অপরিচিত মনে হতে লাগল নিজেকে। সামিয়া হয়ে উঠতে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছিল। সারা নামটা আমার খুব প্রিয়। সারা, নামে আমি খুব হালকা অনুভব করি। হাসিখুশি আনন্দময়ী থাকি। কিন্তু সামিয়া আমাকে কেমন একটা ভাড়ি প্রলেপে জড়িয়ে ফেলতে থাকল। গুরু গম্ভীর একটা ভাব যেন সামিয়া হয়ে যাওয়ার সাথে।
ভার্সিটির প্রথম দুমাস বাদে, বাকি সময় আমি সবার কাছে সামিয়া হয়ে উঠলাম। নিজের কাছে অপরিচিত এক মানুষ। আমার অনেক কিছুতে আগ্রহ কমে গেল। কোন রকমে ক্লাস করেই বাসায় চলে আসা। ভার্সিটি থাকার সময়টা আমার কেমন ভয় ভয় করত। আমার খুব সারা হয়ে কিশোরী মেয়ের মতন দৌড় ঝাঁপ দিতে ইচ্ছা করত কিন্তু সামিয়ার প্রভাবে আমি কিছুতেই হালকা চলনের সারা হতে পারতাম না ।
অনেক ইচ্ছা ছিল, এটা সেটা করব। কিন্তু আমার সব আগ্রহ মরে গেল। ক্লাসের পরে বাইরে, থাকতেই আমার ভালোলাগত না। ঘরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচতাম। যেখানে বাবা, মা আমাকে সারা ডাকেন। আমি সহজ নিঃশ্বাস ফেলি।
এম এ টা কোন রকমে পাশ হয়ে গেল। বন্ধুরা চাকরির জন্য আবেদন করছে। অনেকে আগে থেকেও পার্ট টাইম চাকরি করছিল। জীবনটাকে অন্য রকম চিনছিল। আমারও খুব ইচ্ছা ছিল চাকরি করার। কিন্তু সব ইচ্ছারা কেমন হারিয়ে গেল।
সামিয়া নামের মেয়ের সাথে কেউ প্রেম করারও আগ্রহ দেখাল না যেন তার গম্ভীর চেহারা দেখে।
পারিবারিক ভাবে আমার একটা বিয়ে ঠিক করা হলো। ছেলে বিদেশে থাকে। পি এইচ ডি শেষ করে চাকরি করছে, একটি বড় কোম্পানিতে। ছেলের সাথে এক বিকালে আলাপ হলো আমাদের বাসার ছাদে। সে আমার সারা নামটি খুব পছন্দ করল। এবং অনেকবার আমাকে সারা নামে, ডেকে অনেক কথা বলল। বিদেশের জীবন, একা সব কিছু করার কষ্ট। আবার মাঝে মধ্যে ঘুরতে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ। জীবনটা পুরাই অন্য রকম সেখানে।
আবির কে আমার খারাপ লাগল না। নিস্তরঙ্গ আমার জীবনে আবির একটা ঢেউ হয়ে এলো। অন্য রকম কিছু জীবনের চিন্তা ছড়াল মনে। নতুন করে বর্হিবিশ্বে আবার সারা হয়ে ছড়িয়ে পরার ভাবনাটা বেশ ভালো লাগল। অন্তত আশে পাশে, সারা ম্যাডামের মতন কেউ নিজেকে সারা পরিচয়ে রেখে, আমাকে সামিয়া হিসাবে দূরে ঠেলে দিতে পারবে না। আমি আবার সারা হয়ে বাঁচব। নিজের মতন।
বেশ অনেকদিন হলো আমি সারা আবির চৌধুরি হয়ে, আমেরিকার ডালাসে জীবন যাপন করছি। সামিয়া নামের সাথে পুরো সম্পর্ক ঘুচিয়ে ফেলেছি।
স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির সব সার্টিফিকেট থেকে বার্থ সার্টিফিকেটে, সামিয়া নাম তুলে দিয়ে আমি বাবার নামের শেষ অংশ কুরাইশি করেছি। আবির বলেছিল, মিডিল নেম সামিয়া রাখার জন্য আমি বললাম, এই নামটাকে আমি হেইট করি। ও আর কিছু বলেনি। বিয়ের পরের নাম আবার সারা আবির চৌধুরি হয়েছি। এই নামটা আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। এই নামেই পাসপোর্ট করে ইমিগ্রেশন পার হয়ে আমেরিকায় এসেছি।
সামিয়া মুখ থুবরে বাংলাদেশে পরে রেয়েছে। ওকে সাথে করে আমেরিকায় আনিনি। না কোন কাগজ পত্রের নামেও। এজন্য বেশ কিছু সময় ধৈর্য নিয়ে অনেক জায়গায় ছুটাছুটি করতে হয়েছে আমাকে। সহজ কাগুজে নাম পরিবর্তনের কাজটা করতে গিয়ে কেউ সহজে সে কাজটা হতে দেয়নি। কাউকে টাকা দিতে হয়েছে। কাউকে দিনের পর দিন চেয়ারে পাইনি। কেউ অনেক প্রশ্ন তুলেছেন, কেন নাম পরিবর্তন করব, ইত্যাদি ব্যাক্তিগত বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আমি কখনো কিছু বলিনি। কখনো ইচ্ছে মতন বানিয়ে বাজে গল্প বলেছি। যাতে সামিয়া নামটা যে আমার ঘাড় থেকে ছেটে ফেলতে চাই, তারা এ ব্যাপারে আর আপত্তি করতে পারেননি। সব চেয়ে ভালো কাজ করে যখন কোন দুঃখের গল্প বলা হয়। যেমন সামিয়া নামের আমার বন্ধু আত্মহত্যা করেছে বা বিয়ের পর খুব অসুখি জীবন যাপন। বড় ধরনের অসুখে পরেছে। এসব কারনে সামিয়া নামটা আমার নিজের সাথে রাখা পছন্দ নয় বললে কেউ আর কোন প্রশ্ন না করে, কাজটা করে দিয়েছেন। অনেক অফিস, অনেক মানুষের কাছে যেতে হয়েছে এই নাম পরিবর্তনের জন্য। তার মাঝে শুধু একজন মানুষ পেয়েছি, বয়স্ক ভদ্রলোক কোন প্রশ্ন কোন সময় ব্যয়, কোন টাকা না নিয়ে, চট পট কাজটা করে দিয়েছেন নিয়ম মত।

আমেরিকার জীবনে বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। আত্মিয় পরিজন ছাড়া একা থাকা, ঘরের কাজ করা এসব বেশ সয়ে গেছে এখন বরং সময় খুব বেশি হাতে কি করব বুঝতে পারি না। আবির কাজের পর, যথেষ্ট সময় দেয়। উইকএ্যাণ্ডে ঘুরতেও যাই। তারপরও প্রচুর সময় অবকাশ যেন আমার। আবির বলল, তুমি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাও। একটা ডিগ্রি এখানে হলে ভালো কাজ পেয়ে যাবে। কাজ না করলেও তোমার ভালো লাগবে এখানকার পড়ালেখা করতে অনেক কিছু জানতে পারবে।
ভার্সিটি যাওয়ার কথায়, প্রথমেই সারা ম্যাডামের ট্রমা আমাকে আক্রান্ত করল। কিন্তু নতুন জায়গায় তেমন কিছু হবে না এই ভেবে রাজী হয়ে গেলাম। তবে শর্ত দিলাম, আমার ভালো না লাগলে আমি পড়ব না।
আবির হাসতে হাসতে বলল, কোন প্রেশার নাই, তোমার ভালোলাগলেই এগিয়ে যেও নয় তো ইস্তফা দিও।
এ্যাপ্লাই করা হলো যথা সময়ে ভার্সিটি ডাকল। ভর্তিও হয়ে গেলাম। প্রথম দিনের ক্লাসে সুন্দরী মহিলা এলেন ক্লাসে বেশ বয়স্ক মহিলা, সাদা চুল, নীল চোখ, টানটান লম্বা স্লিম শরীর আর অসম্ভব ধবধবে সাদা। কিন্তু রিনিরিনি মিষ্টি ভয়েস। দারুণ স্মার্ট বেশবাস। বয়স্ক হলেও অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
জানালেন তিনি রোমান এবং গ্রীক বংশের কম্বিনেশনে গড়া মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর উনার গ্রাণ্ড পেরেন্টসরা ইউরোপ ছেড়ে আমেরিকায় এসেছেন। উনার জন্ম নিউ জার্সিতে। তবে বড় হয়ে পড়ালেখার প্রয়োজনে আর বিয়ে হওয়ার পর স্বামীর সাথে অনেক জায়গায় ঘুরে ডালাসে থিতু হয়েছেন। দু বছর হলো, স্বামী ক্যানসারে মারা গেছেন। দুই ছেলে একজন থাকে অস্ট্রেলিয়ায়, বিয়ে করেছে সিডনির মেয়ে। আরেক জন বর্তমানে থাকে জার্মানির মিউনিখে। সে বিয়ে করেনি করতেও চায় না, ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে।
তিনি একা বিশাল এক বাড়িতে থাকেন। তবে একদম একা না কুকুর জেরি, থাকে উনার সাথে। পরিবারের হাফ সদস্য, বর্তমানে এই দুজনের সংসার উনার।
টিচার তার নিজের পরিচয় দিতে এমন পারিবারিক সবার ইতিহাস বললেন, এটা আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। আমি দেশে কোন টিচারকে এভাবে পরিচয় দিতে শুনিনি।
সবার শেষে বললেন, উনার নাম সারা এন্ডারসন। আমার বুক ডিপডিপ করতে শুরু করল। আবারও সারা। আবারও সামিয়ার মাঝে আমাকে ঠেলে দেওয়ার জন্য কেউ আসল। কেন উনার নাম আর কিছু হতে পারল না। আমার দুচোখ ভিজে উঠতে লাগল। কষ্টে, রাগে, বিরক্তিতে । আরো নানা রকম অনুভব মন জুড়ে। আমি ঠিক করে ফেললাম পড়ালেখার ইতি এখানেই। আজই শেষ, ভার্সিটি মুখো আর হবো না। আমার ভাবনায় এতই ডুবে গিয়েছিলাম, শুনতে পাইনি কখন টিচার আমাকে ডাকছেন।
ইয়াং লেডি, তোমার নাম কি? একে একে অনেকের নাম পরিচয় ইতমধ্যে শুনে আমার কাছে এসেছেন। এবার আমার পালা নাম বলার। আমি থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াতে গেলাম।
সারা এন্ডারসন বললেন, দাঁড়াতে হবে না বসেই বলো। এতক্ষণ সবাই বসে কথা বলেছে সেটাও আমি খেয়াল করিনি। আমরা তো টিচারের সাথে কথা বলার জন্য দাঁড়িয়ে যাই।
তিনি আবার বললেন, এ্যানি প্রবলেন? তোমার কি আমার কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? সাথে যোগ করলেন, এত দিন হয়ে গেল অথচ আমি আমার অনেক উচ্চারণ ঠিক করতে পারিনি, ছোট বেলায় যাদের সাথে বড় হয়েছি তাদের প্রভাবটা এখনো রয়ে গেছে। তাছাড়া আমার বাড়িতে তো নানা রকমের ভাষায় কথা বলা হয়। যার জন্য আমার ভাষাটা বিশুদ্ধ না তোমাদের বুঝতে অসুবিধা হলে প্লিজ আমাকে বলতে দ্বিধা করবে না।
উনার ভাষার কোন ত্রুটি আমি পাইনি। বরং খুব ভালো উচ্চারণ এবং পরিস্কার কথা। আমি ডুবে ছিলাম আমার ভাবনায় তাই শুনতে পাইনি। অথচ তিনি এই মেয়ে কোথায় ছিলে, ক্লাসে মন না বসলে, বাইরে চলে যাও ইত্যাদি না বলে আমার ভুল না দেখে নিজের কোথাও ভুল হয়েছে, যার জন্য শিক্ষার্থি বুঝতে পারছে না ভেবে লজ্জিত হচ্ছেন। এত সুন্দর ব্যবহারের একজন টিচারকে বিব্রত করাটা আমার ঠিক না। এবার আমি সহজ হওয়ার চেষ্টা করে, একটু হেসে বললাম, তোমার উচ্চারণ এবং কথা বলা খুব সুন্দর সারা এণ্ডাররসন, আমি খুব উপভোগ করছিলাম তোমার কথা। আর সেজন্যই একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরেছিলাম, এ জন্য আমি খুব দুঃখিত । আরেকটা বিষয় হলো আমার নাম।
এই বলে আমি একটু থামলাম। সারা বললেন, ওহ থ্যাংকুউ থ্যাংকুউ সো গ্ল্যাড টু হিয়ার। স্টিল আই নো, আই এ্যাম নট পারফেক্ট। বাট হোয়াট এবাউট ইউর নেম? উনি আমাকে প্রশ্ন করলেন কথার শেষে।
আমার নাম আর তোমার নাম একই, আমার নামও সারা। কোন রকমে বলে তার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। নাম বলে, আমার চোখ বন্ধ করে রেখেছি। কি জানি কি বোমা তিনি ফাটান নাম শুনে, ভয়ে আছি।
ওয়াও সো সুইট! ইউ হ্যাভ সেইম নেম এ্যাজ মাইন, ভেরি নাইস।
আমি বড় বড় চোখে, সারা এণ্ডাররসনকে দেখছিলাম। কি বলে মহিলা সো সুইট, হাও নাইস এক নাম পেয়ে সে যেন আমাকে মিতা পেয়েছে। যেমন দুজন এক নামের মানুষ মিতা, সই হয় আমাদের দেশে। কিন্তু সেই এক নাম আবার এক সমাজের মানুষের হতে হয়, নয়তো বিড়ম্বনার কারণ হয় শ্রেণী বৈষম্যে। অথচ টিচার ভিনদেশি, অনেক বেশি শিক্ষিত এবং বয়স্ক হয়েও এই সারা, আমাকে আপন করে কাছে টেনে নিচ্ছে, ভালোবেসে বন্ধুর মতন। এটা কেমন ব্যবহার। ওর একটুও মন খারাপ হচ্ছে না, ক্লাসের ব্রাউন একটা মেয়ের নাম তার নামে। বরং তার খুশি উপচে পরছে, নিজের নামের একটা মেয়ে পেয়ে। ভেরি হ্যাপি টু মিট ইউ সারা বলে ও কাছে এসে আমার সাথে হাত মিলাল। ইজ দেয়ার এ্যানি আদার সারা ইন দ্যা ক্লাস?
সবাই চারপাশে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল অন্য সারার খুঁজে। তবে আর কোন সারা, সাড়া শব্দ করল না। তা হলে ক্লাসে আমরা দুজন সারা হলাম। সারা টিচার আর সারা স্টুডেন্ট। সারা এন্ডাসন আর সারা চৌধুরি। সারা ফ্রম গ্রীস সারা ফ্রম বংলাদেশ। মিসেস সারা মিস সারা।
সারার প্রতি আমার পক্ষপাত থাকবে স্টুডেন্টস, তোমরা কিন্তু জেলাস হতে পারবে না। আফ্টার অল আমাদের এক নাম। বলে মিষ্টি করে হাসল সারা এন্ডারসন আর সারা ক্লাসের সবাই হেসে দিল। নাহ আমরা জেলাস হবো না অনেকে বলে উঠল। কেউ বলল, লাইক টুইন নেম সারা, ইন ক্লাস।
ক্লাসের পর মনটা এত ফুরফুরে হয়ে গেল। খুব আনন্দ হচ্ছে আমার। নাম নিয়ে বেশ খানিক কথা হওয়ার কারণে সবাই আমাকে চিনে ফেলেছে। অনেকেই পাশ দিয়ে যেতে হাই, সারা বলছে। কেউ বলছে সারা ফ্রম বাংলাদেশ দেখা হবে আবার।
সারা নামে এই ক্যাম্পাসে পরিচিত হতে পেরে খুব ভালোলাগছে। ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়া বা আবার ক্লাসে ফিরে না আসার কোন ভাবনা মাথায় রইল না।
ডিনারে আবিরের সাথে প্রথম দিনের ক্লাসের গল্প করতে বেশ সুন্দর হয়ে উঠল সান্ধ্যকালীন সময় আমাদের যৌথ জীবনের।






সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০২১ রাত ৩:১৫
৮টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা এবং গর্জিয়াস প্রকাশনা উৎসব

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:১৭


পহেলা মে বিকেলে একটি আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল বই প্রকাশনার। এই আয়োজনটি শুরু হয়েছিল বলা যায় এক বছর আগে। যখন একটি লেখা দেওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। লেখাটি ছিল বিদেশের জীবনযাপনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪



কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×