ভারত টিপাইমুখ পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশ কোন্ ধরনের এবং কী পরিমাণ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে সে সম্পর্কে সরকারের কাছে কোন তথ্য নেই। এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য সমীক্ষা চালানোর কথা থাকলেও এখনো তা হয়নি। ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সমীক্ষাটি চালানোর বিষয়ে কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছে। এখনো পর্যন্ত তাতেও কোন অগ্রগতি নেই। কবে নাগাদ সমীক্ষাটি চালানো হবে তাও নিশ্চিত নয়। যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ভারত ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশকে টিপাইমুখ বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেও ৩১ বছরেও এককভাবে বাংলাদেশ সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কোন উদ্যোগ নেয়নি।
অবশ্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ওয়াহিদ উজ জামান গতকাল সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, টিপাইমুখ ড্যামের কারণে বাংলাদেশের কোন ক্ষয়ক্ষতি হবে না। কেননা ভারত বাংলাদেশকে লিখিতভাবে জানিয়েছে এই প্রকল্পে তারা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। পানি প্রত্যাহার করবে না। তবে এ বিষয়ে গত ১৯ মে সচিবালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ভারত টিপাইমুখে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু ড্যাম নির্মাণ করলে বাংলাদেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে পানি আটকে রাখলে ক্ষতি বেশি হবে। আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানাবো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় টিপাইমুখে শুধু ড্যাম নির্মাণ করা হলেও বাংলাদেশ নানামুখী বিপর্যয়ের শিকার হবে। আর ড্যামের পাশাপাশি ফুলেরতলে ব্যারেজ করলে বিপর্যয় হবে ভয়াবহ। বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ও যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আইনুন নিশাত বলেন, ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য টিপাইমুখে শুধু ড্যামও নির্মাণ করে তবুও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রথমে পানি আটকাবে তারপর নির্দিষ্ট পরিমাণে ছাড়বে। এতে করে বর্ষার শেষে একটু বেশি বৃষ্টি হলেই ভাটিতে বন্যার আশংকা বেড়ে যাবে। নিয়মিত পানি ছাড়ার ফলে শুকনো মৌসুমেও পানি প্রবাহ বেশি হবে। ফলে হাওর অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ হলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা অঞ্চলে প্রয়োজনের সময় পানি থাকবে না আবার যখন পানি কম দরকার হবে তখন বেশি আসবে। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাটি শুকিয়ে যাবে, ফসল উৎপাদন কমবে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। পরিবেশগত বিপর্যয় হবে।
যৌথ নদী কমিশনের সাবেক একজন সদস্য ইত্তেফাককে বলেন, অনেক আগে থেকেই টিপাইমুখ প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথ সমীক্ষা চালানোর প্রস্তাব দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এতে কোন সাড়া না দেয়ায় সমীক্ষাটি হয়নি। বর্তমানে সমীক্ষা চালানোর আবারও উদ্যোগ নেয়া হবে জানিয়ে জেআরসির এক সূত্র ইত্তেফাককে বলেন, এ ধরনের কোন বাঁধ বা ব্যারেজ যাই হোক তাতে কিছু না কিছু ক্ষতি হবেই। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে সে সম্পর্কে বাংলাদেশের কাছে কোন তথ্য নেই। ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ করতে যৌথ সমীক্ষা চালানোর বিষয়ে ভারতের সঙ্গে এখনো আলোচনা চলছে। সর্বদলীয় সংসদ সদস্য ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশী প্রতিনিধিদল টিপাইমুখ প্রকল্প পরিদর্শন করে আসার পর এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে। জেআরসির আগামী বৈঠকে যৌথ সমীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ।
ভারত ২০১২ সালের মধ্যে এই ড্যাম নির্মাণ কাজ শেষ করার পরিকল্পনা করেছে। ড্যামের কারণে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের মনিপুর ও মিজোরাম রাজ্য মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে সেখানেও প্রতিবাদ হচ্ছে।
প্রকাশিত সংবাদের ব্যাখ্যা
গত ৪ জুন দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘টিপাইমুখ প্রকল্প পরিদর্শনে এক সপ্তাহের মধ্যে কমিটি’ শীর্ষক রিপোর্টের একটি অংশের প্রতিবাদ করেছে যৌথ নদী কমিশন। গতকাল সোমবার জেআরসির সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রিপোর্টে ‘জেআরসির ৩৬তম সভায় বাংলাদেশ টিপাইমুখ প্রকল্পের আওতায় ব্যারেজ নির্মাণ না করার বিষয়ে ভারতের লিখিত সম্মতি দাবি করলেও ভারত তা দেয়নি’ বলে জেআরসির সাবেক সদস্য তৌহিদুল আনোয়ার খানের যে উদ্ধৃতি ছাপা হয়েছে তা সঠিক নয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বৈঠকে ভারতীয় পক্ষ উল্লেখ করে যে, টিপাইমুখ প্রকল্পে কোন সেচ কম্পোনেন্ট নেই এবং এ প্রকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বন্যার প্রকোপ প্রশমন করবে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিশ্চয়তা দাবি করলে ভারত নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, ফুলেরতলে ব্যারেজ নির্মাণ করার কোন অভিপ্রায় ভারতের নেই।’
প্রতিবেদকের বক্তব্য
জেআরসি রিপোর্টের যে অংশের প্রতিবাদ করেছে তা ছিল তৌহিদুল আনোয়ার খানের বক্তব্য। এ বিষয়ে গতকাল তৌহিদুল আনোয়ার খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি আবারও বলেন, ঐ সময়ে আমার জানা মতে, ফুলেরতলে ব্যারেজ নির্মাণ না করার বিষয়ে ভারত কোন লিখিত নিশ্চয়তা দেয়নি। শুধু ফুলেরতল নয় টিপাইমুখ থেকে সিলেটের অমলসীদ পর্যন্ত কোন ধরনের ব্যারেজ নির্মাণ না করার নিশ্চয়তা চাইলে তারা সে নিশ্চয়তা দেয়নি। বিষয়টি তারা পরে জানাবে বলে জানিয়েছে ।
View Link : Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



