আজ আমার স্নেহময়ী জননীকে নাটোরের মিশন হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম ডাক্তার দেখানোর জন্য। বিদেশী ডাক্তার এসে রুগী দেখেন। সপ্তাহে তিন দিন নাক-কান-গলার চিকিৎসা দিয়ে থাকেন খুব কম খরচে। ডাক্তার মহাশয় খুব যত্ন করে রুগীদের সেবা দিয়ে থাকেন।অত্যন্ত কম খরচ, সেবার মান অনেক ভালো হওয়া এবং মিশনের স্টাফদের আন্তরিক ব্যবহারের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে মূলত মধ্যবিত্ত ও গরীব মানুষেরা সেবা নিতে আসেন এখানে। শেষ রাত থেকে মানুষ এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন একটি টিকিট পাওয়ার প্রত্যাশায়। এখানে একটি টিকিট মানে সোনার হরিণ কারণ ডাক্তার মহাশয় প্রতিদিন ৩০০ জন রুগী দেখেন। আমি সকাল ৬ টার সময় গিয়ে দেখি কয়েকশ লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আর বেলা বাড়ার সাথে সাথে লাইনের আকারও বাড়তে থাকে। যাই হোক আমি যে জায়গাটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে চাচ্ছি সেটি হল, লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে দেখে আমার মধ্যে একটা ভাবনা উঁকি দিয়ে গেল। লাইনে দাঁড়ানো লোকগুলো মুলত হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এখন যদি কোন হিন্দু ভদ্রলোককে খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তার কাছ থেকে নেতিবাচক উত্তরই পাবেন। খ্রিস্টান ধর্ম একটি স্লেচ্চ ধর্ম, ওরা সবকিছু খায়, ওদের মিশন চালানোর মধ্যে অন্য একটি উদ্দেশ্য নিহিত আছে আর সেটি হলো গরীব ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরকে লোভ দেখিয়ে ধর্মাত্মর করে ইত্যাদি ইত্যাদি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাসে দেখেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বেলগাছিয়ার ভিলা বাড়িতে রাতের বেলা খ্রিস্টান বন্ধুদের নিয়ে মদপান ও মাংস আহার করা এবং একসাথে হই হুল্লোড় করার কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুমা দিগম্বরী দেবী দ্বারকানাথের সাথে এক বিছানায় রাত্রি যাপন করা থেকে বিরত ছিলেন। আর তিনি পুরোহিত ডেকে কিভাবে স্বামীর অপকর্ম থেকে নিজেকে দূরে রেখে তাঁর নিজ ধর্ম পালন করবেন তার ব্যবস্থাপত্র নিয়ে দিনগুলি অতিবাহিত করেন এবং এই স্লেচ্চদের কাছ থেকে তার শুচিতা করতে গিয়ে অচিরেই তার প্রাণ বিসর্জন দেন।
এখন যদি একজন ইসলাম ধর্মের অনুসারীকেও খিৃস্টান ধর্ম সম্পর্কে বলা হয় তিনিও ঠিক নেতিবাচক উত্তরই দিবেন। তিনি বলবেন খ্রিস্ট ধর্ম হলো ইসলামের শত্রু ওরা ইসলামের ঈসা নবীকে ছিনতাই করে নিয়ে ওদের পয়গম্বর বানিয়েছেন। খ্রিস্টান ধর্মের সাথে ইসলাম ধর্মের যে ক্রুসেড হয়েছিল সেখানে অসংখ্য মুসলিম শহীদ হয়েছেন। আর বর্তমানে খিৃস্টান ধর্মের অনুসারী আমেরিকা হচ্ছে ইসলামের বড় শত্রু । ওদের সাথে বন্ধুত্ব করা একেবারেই সাজে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই হলো খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের একটি বড় অংশের মানুষের সাধারণ ধারণা।
আমার ধর্ম সম্পর্কে অতটা জানশোনা নেই বা আমি কোন ধর্ম বিশারদ নই । ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি আমার অনেক ভালো লাগে। বিশেষত এই অনুষ্ঠানগুলি মানুষের মনে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। খ্রিস্টান ধর্মের সেবার দিকটি সত্যি অসাধারণ। অনেকেই হয়তো বলবেন ওরা সেবার আড়ালে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে। সেটি একটি দিক হতে পারে কিন্তু এর বাইরে যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটি হলো খ্রিস্টান মিশনগুলোতে সেবার উদার মানসিকতা। খ্রিস্টান পাদ্রীরা ধর্ম প্রচার করতে আসেন ঠিকই কিন্তু চার্চগুলোকে উনারা প্রার্থনার পাশাপাশি একটি অসাধারণ সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এটি মনে হয় চার্চের একটি মানবিক সাফল্য।
আমাদের দেশে হাজার হাজার সুদৃশ্য মন্দির ও মসজিদ আছে। এবং দিন দিন এগুলোর সংখ্যা বাড়ছে। এই মন্দির ও মসজিদ গুলোকে কি আমরা সেবাধর্মী কাজে ব্যবহার করতে পারি না! না হয় এগুলোর বাইরের দৃশ্য একটু কম আকর্ষনীয় হলো। প্রত্যেক উপজেলায় আমরা যদি একটি মন্দির ও একটি মসজিদকে প্রার্থনালয়ের পাশাপাশি সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তাহলে এই গরীব দুঃখী, আর্ত পীড়িত মানুষগুলো একটু ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা পাবেন। তাদের আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে উঠবে না আকাশ বাতাস। বরংচ তাদের হাসিমাখা দীপ্তিময় সরল মুখগুলো দেখে স্বয়ং বিধাতাও আত্মতৃপ্ত হবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



