নারীদের সুন্দর চোখ আছে, নাক আছে, ঠোঁট আছে। ঠোঁটের ভিতর দাঁত এবং জীভ আছে।
চুল আছে, কপাল এবং কোপল আছে, চিবুক আছে, তিল আছে, গ্রীবা আছে। বক্ষ আছে, স্তন আছে, বাহু আছে, আঙ্গুল এবং নখ আছে্। উড়ু আছে নিতম্ব আছে পায়ের পাতা আছে। নাভী আছে পেট আছে মেদহীন বা মেদবহুল চর্বি থলথলে।
এসবই শরীরের অংশ। কারো মোটা কারো চিকন কারো কালো কারো সাদা কারো বাদামী বা পিত রঙ। নীল বা বাদামি চোখ। মায়াবি বা ক্রুড় চোখ এসবই জন্মগত ভাবে পাওয়া। কেউ হাঁটে হেলে দুলে কেউ সোজা, শক্ত, ধীর স্থির। কেউ দূরন্ত ভঙ্গীতে। নারীদের চলা বলা চলন বলন। হাসি কথা এবং পোষাকের নানা রঙ নিয়ে যত মাতামাতি পুরুষদের।
নারীর গুণের কথা খুব কম বলা হয়। নারীর সৌন্দর্য এত বেশি চোখে পরে তা ভেদ করে নারীর গুণপনা তেমন চোখে পরে না।
নারীর এত সৌন্দর্য দূর থেকে দেখে, পুরুষ সহ্য করতে পারে না। হাতের মুঠোয় নিতে চায়। সব সৌন্দর্য সবাই পেতেও পারে না। সম্ভব নয় কোন ভাবে। তবু সুযোগ মতন নানা ছলে নারীকে স্পর্শ করা হয়। প্রতিবাদ করলে নারীদেরই দমিয়ে রাখা হয় আবার।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাই কথার আঘাতে নারীদের অবদমিত করে রাখার চেষ্টা। সমাজ, ধর্ম পুরুষদের ধর্ম সারাক্ষণ নারীর শরীর দেখে। নারীর গুণ দেখে না।
অথচ পুরুষ ভুলে যায় নারীর গর্ভে জন্ম হওয়া। নয় মাস দশ দিন, নিজের জীবন সিঞ্চন করে একটু একটু করে গড়ে তোলা মানব শরীর। অন্তত দশ বছর পর্যন্ত রাতদিন এক করে আগলে রাখে সন্তানকে নারী নিজের জীবন বিপন্ন করেও । অনেক পুরুষ খবরও জানে না কোন গর্ভে কখন তারা ঢেলে দিয়েছে জীবনের বীজ। নারী সারা জীবনই সন্তানের ভালোর জন্য ব্যস্ত থাকে । হারিয়ে যায় তাদের নিজের অনেক আশা আনন্দ। কিন্তু সন্তানের সুখ টুকু রাখার চেষ্টা করে জীবন দিয়েও।
একটু খানি বড় হলেই পুরুষ কামুক হয়। তারা নারীর শরীর দেখে। নিজের নারীকে আগলে রেখে আর সব নারীকে নিয়ে মাস্তি করে,সরাসরি না করলেও মনে মনে হলেও।
পুরুষদের আরোপিত ধর্ম অবমাননা করে নিজের মতন সাবলীল কোন নারী চললে, চক্ষু চরকগাছ হয়। ঝাঁটা পেটা করতে ইচ্ছে করে, পুরুষদের সেই বেহায়া বেলাজ নারীদের। অথচ কবিতা গল্প ছবি আঁকায় ভালোবাসায়, জীবনে সংসারে সেই নারীর আঁচল তল না হলে জীবন চলে না পুরুষদের। লেখায় আঁকায় সৌন্দর্য বর্ণনা করে অপার মহিমায় নারী দেহের। আবার নারীর প্রেমে ব্যর্থ হয়ে হতাসা আর ধিক্কার পাওনা হয় নারীর কপালে। ভালোবাসায় সার্থক হয়েও পরকিয়ায় ডুবে যায় অনেক পুরুষ, সুন্দরী নারী ঘরে রেখে।
অপমান নির্যাতন করে পুরুষ, নারী শিশু জন্ম দেয়ায়। কত নারী সন্তানকে মেরে ফেলেছে পুরুষ এই পৃথিবীতে। কত ভ্রুণ হত্যা হয় নারী শিশু জন্ম নিবে বলে, নারীরাও মেনে নেয় পুরুষের কথা, মানতেই হয় না হলে সংসারে অশান্তি।
নারীরাও নিয়ম মেনে নারীদের প্রতি অত্যাচার করে। মেয়ে শিশু জন্ম দেয়ার জন্য কত বধু হয় অত্যাচারিত। সংসার ভাঙ্গে। অথচ পুরুষ এই বিজ্ঞানের যুগেও জানে না। সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার বিষয়টি নির্ধারতি হয় পুরুষের দেয়া, ওয়াই ক্রোমজন, থেকে। নারীর কোন ভূমিকা নেই । অথচ অত্যাচারিত হয় নারী কষ্ট করে একটি সন্তান জন্ম দেয়ার পরও।
আরবে মেয়ে শিশু জন্ম নিলে মেরে ফেলা হতো। ভারতে সতী দাহ ছিল নারীদের স্বামীর সাথে জীবন্ত পুরিয়ে ফেলার জন্য।
উত্তর ভারতে এই দু হাজার উনিশের খবর, একটিও নারী শিশু জন্ম নেয়নি। কারণ কেউ মেয়ে সন্তান চায় না। গর্ভে মেয়ে শিশু জেনেই গর্ভপাত করে ফেলেছে মা নিজে ভয়ে বা পরিবারের চাপে।
চীনে নারীর সংখ্যা এমন কমে গেছে কিছু এলাকায় এখন তাই সরকার নিয়ম করে দিয়েছে একজন নারীকে দুজন পুরুষ বিয়ে করতে পারবে।
নারীরা চাইলে কিন্তু পুরুষের জন্ম নেয়া বন্ধ করে দিতে পারে। সব পুরুষ ভ্রুণ যদি নারীরা ফেলে দেয়, কেমন হবে তা হলে এই পৃথিবী।
নারীরা গড়ে তুলতে পারে বেগম রোকেয়ার নারীর স্থান। অনেক নারী এখন র্স্পাম ব্যাঙ্কের র্স্পাম নিয়ে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। কিছু দিন আগে অদ্ভুত এই খবরটি দেখলাম।
মহিলাটি একা নিজস্ব একটি সন্তানের মা হতে চেয়েছিলেন। যেখানে পরিবারে পুরুষের প্রভাব থাকবে না। সন্তানটিকে নিজের ভালোবাসায় নিজের মতন গড়ে তুলবেন। এবং তাই করেছেন।
সন্তানটি যখন পঁচিশ বছরের এখন সে তার বায়োলজিক্যাল বাবাকে খুঁজতে চেয়েছে মায়ের অনুমতি নিয়ে। পুরুষটি ভুলেও গিয়েছিল তার র্স্পাম দেয়ার কথা। অথচ বহু বছর পরে সে জানতে পেল সে একটি সন্তানের বাবা।
নারীরা ঋতুমতি হয়। অথচ এই ঋতুমতি হওয়া যে জীবন চক্রের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। ঋতুমতি না হলে সে নারী হয় বন্ধ্যা সে নারীর অপমানের সীমা পরিসীমা নেই। পুরুষ ধর্ম এই জীবন চক্রের বিষয়টিকে নৃশংস করে তুলেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে।
প্রতিমাসের রক্তপাত একটা নারীকে সতেজ রাখে। দেয় নারীর সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষমতা। অথচ এই রক্তপাতের সময় নারীকে সরিয়ে রাখা হয় স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকেও কত রকমের নিয়মে। আবার অর্ঘ হিসাবে দেয়া হয় প্রথম ঋতুমতি হওয়ার পর পুরোহিতের ভোগে।
মায়া নামের একটা মুভি দেখেছিলাম। প্রথম পিরিয়ড হওয়ার পর, বাচ্চা মেয়েটাকে সাজিয়ে গুজিয়ে পুজা প্রার্থনা করে মন্দিরে নিয়ে যায় বাবা মা মহা আনন্দে শুদ্ধ করার জন্য।
বাচ্চাটির পিঠাপিঠা ভাইটির, অস্থির হওয়া ছাড়া বড় মানুষ সবাই নির্বিকার হয়ে সহ্য করছিল মেয়েটির চিৎকার। বরং তারা জেনে শুনে সহযোগীতা করছিল মন্দিরের অনেক পুরুহিতের একের পর এক বাচ্চা মেয়েটির সাথে যৌন কাজ করাকে। এটাই নিয়ম শুদ্ধ হওয়ার আর শুদ্ধ করানোর জন্য ঐ গোত্রের । প্রতিটি মেয়েকে ঐ জঘন্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, ধর্মের নিয়ম মেনে।
ক্যাথলিক নানদের ধর্মের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে দিতে হয়। জৈবিক সাধ আহলাদসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অনেক ইচ্ছা সম্বরন করে রাখতে হয়। কিন্তু প্রিস্টদের মনের সাধ তাদের পুরন করতে হয় এবং তার খেসারতও দিতে হয় শাস্তি পেয়ে।
দোররা মেরে বা অর্ধেকটা মাটিতে পুতে দিয়ে নারীদেরই মারা হয় ব্যাভিচার করার জন্য। অথচ কাজের সাথে জড়ত থাকে পুরুষ তাদের কোন দোষ থাকে না।
কিছু দিন আগে একটি ডকুমেন্টারি দেখলাম। যেখানে দেখানো হয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কী ভয়াবহ ভাবে নরক যন্ত্রনা দেয়া হয় নারীদের।
হিন্দু ধর্মে বিশেষ করে নারীর পিরিয়ড থাকার সময়টাকে নারীকে অচ্ছুত ভাবা হয়। একটি নারীর বিয়ের দিন পিরিয়ড হয়ে গেলে, তাকে একা একটি কুড়ে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়। সেখানে সে একাকী জীবন যাপন করবে যে কয়দিন ঋতুমতি থাকবে। একা সেই কুড়ে ঘরে থাকা নতুন বধু মেয়েটি ধর্ষিত হয় ।
নতুন বিয়ে করা স্বামীর বন্ধু এবং পাড়ার ছেলেদের দ্বারা। ব্যাস নারীটির বিয়ে ভেঙ্গে গেল এই ঘটনার কারণে। সব দোষ তো এই মেয়েটিরই। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে তৈরি, এই পুরস্কার প্রাপ্ত হিন্দি ছবি মহারাষ্ট্রের একটি গ্রামের, নারীদের অচ্ছুত জীবনের ঘটনা নিয়ে তৈরি গাওকোর- একটি পিরিয়ড হাউস।
ছবিটি দেখে থমকে গিয়েছিলাম নারীদের এ সময়ে এমন দূর্ভোগের অবস্থা জেনে। কিন্তু ডকুমেন্টারিতে দেখানোর চেয়ে কঠিন কিছু জানার বাকি ছিল তখনও। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে জানলাম আরেক ভয়াবহ বাস্তব খবর।
উত্তর প্রাদেশের ত্রিশ চল্লিশ বছরের নারী কর্মিরা ইচ্ছা করে নিজেদের জরায়ু অপারশন করে ফেলছে অল্প বয়সে। কারখানায় খেটে খাওয়া এই শ্রমিক নারীরা পিরিয়ডের সাতদিন কাজ করতে পারে না। যে কাজই তারা করুক তাদের ভাবা হয় অচ্ছুত সে সময়। ধর্মের বিধান মেনে নারীদের সব কিছু থেকে দূরে রাখা হয় এই কয় দিন।
আপনি যত ভালো বেতনের কাজই করুন। যদি যে কোন কারণে আপনার মাইনে কাটা হয় বা কম দেয়া হয় কেমন লাগবে আপনার?
আর এই নারীরা তো শ্রমিক। দিন আনা দিন রোজগারের মানুষ। প্রতি মাসে সাতদিন যদি তারা কাজ না করে, বেতন না পায়, জীবন চালানো কষ্টের তার চেয়ে জীবন চলুক বেতন আসুক। জীবনের স্বাভাবিকতা বন্ধ হয়ে যাক জীবিকার কাছে।
ধর্মের জন্য এমন নিপীড়ন অচ্ছুত ভাবনা এখনও জড়িয়ে বসে আছে, কারখানার মালিক যারা নাকি বিশাল আয় করে।
এদের মানসিকতা কোন পর্যায়ের।
আতুরঘর বলে একটা কথা আমাদের দেশে প্রচলিত। আমাদের অনেক নারীকে অস্বাস্থ্যকর এই আতরঘরেই জন্ম দিতে হয়েছে মানব সন্তানদের। মানুষের জন্ম বিষয়টিকে মানুষ নোংরা অচ্ছুত ভাবে দূরে সরিয়ে রাখে। আর সবচেয়ে কষ্ট ভোগ করে নারী সেখানে। বাচ্চা হওয়ার সময় যখন যথেষ্ট যত্ন, পরিচ্ছন্নতা খাওয়া দাওয়া প্রয়োজন। নানা রীতি নীতি মেনে অনেক কিছু থেকে রাখা হয় বঞ্চিত করে।
নারী আর কত অপমান যন্ত্রনা বইবে ধরায়।
যে শরীর নিয়ে তারা জন্মেছে তা থেকে যে জীবন চক্র তারা পেয়েছে এর কোন কিছুই পুরুষ, স্বাভাবিক ভাবতে পারে না কেন নারীর শরীরের ভিতরে জন্ম নিয়ে।
নারী না থাকলে পুরুষের জন্মই হতো না এই পৃথিবীতে। কিসের এত পুরুষ, হওয়ার গর্ব পুরুষের।
কিসের জন্য আলাদা করে রাখা নারীদের। কবে থেকে শুরু হলো নারীদের অবমাননা করা, সামাজিক ভাবে,ধর্মের নামে দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রাণী ভাবা। কর্ম ক্ষেত্রে দেশে বিদেশে যৌন হেনস্থা হয় অসংখ্য নারী। আর পুরুষরা এই সব তাণ্ডব ঘটায়। আজকের তাজা খবর নিউইয়র্ক মেয়রের বিরুদ্ধে কয়েকটি মেয়ে অভিযোগ এনেছে যৌন হেনস্থার।
ঘরে ঘরে এখনও অবমাননার চূড়ান্ত অসুখী জীবন কাটায় নারীরা। এই সব নারী অধিকার দিবস পালন করে, কেন এখনও নারীর অধিকার আদায়ের কথা বলতে হবে। অনেক নারী অসচেতন জীবন যাপন করে, বেঁধে দেয়া সামাজিক, ধার্মিক, পারিবারিক, নিয়ম রীতি মানার জন্য। যদি বা এর মধ্যে কেউ বুঝে ফেলে নির্যাতন, কথা বলে অধিকার নিয়ে তবে তার বিষ দাঁত ভেঙ্গে দেওয়া হয়।
অধিকার আদায়ের জন্য এখনও সব কিছুতে প্রতিযোগীতা করতে হয় নারীদের। অথচ নারী ছাড়া পৃথিবী বিরান।
নারীদের দুঃসহ জীবন ভাবলেই কষ্ট লাগে। তবে বাড়ছে সচেতনতা এটা আশার কথা। গুটিকয় স্বাধীন মানবীর সাথে সামিল হোক, সারা পৃথিবীর সব নারী, মুক্ত আকাশে উড়ুক তারা আনন্দে। ভুলে যাই আমরা, বিশেষ করে নারী দিবস পালনের কথা, নারীর অধিকার আদায়ের জন্য আর কোন দিন পালন নয়। নারী আলাদা কোন প্রাণী নয় মানুষ সমান অধিকারে নিয়ন্ত্রিত না হয়ে, নিজেই নির্ধারন করুক নারী নিজের জীবনের চাল চলন।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




