somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে হত্যা করা হোক, অস্ত্র দিয়ে নয়.....

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ৯:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে হত্যা করা হোক, অস্ত্র দিয়ে নয়.....

আমি যখন একেবারে ছোট তখন শুনেছিলাম যে, বাংলাদেশর স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কত নির্মম ও পৈশাচিকভাবে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। আমার জীবনে শোনা নির্মম ঘটনা গুলোর মধ্যে এটিই প্রথম। এরপর জাতীয় চার নেতা, কর্নেল তাহের সহ পাকিস্তানীদের দ্বারা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য যাঁদেরকে ১৯৭১ইং সালে হত্যা করা হয়েছিল তাদের কথা শুনলাম। আরেকটু যখন বড় হলাম তখন বেগম খালেদা জিয়াকে দুই সন্তানসহ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বসে কাঁদতে দেখলাম। পাশের দেশ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরাগান্ধী যাঁর রাজনীতি তখন বুঝতাম না, কিন্তু তাকে দেখতে আমার খুব ভাল লাগত। তার গেটআপ, হেয়ার স্টাইল, কথা বলার ধরণ, হাঁটাচলা ইত্যাদি পেপারে এবং টিভিতে দু’একবার দেখেছিলাম। তিনি অনেক বড় একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এটি আমাকে শিহরিত করত। এই বুদ্ধিমতী নারীকে ১৯৮৪ সালে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর ছেলে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হলেন। ১৯৯১ সালে তাঁর হত্যাকান্ডের পর আত্নঘাতী বোমা বলে পৃথিবীতে একটি পৈশাচিক হত্যা কৌশলের সাথে আমি পরিচিত হলাম এবং ভাবতে খারাপ লাগল। যখন আমি কলেজে পড়ি সেসময় আমার এক চাচা পাকিস্তানে চাকরি করতেন। তিনি একদিন আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। বেড়ানো শেষে যাওয়ার সময় আমার কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন যে, পাকিস্তান থেকে আমার জন্য কি নিয়ে আসবেন? আমি ওনাকে বলেছিলাম যে, “বেনজীর ভূট্টো যে রকম পোশাক পরে সে রকম একটি ড্রেস আমার জন্য নিয়ে আসবেন। ওনার ড্রেসগুলো আমার খুব ভাল লাগে। একজন লম্বা, সুন্দর ক্ষমতাশালী মহিলা কেমন সাদাসিধা সুন্দর পোশাকে চলাফেরা করেন, আমার দারুন লাগে।” ২০০৭ইং সালে হঠাৎ যখন তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই তখন তাকে কিভাবে হত্যা করা হল তা দেখে কষ্ট লাগল। ২১শে আগস্ট ২০০৪ ইংসালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলা চালানো হয়-যে হামলায় শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও অনেক গণ্য মান্য ব্যক্তিরা নিহত ও আহত হন। এছাড়া মাঝে মাঝে ডিসকভারিতে ও নেটে দেখা যায় যে, ১৯৬৩ ও ১৮৬৫ইং সালে আমেরিকার দু’জন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেভী ও আব্রাহাম লিংকন কিভাবে গুপ্ত হত্যার শিকার হয়েছিলেন।
আমার এখন রাজনীতি বোঝার ক্ষমতা হয়েছে এবং রাজনীতি সম্পর্কে আমার একটি বিশেষ দর্শনের প্রতি আস্থা আছে। রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষে থাকা যেসব ব্যক্তিরা আজ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের চক্রান্তে হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার যে নীতিসমূহ ছিল তা আমি পছন্দ করিনা। কিন্তু তাদের হত্যাকান্ডকেও কখনও মেনে নিতে পারিনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিসমূহকে ১৯৭৫ইং সালের ১৫ আগষ্টের পূর্বে এদেশের অনেকের তখন পছন্দ হয়নি। কিন্তু তাই নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার প্রতিপক্ষদল কতটুকু যুক্তিতর্ক বাকবিতন্ডা করেছিল ? তাঁর সমালোচনাই বেশী করেছিল সবাই। জনগণ এবং আরও অনেকে তাঁর সমালোচনা শুনতে শুনতে তাঁর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কতবার ক্ষমতা বদল হল, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সময়ে দেশ যেমন শাসিত হত তার চেয়ে খুব ভাল শাসনকাল কি আমরা পরে পেয়েছি ? না পাইনি। বিশ্বের যত শাসককে এ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে তাঁদেরকে হত্যা করে মূলত শাসনব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি বা জনগণ তেমন অভিনব কোন কিছু লাভ করতে পারেনি। তবে এসব চর্চা কেন? এসব হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে কুৎসিত, বিভৎস, অমানবিক কাজের চর্চা ব্যতীত আর কোন কিছুই লাভ করা যায়নি,যাবেনা।
এছাড়া এই পৃথিবীতে আরও কতযে মুক্তমনা বিজ্ঞানী, ধার্মিক, সাহিত্যিক, কবি ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের জনপ্রিয় ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য গবেষক, লেখক হুময়ুন আজাদের “নারী” বইটি আমার খুব ভাল লেগেছিল। অনেক বিজ্ঞান সম্মত তথ্য ও তত্ত্বে ভরপুর এই বইটি মানুষকে উপহার দেওয়ার কথা ভাবতাম একসময়। একদিন দেখলাম তার পেছনে গুপ্ত হত্যাকারীরা লেগে গেছে এবং ফেব্রুয়ারী ২০০৪ ইং তারিখে দুষ্কৃতিকারীদের দ্বারা তার উপর যে নির্মম আক্রমণ হয়েছিল তারই ফলস্বরূপ তিনি এই নির্মম পৃথিবী থেকে ১২ আগস্ট ২০০৪ ইং সালে চির বিদায় নেন। আমি ভাবতে পারিনা যে, কি করল হত্যাকারীরা! এখন পর্যন্ত সব দেশের মত এদেশেও বিজ্ঞান মনষ্ক এবং ধার্মিকদের মধ্যে যারা উদার দৃষ্টিতে মানব সমাজকে দেখে, মূল্যায়ন করে- তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে। কোনটির বিচার হচ্ছে আবার কোনটির বিচার হচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানব সমাজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে বন্দী হয়ে আছে কেন?
একটি প্রবাদ বাক্য আছে যে, “বোবার কোন শত্রু নেই।” এই প্রবাদ বাক্যটি যারা জীবনে ধারন করে আছে তারাও কি আদৌ শান্তিতে আছে ? তারাও সর্বদা কখনও প্রত্যক্ষে কখনও পরোক্ষে সমাজের ভিতরে থাকা নানা রকম কুৎসিত নিয়ম কানুনের যন্ত্রনায় ছটফট করছে এবং সামাজিক কুশিক্ষা, অপসংস্কৃতির বিভৎস হুমকির মুখে বেঁচে আছে। ভদ্র, সভ্য, উচ্ছ্বল এক তরুণী তনুসহ হলি আর্টিসানে জঙ্গীদের পাশাবিক অত্যাচারের শিকার ব্যক্তিরা এবং দেশে বিদেশে আরও যারা গুপ্ত হত্যা বা সাধারণ হত্যার মধ্য দিয়ে তাদের মূল্যবান জীবনটা হারাচ্ছেন তাদের বেশীর ভাগই সমাজের উন্নতির জন্য মতভেদ সৃষ্টিকারী কোন মতামত সৃষ্টি করেনি এবং সমাজের কাউকে কখনও বিরক্তও করেনি। কিন্ত তারা নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছে, হচ্ছে। রাষ্ট্র বা সমাজ এর কোন স্থায়ী সমাধান বের করতে পারছেনা। কতক্ষণ জাতিসংঘ, কতক্ষণ ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, কতক্ষণ একশ একটা মানবাধিকার সংস্থা বড় বড় কথা বলে, কিছু লোক দেখানো কাজকর্ম দেখিয়ে তাদের দায় শেষ করছে। কিন্তু এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের উপর, এক মতের মানুষ অন্য মতের মানুষের উপর অন্ধ, মূর্খের মত প্রায়ই চড়াও হতে হতে গুপ্তহত্যা, সাধারণ হত্যা এবং আরও নানারকম অপরাধ করেই যাচ্ছে। আমরা ঘরে-বাইরে, শিক্ষাঙ্গনে অন্যের মতামতের প্রতি সহনশীল হওয়ার শিক্ষা লাভ করিনা। ফলে মতাদর্শে মিল না হওয়া, রাষ্ট্রক্ষমতায় মনের মত ব্যক্তিকে বসানো, ব্যাক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ইত্যাদি যে কোন ক্ষুদ্র সমস্যা বা লাভের জন্য মারামারি, কাটাকাটি, হত্যাযজ্ঞ চালানোর সংস্কৃতি সারাবিশ্বসহ বাংলাদেশেও বর্তমান রয়েছে। কিন্তু একটুখানি উদার দৃষ্টিভঙ্গী যদি আমাদের মধ্যে তৈরি হয় তবে এরকম বর্বরতাগুলো সমাজে থাকে না। যাদের মতামত যতবেশী কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অবাস্তব, কাল্পনিক তারা ততবেশী উগ্র, দুর্বল ও নোংরা হয়। ধর্ম কিংবা বিজ্ঞান কোনটিই নিজ নিজ মতামত প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ হত্যা করতে বা মানুষকে অত্যাচার করতে বলেনি। যদি কারও চিন্তা উন্নত হয় এবং আমরা তা প্রচার করি, চর্চা করি তবে অনুন্নত চিন্তা পরাস্ত হবে। সবল ব্যক্তি যেমন দুর্বল ব্যক্তিকে প্রয়োজন হলে মারামরিতে হারিয়ে দিতে পারে , মাথার উপর তুলে আছাড় মারতে পারে তেমনি অনুন্নত, অবৈজ্ঞানিক চিন্তাকে উন্নত, যৌক্তিক, বিজ্ঞান সম্মত মতামতের দ্বারা ধ্বংস বা হত্যা করতে পারলে সমাজ, সভ্যতার সুস্থ পথে বিকাশ লাভ করা সম্ভব, তা না হলে নয়। দেহবল দিয়ে, অস্ত্রের বাহাদুরী দিয়ে মানুষের মতামতকে ধ্বংস করার চিন্তা, চেষ্টা আর মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করা একই কথা। যদি আমরা এখনও সভ্য হতে না পারি তবে আমাদের এই বলে ঘোষণা দেয়া উচিত যে, মানব সমাজ পশু সমাজের চেয়েও খারাপ এবং এই সমাজকে পাহারা দেওয়ার নাটক সাজিয়ে লাভ নেই, অবাধে ধ্বংস হয়ে যাক এই সমাজ। চিরতরে আমাদের পাপ মুক্তি ঘটুক।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ৯:৩৪
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বঙ্গভঙ্গ থেকে চব্বিশ, পূর্ব বাংলার ইতিহাস ও বাংলাদেশের আত্মপরিচয়

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমান সময়ে একটি বিরাট পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে যা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং আত্মোপলব্ধির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ পনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:১১

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানল পত্রিকা পড়ে: তাহলে দূতাবাসের কাজটা কী?

১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×