somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাইয়িদ রফিকুল হক
আমি মানুষ। আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষ বলে আমার ভুলত্রুটি হতেই পারে। বইপড়তে আমার ভালো লাগে। সাহিত্য ভালোবাসি। লেখালেখি আমার খুব শখের বিষয়। বাংলাদেশরাষ্ট্র ও গণমানুষের জন্য আমি লেখনিশক্তিধারণ করেছি।

গল্প: আমাদের মা

১৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গল্প: আমাদের মা
সাইয়িদ রফিকুল হক

আশফাক সকালে খুব তাড়াহুড়া করে অফিসে যাচ্ছিল।
সে প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। এখানে, পান থেকে চুন খসার কোনো সুযোগ নাই। সামান্য একটু বিলম্ব হলেও বড়সাহেব মুখভার করেন। আর কারও এরকম পর-পর দুইদিন হলে তিনি তাকে তার কক্ষে ডেকে রীতিমতো অফিসিয়াল ‘ল’ বুঝাতে থাকেন। এসব কথা ভেবে আশফাক আজকাল সকালে ঠিকভাবে খেতেও পারে না। কোনোরকমে দুটো রুটি পেটে পুরে সে অফিসের দিকে ছুটতে থাকে।
আজও সে তাড়াতাড়ি খাচ্ছিল। খাওয়ার ফাঁকে-ফাঁকে সে বিছানায় শোয়া তাদের একমাত্র মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছিল।
তাদের একমাত্র মেয়েটি এখনও ঘুমাচ্ছে দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। নইলে তিন বছরের মেয়েটি জেগে উঠলে আশফাকের অফিসে পৌঁছুতে আরও বিলম্ব হবে।
আশফাক কোনো কথা বলছিল না দেখে তাহমিনা ওর সামনের চেয়ারটা টেনে বসলো। তারপর একটু সময় নিয়ে বললো, “তুমি কি তাহলে আজই তোমার মাকে আনতে গ্রামে যাবে?”
‘তোমার মা’ কথাটা শুনে আশফাক প্রথমে কিছুটা রাগান্বিত হলো। পরে সে নিজেকে সংযত করে বললো, “হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। আর একথা তো আমি তোমাকে গতরাতেই বলেছি। এটা নিয়ে নতুন করে এখন কথা বলার আর কী আছে?”
কথাটা শেষ করে সে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তাহমিনা কয়েক মিনিট সময় নিয়ে বললো, “উনি গ্রামের মানুষ গ্রামেই থাকুক। উনাকে এখানে টেনে আনার কোনো প্রয়োজন আছে কী?”
আশফাক এতে খুব রাগান্বিত হলেও নিজের রাগটা ষোলোআনা সামলে নিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বললো, “প্রয়োজন আছে মানে? একশ’বার প্রয়োজন আছে। মাস চারেক হলো আমাদের বাবা মারা গিয়েছেন। এখন মা সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছেন। আমরা দুই ভাই-ই শহরে থাকি। তাছাড়া, আমি মায়ের বড় সন্তান। আমার দায়িত্ববোধটা একটু বেশি হওয়া উচিত। ছোটভাইটা ওর ওখানে মাকে নিতে চেয়েছিল। আমি নিতে দেইনি। কারণ, ওরা দুজনেই চাকরি করে। সারাদিন ওদের বাসায় মা একা-একা থেকে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তারচেয়ে আমাদের বাসাটা মায়ের জন্য অনেক সুবিধার। এখানে, তুমি সারাদিন বাসায় থাকো। আর অফিসছুটির পরে আমি তো আছিই। তারউপরে আমাদের কন্যা আতিয়া মাকে ব্যস্ত রাখতে পারবে। এতে মারও ভালো লাগবে। তাছাড়া, মা ঢাকায় এলে তিনি মাঝে-মাঝে ছোটভাইটার ওখানেও যেতে পারবেন।”
সে একটু থেমে তাহমিনার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “এতে তো তোমার খুশি হওয়ারই কথা। একটা মানুষ কাছে থাকলে আমাদের কত লাভ! কত উপকার! আর সবচেয়ে বড় কথা—তিনি আমার মা। এখন আমাদের মা। তোমারও তো তিনি মা হন। অথচ, তুমি মাকে আগের মতো এই সাতসকালে ‘তোমার মা’ বলে উল্লেখ করলে! এতে আমি ভীষণভাবে লজ্জিত হয়েছি।”
আশফাকের শেষের কথাটায় তাহমিনা যেন জ্বলে ওঠে। সে ভয়ানক রেগে বললো, “তুমি তোমার মাকে আনতে গ্রামে যাবে না। আমি উনার সঙ্গে একসাথে থাকতে পারবো না। উনি এলে আমি এই বাসা ছেড়ে চলে যাবো। তোমার মায়ের সঙ্গে আমার এডজাস্টমেন্ট হয় না।”
আশফাক এত উত্তেজনার মধ্যেও নিজের মাথাটা ঠাণ্ডা রেখে খুব শান্তকণ্ঠে বললো, “বেশ তো, তুমি না থাকলে না থাকবে। তাতে এমনকিছু আসে যায় না। কিন্তু আমার মা আমার বাসায় আমার সঙ্গেই থাকবেন। তার কারণ, আমি মায়ের সন্তান। মা আমাকে পেটে ধরেছেন। মাকে আমার বুকে ঠাঁই দিতেই হবে। আর তুমি মায়ের সঙ্গে থাকতে পারো না—এটা তোমার ব্যর্থতা । এতে আমাদের মায়ের কোনো দোষ দেখি না। তিনি তোমাকে কত স্নেহ করেন! কত ভালোবাসেন! তবুও তোমার এত আপত্তি কীসের? আসলে, তোমাদের মতো মেয়েরা আজকাল মানসিক রোগে ভুগছে। তাই, নিজেদের স্বার্থের বাইরে তারা আর কোনোকিছু ভাবতে পারছে না।”

এরপর আশফাক খাবার শেষ করে উঠে পড়লো। সে গেইট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তাহমিনার উদ্দেশ্যে বললো, “আমার ফিরতে একদিন দেরি হতে পারে। তুমি আজই আম্মাকে এখানে আসতে বলো। একা বাসায় তোমাদের সমস্যা হতে পারে।”
সদর দরজা বন্ধ করে তাহমিনা কিছুক্ষণ গুম হয়ে সেখানেই বসে থাকে। তার চেহারাটা এসময় খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। আসলে, সে খুব অল্পে রেগে যায়। সেই স্কুলজীবন থেকে তার এমনটি হচ্ছে।

আশফাক ঠিক সময়ে আজ অফিসে পৌঁছুতে পেরেছে। অফিসে ঢুকেই সে বড়সাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করলো। আজকে আধাবেলা অফিস করাসহ সে একদিনের ছুটি চেয়ে নিলো। তার কাজেকর্মে খুশি বলে বড়সাহেব এতে আপত্তি করলেন না।

আশফাক আগে থেকে তার মাকে কিছুই জানালো না। সে একেবারে কাছে গিয়ে মাকে চমকে দিতে চায়। তার মা খুব চাপাস্বভাবের মানুষ। শত দুঃখকষ্টেও তিনি সন্তানদের জড়াতে চান না। গ্রামে যে তিনি ভালো নাই—তা আশফাক অনুমানে বুঝতে পারে। তাই, সে মাকে তার নিজের কাছে এনে রাখতে চায়।

দুপুরের লাঞ্চটা কোনোরকমে সেরে আশফাক সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। এখন তার মনে দারুণ আনন্দ। প্রায় মাস তিনেক হলো মায়ের সঙ্গে তার দেখা হয় না। বাবার চেহলামের পর সে আর গ্রামে যায়নি। মাকে তখন সে কিছুটা অসুস্থ দেখে এসেছিল। প্রতিদিন সে ফোনে মায়ের খোঁজখবর রেখেছে। তবুও সে মনে করে, মায়ের সঠিক খবর সে পাচ্ছে না। কারণ, মাকে ফোন করলেই তিনি বলতেন, ‘আমি খুব ভালো আছি বাবা। তোমরা ভালো থেকো।’ অফিসের ছুটি ম্যানেজ করতে না পারায় আজ যাই কাল যাই করে সে বড় বিলম্ব করে ফেলেছে। একসময় সে দারুণ অনুশোচনায় ভুগতে থাকে।

সন্ধ্যার অনেক পরে সে গ্রামে পৌঁছুল।
গ্রামে বিদ্যুৎ আছে। তবুও সে দেখলো, মায়ের ঘরে একটা টিমটিমে বাতি জ্বলছে। সে বুঝলো, পল্লীবিদ্যুৎ আগের মতোই ভেল্কি দেখাচ্ছে। এদের আসা-যাওয়ার কোনো টাইম-টেবিল নাই। এরা খুব স্বাধীন আর দারুণ স্বেচ্ছাচারী।
সে ঘরের দরজার কড়া নাড়তেই ভিতর থেকে তার মায়ের গলার আওয়াজ পেল। সে শৈশবের দুরন্ত কিশোরের মতো বলে উঠলো, “তাড়াতাড়ি দরজা খোলো মা। আমি তোমার আশফাক।”
দরজা খুলতেই আশফাক মাকে জড়িয়ে ধরলো। তার চোখে প্রায় জল। কিন্তু মা হেসে বললেন, “কী যে আনন্দ হচ্ছে আমার! একটা খবর তো দিতে পারতিস বাবা। আজ সকালেও তো তোর সঙ্গে কথা বললাম। তবুও কিছু জানতে দিলি না!”
আশফাক সত্যটা গোপন করে বললো, “হঠাৎ এসে পড়লাম মা। তাই, আগে থেকে তোমাকে কিছুই জানাইনি।”
মায়ের হাসি দেখে আশফাকের মন ভরে গেল।
এতদিন পর এ-বাড়িতে হঠাৎ বেশি আওয়াজ শুনে পাশের বাড়ির চাচি ছুটে এলেন। তিনিও আশফাককে দেখে খুব খুশি হলেন। আরও কয়েকজন এলেন পরে।
আশফাক দেরি না করে সবার সামনে বললো, “চাচি, মাকে নিতে এসেছি। এখন থেকে মা আমার সঙ্গে ঢাকায় থাকবে। মাঝে-মাঝে বাবার কবর জিয়ারত করার জন্য আমরা আসবো।”
ছেলের কথা শুনে রাবেয়া বেগম আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। পাড়াপড়শিরা বললেন, “খুব ভালো হয়েছে বাবা। এই তো চাই। তুমি ছেলের মতো কাজ করলে বাবা। আমরা একজন কথা কওয়ার মানুষ হারালেও বুবু’র সুখের কথা ভেবে আমরাও খুশি।”
রাবেয়া বেগম বড়মুখ করে বললেন, “আমার বড় বৌমা কত ভালো। আমাকে নিতে আশফাককে পাঠিয়েছে। হবে না! বৌমা আমার কত শিক্ষিত! এমএ পাস যে!”
এসময় আশফাক ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার-আকাশের তারাগুলো দেখতে থাকে।

ঢাকায় ফিরে আশফাক দেখলো, তাহমিনা রাগ করে বাবার বাড়ি চলে যায়নি। তার শাশুড়ি গতকালই এসেছেন। সে তাকে দেখে খুশি হলো। সালাম দিলো ভক্তিসহকারে।
এমন সময় তাহমিনা স্বামীর হাত ধরে তাকে নিজেদের শোবার ঘরে নিয়ে খুব বিনীতভাবে বললো, “আমার মাকে এখানে কিছুদিন রাখতে চাই। বড়ভাবি, মেজভাবি, ছোটভাবি মায়ের সঙ্গে আজকাল খুব খারাপ ব্যবহার করে।” কথাটা শেষ করতেই ওর চোখে পানি চলে এলো।

আশফাক একটু হেসে তাহমিনার চিবুক ছুঁয়ে বললো, “তোমার মা আমার মা—এসব কী? আজ থেকে ভালোবেসে বলবে: আমাদের মা। উনারা দুজনেই আমাদের মা। আমাদের হাতে এখন দুই-দুইটা বেহেশতো! আল্লাহ আমাদের অনেক সামর্থ্য দিয়েছেন। আমরা এই দুটো মাকে চিরদিন ধরে রাখতে পারবো।”

তাহমিনা এবার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে স্বামীর বুকে মাথা রাখলো। তার চোখে এখন আনন্দাশ্রু।


সাইয়িদ রফিকুল হক
১৫/০৪/২০১৯




সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:২১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×