ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের “নীল-গোলাপি-সাদা” ইত্যাদি দল মিলেমিশে এখন লাল! স্বার্থের জন্য সবাই এখন এক।
সাইয়িদ রফিকুল হক
দুনিয়াতে নিজের স্বার্থ নাকি পাগলেও বোঝে! আর সুস্থ-মানুষতো তার ষোলোআনা স্বার্থ বুঝে নেওয়ার জন্য একেবারে দিশেহারা। মানুষ এখন একচুল স্বার্থ-বিসর্জন দিতে নারাজ। ‘বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার’। আর সবাই এখন বুদ্ধিমান! তাই, দুনিয়াতে অবাধে এখন চলছে স্বার্থখেলা। আর সমাজে চলছে “সাধারণ বুদ্ধিখেলার” প্রতিযোগিতা।
জ্ঞান না হলেও এখন সমাজ চলে। আর সমাজে চলা যায়! কিন্তু চালাকি, শঠতা, ধূর্ততা, আর সাধারণ বুদ্ধি এখন সকলেরই আরাধনার বস্তু।
শিক্ষক জাতির নমস্য। কথাটি সত্য। একেবারে চিরসত্যবাণী। আমরা শিক্ষকদের কাছে পড়েছি। কিন্তু পরিবারে মাতাপিতার কাছে আমাদের প্রথম হাতেখড়ি হয়। পরিবারই আমাদের প্রথম বিদ্যালয়। তবে এটি অনানুষ্ঠানিক। এরপর আমরা বিদ্যালয়ে প্রবেশ করি। শুরু হয় আমাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। আর আমাদের শিক্ষাজীবনে বিশাল প্রভাববিস্তার করে আছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। এরপর আমরা উচ্চশিক্ষার জন্য গমন করি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে, আমরা উচ্চশিক্ষালাভের পথ তৈরী করি। কিন্তু আসলে কি আমাদের উচ্চশিক্ষা অর্জন করা সম্ভব হয়?
তবে ব্যক্তিগতভাবে এখনও আমরা স্বশিক্ষিত হওয়ার চেষ্টাই করছি।
জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবিরাম ধর্মঘটে গিয়েছেন। তাদের দাবি: সচিবদের পদমর্যাদায় তাদের বেতন-ভাতা-সবকিছুই দিতে হবে। তারা সচিবদের চেয়ে কম নেবেন না। খুব ভালো কথা।
কিন্তু মহাশয়, আপনাদের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই: আপনাদের চেয়ে এইদেশে এতো-এতো আর বেশি-বেশি বেতন-ভাতা, আর বিবিধ সুযোগ-সুবিধা আর কারা পেয়ে থাকে? আপনাদের সুখের শেষ নাই। আপনাদের আনন্দের সীমা-পরিসীমা নাই। আর আপনারা ক্লাসে পাঠদানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তবুও আপনাদের কেন এই দীনতা? আর এই কি আপনাদের শিক্ষকসুলভ আচরণ?
আপনারা মনে হয় ভুলে গেছেন, এদেশের “শিক্ষার” “মূল-ভিত্তিস্তর” হচ্ছে: “বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান” ও “সরকারি প্রাইমারি” স্কুলগুলো। এদেশের ৯৮ভাগ মানুষের শিক্ষাদান করে থাকে দেশের “বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা”। সরকার তাদের স্কেল-অনুযায়ী শুধু মূলবেতন দিয়ে থাকে। আর তারা বাড়িভাড়া-বাবদ পায় মাত্র ৫০০ টাকা, আর চিকিৎসা-ভাতা পায় মাত্র ১৫০ টাকা। আর তারাও শিক্ষক। আর সরকার বেতন দেয় সত্য। কিন্তু এতে তাদের এখনও মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। আর এরা কিন্তু পরিশ্রম কারও চেয়ে কম করেন না।
আর আমাদের দেশের প্রাইমারি-স্কুলের শিক্ষকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলে থাকেন। এলাকার ডানপিটে-বখাটে থেকে শুরু করে ভালো-মন্দ সব শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব তাদের। আর আপনারা তাদের বেতন-স্কেলটা একটু দেখেছেন? প্রাইমারি স্কুলের একজন “সহকারী শিক্ষক” বর্তমানে বেতন পান সর্বনিম্ন-স্কেলে। আর প্রাইমারি স্কুলের “হেডস্যাররা” বেতন পান সর্বনিম্নের চেয়ে সামান্য একটু উপরে। তবুও তারা ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে যাচ্ছেন। আর দেশের সিংহভাগ মানুষের শিক্ষাদানকারী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় লক্ষ-লক্ষ শিক্ষক নামকাওয়াস্তে বেতনে শিক্ষকতার মহান পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর তারাও শিক্ষক। তারাও মানুষ। আপনারা দেশের এতোবড় বুদ্ধিজীবী! তাদের কথাটা কোনোদিন একটু ভেবেছেন? তাদের কথা ভাবার একটু সময় কি আপনাদের হবে? আপনারা আর কতোকাল এভাবে নিজের স্বার্থে রাস্তায় নামবেন? আর শুধু নিজের স্বার্থটাকে কতোকাল এভাবে বড় করে দেখবেন?
নিজেদের স্বার্থে আপনারা একজোট। কিন্তু দেশের স্বার্থে একজোট নয়:
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন “শিক্ষক-কর্তৃক” কোনো ছাত্রী যৌননির্যাতনের শিকার হয়, তখন তা ধামাচাপা দিতে সব দল এক হয়ে যায়। আর তারা ছাত্রীটিকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা চালায়। কতোরকমের “তদন্ত-কমিটি” গঠিত হয়। আর সেইসব তদন্ত-কমিটির সামনে বারবার ছাত্রীটিকে জেরা করা হয়। তবুও তার অভিযোগ সহজে আমলে নেওয়া হয় না। অভিযুক্ত-পাপিষ্ঠ কোনো শিক্ষককে শাস্তি দিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বুকটা ফেটে যায়। তখন তারা শিক্ষকের সম্মান বাঁচাতে একজোট! আর এখন বেতন ও মর্যাদা বাড়াতে একজোট! কিন্তু একাত্তরের চিহ্নিতযুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আপনারা একজোট হতে পারলেন না। কী সমস্যা আপনাদের? তখন দেখি নীলদল শুধু চেঁচায়! আর গোলাপি দল ঝিমায়! কিন্তু হলুদ-সাদা কী করছে? কী সমস্যা আপনাদের মহাশয়? আর দেশের স্বার্থ কি আপনাদের স্বার্থের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
আর নীলদল, আপনাদের এখন লজ্জা করছে না, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বী-সাদাদলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে? সামান্য স্বার্থ কি এতোই প্রয়োজন? কবে হবে আপনাদের বোধোদয়। আর কবে পাবে এই দেশ এই জাতি, একজন শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী এবং একজন শহীদ অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহার মতো মহান শিক্ষক।
আপনারা সব ছেড়ে দিয়ে ক্লাসে ফিরে গিয়ে আত্মসমালোচনা করুন। আর দেশ-জাতি ও মানবতার কথা ভাবুন। স্যার, আপনাদের এভাবে মানায় না।
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

