
তোরাব আলি নাম তার যদিও কেউ কেউ আলি ডাকে আবার কেউ কেউ তোরাব। এ নামের অর্থ কি সে জানে না। জানতে চায় ও না। তোরাব আলি মুর্খ মানুষ হলেও জানে " নামে কি আসে যায় কর্ম হইল আসল! যেইডা মরলেও লগে যাইব। "
মাঘ মাসের শীতে কাঁপতে কাঁপতে তোরাব পুস্করিণীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তখন ফজর ওয়াক্ত। ফরজ গোসল করতে আসছে। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে তোরাবের স্ত্রী জুলেখা খুব ভালো করে জমিনের খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে মালিশ করে দিয়েছে। তখন তোরাব জুলেখার চোখে চোখ রেখে বলেছিল " বউরে! তোর নরম হাত ছুঁইলেই মোরে শইলডা আপনা আপনি গরম হইতে থাকে ! "
জুলেখা হাসে ওর গজদন্ত থাকাতে কি যে লাগে কুপির আলোতে যেন এক টুকরা হীরা চমকায় ! তোরাব ইশ! বলে জুলেখাকে আবার কাছে টানে কমলার কোয়ার মতন ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে ভুলে যায় ভেতরকার কষ্ট।
তোরাব প্রায় সময় বলে " বউরে তুই আমার সুখের পাখি দুখের দাওয়াই! " জুলেখা খালি হাসে আর তেরছা চোখে পঁয়ত্রিশ বছর এর মানুষটারে মাপতে থাকে ভাবতে থাকে।
মনে মনে বলে মানুষ টা কি সরল! অথচ বিছানায় গেলে যেন একটা দীর্ঘদিনের উপোষ বাঘ ! জুলেখা অবশ্য বলে, মরদ তো এমনই হওয়া চাই সময় সময় বাঘ সময় সময় মাঘ মাসের পুস্করিণীর জলের মতন ঠান্ডা!
তোরাব এদিক সেদিক দেখে কাউরে দেখা যায় কি না? না কোন জন মানব নাই।আসার সময় দেখছে রান্ধন ঘরের এক কোণায় লালু নামের কুত্তাটা গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে। আঁধারে যদিও লালু তোরাবকে চিনে নিল কিন্তু লালুর তেমন আগ্রহ নেই তোরাবের প্রতি।চারপাশে তখন ঘুটঘুটে আঁধার। হালকা উত্তর এর বাতাস তোরাবের বুকটাতে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। তোরাব আল্লাহ রাসুলের নাম নিয়ে গায়ে পেঁচানো খয়েরী রঙ এর চাঁদর আর লুংগী,গামছা ঘাটের পেয়ারা গাছটার ডালে রেখে পুস্করিণীর ঠান্ডা জলে নিজেকে সঁপে দেয়।
একেতো মাঘ মাস তারউপর কচুরিপানায় ঠাসা পুস্করিণী! হাপুসহুপুস করে একসাথে দশ বারোটা ডুব দিয়ে দম ছাড়ে।যতবার ডুব দিয়েছে ততবার মনে হয়েছে এই শেষ আর না এমন শীত যে গায়ের ভেতর নড়ে উঠে। রক্ত যেন জমতে শুরু করে দেয়।
যেই তোরাব উঠতে যাবে দেখে জুলেখা দাঁড়িয়ে এক হাতে কুপি অন্য হাতে একটা কিসের যেন প্যাকেট। তোরাব ঘাটের কাছে এসে জিগাইল কি এটা? জুলেখা নীচু গলায় জবাব দেয় হালিম ভাই এর বউ দিছে। বিলেতি সাবান! ঢাহা বড় শহর থাইকা আনছে।
শরীরে মাখলে সুন্দর গন্ধ নাকি কয় সারাদিন। জুলেখা হাসি ধরে রেখে বলে। তোরাব কাঁপতে কাঁপতে কয় " তাইলে এতদিনকার তোর শরীরের সুবাসেই তো আমার শরীরে অন্য একটা সুবাস থাকতো ! "এই সাবান দিয়া উহা নষ্ট করতে মন না চাহে।
জুলেখা একটু ধমক দিয়ে বলে, দূর !খালি উলটাসিধা কথা। ধরেন তো শরীরে মাখেন! তোরাব আর কথা না বলে সাবানখানার রঙিন মোড়ক ছিঁড়তে থাকে তারপর খুব দ্রুত সাবান ঘষতে থাকে শরীরে। জুলেখা এদিক সেদিক দেখছে কেউ এই সকালে ঘাটে দেখলে কলংক হয়ে যাবে। গেরামের মাইনষে কি বলবে এসব যখন ভাবছে তোরাব তখন ডাক দিয়ে কইল আসলে সাবানের ঘ্রানটা সেইরকম অনেকটা বেলীফুলের ঘ্রাণ ! পিঠটা একটু ডলে দেও দেহি।
জুলেখা আবার এদিক সেদিক দেখে হাতের কুপিখানা খুব সাবধানে রাখে যাতে বাতাসে নিভে না যায় ! তোরাবের ঠান্ডায় নীল হওয়া ঠোঁট হাসি ধরে রেখে বলতে থাকে " কুপিরে সামলাইয়া কয়দিন রাখবা?একদিন ফুরুত ! "
জুলেখা তোরাবের দিকে চোখ বড় করে তাকায় রাগের স্বরে বলে খালি মুখে আকথা কিছু আটকায় না ! বিয়ান বেলায় এসব কয় কেউ ?
জুলেখার ফর্সা পদ যুগল আস্তে আস্তে নরম মাটিতে পড়ে। জুলেখা তোরাবের কাছে এসে বসে সাবান চেয়ে হাতে নিয়ে পিঠে ঘষতে থাকে। আর আবদার করে আমারে একদিন বড় শহরে নিয়া যাবা? হুনছি ঐ হানে বড় বড় দালান, গাড়ি ঘোড়া চলে। আর মেয়ে মানুষ নাকি ধলা মুলার লাহান ধলা ! আর ব্যাটা মাইনষে নাকি লুংগী পড়ে না পায়জামা আর অমন কি পইড়া থাকে তারপর গলায় নাকি খাটো একখান রশির মতন কি ঝুলাইয়া আফিস করে !
তোরাব জিগাইল কে কইছে? হালিম ভাই এর বউ উত্তর দেয় জুলেখা। আর কি কইছে তোরাব জিগায়? আরো তো কত কথা কইছে এদের নাকি লাজ শরম কম! হাতা কাটা ব্লাউজ আর পাতলা শাড়ী পড়ে ! জুলেখা বলতে থাকে এক শ্বাসে।
তোরাব হাসতে হাসতে কয় নদীর পাড়ে দেখি গেরামের বহু মাতারি হুদা কাপড় পইড়া উদলা গতরে নাহায়! এদের শরম কই গেল ? জুলেখা ঠোঁট ফুলিয়ে জবাব দেয় অতশত বুঝি না আমারে বড় শহরে নিয়া যাইবা এইডা পাকা কথা। তোরাব আইচ্ছা বইলা মাথা নাড়ে ।
এর মধ্যে তোরাব জিগায় তুমি গোসল করবা না?এখনো আন্ধার আছে। কেউ উঠে নাই। এ কথা বলতে না বলতেই পুকুর পাড়ের হিজল গাছ থেকে একটা রাতজাগা পাখি উড়ে গেল। খোয়াড়ে বন্দী মোরগ ডাক দেয় কুককুরুক্কু কু! কবুতর করে বাক-বাকুম!
তোরাব বলতে লাগল, " দেখছ হালার কারবার, সব হালায় সজাগ! "
( বাকি অংশ পরে....)
১০ নভেম্বর ২১ ( বুধবার )
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০২১ ভোর ৪:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



