somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি শ্লোক : চারটি রহস্যভেদ

০৬ ই মে, ২০১৪ রাত ১০:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কচ্ছপের স্মরণে মাকড়সার মরণে
হট্টিটি পৃষ্ঠে কুমিরের দৃষ্টে.. !

আপনারা যাঁরা নিয়মিত আমার ছাইফাস পড়েন তাঁরা জানেন, আমার সমস্ত গল্পের আধার, আমার গল্প বলার আদর্শ আমার বাবা। আপনি যে প্রসঙ্গই বলুন না কেন আপনাকে পরপর কয়েকটি গল্প শুনিয়ে দেবেন তিনি, কোন গল্প দিয়ে যে কোথায় কোন সবক দেবেন তা আগেভাগে বুঝতেও পারবেন না আপনি। এসব গল্প ছেলেবেলা হতেই শুনে এসেছি। অবশ্য আমাকে তিনি কোনদিন কোন গল্প বলেননি। আমি শুনেছি সব কান পেতে। আপনাদের আমি বিভিন্ন প্রসঙ্গে যেসব দৃষ্টান্তমূলক গল্প বলি, তার অধিকাংশই আমার বাবার বলে যাওয়া।

আমার বাবা শিক্ষিত ছিলেন না তেমন। পড়তে পেরেছিলেন সেকালের চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত। পরে আর্টসের দিকে ঝোঁকেন। সার্টিফিকেইট না থাকুক, শিক্ষিতদের টেক্কা দিতেন যেকোন ব্যাপারে। এই ক্ষুদ্র বিদ্যা দিয়েই তিনি চার বছরের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বাবাকে সবখানে পরিচয় করিয়ে দিতেন "ব্যারিস্টার" বলে। এমনই কথার ওজন ছিল তাঁর!

আমি তাঁর হাতের লেখা অনুকরণ করার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু অত সুন্দর অক্ষরচেতনা আমার হয়ে ওঠেনি আজও। যাইহোক, বাবা সম্পর্কে ২০১২ সালে এখানে একবার লিখেছিলাম, আপনারা সেই লেখাটা আরেকবার পেতে অনেকবারই অনেকে অনুরোধ করেছেন, আলসেমির কারণে হয়ে ওঠেনি। আলসেমি আজও করব। আজও লিখব না।

বাবার গল্পপ্রচার সম্পর্কে আরেকটু বলি, সক্রেটিস মারা যাওয়ার পর প্লেটো তাঁর বাণী প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এবং প্লেটো যত যা বলেছেন, সব কথার শেষে প্রত্যেকবার উল্লেখ করেছেন যে, এ কথা আমার নয়, এ কথা পরম গুরু সক্রেটিসের!
ব্যাপারটা নিরেট ভক্তি আর শ্রদ্ধার।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যেন গল্পবক্তা হিসেবে কোথাও স্বীকৃতি না পাওয়া আমার বাবারই প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছি, তাঁর গল্প প্রচারের মাধ্যমে।

তাঁর সম্পর্কে আপনাদের অবশ্যই বলব, আপনারা তাগাদা দিতে থাকুন।

এবারে আসি উপর্যুক্ত শ্লোকটির ব্যাখ্যায়। শ্লোকটি শুনেছিলাম বাবার কাছে। এত যুগ পরে এখনও স্পষ্ট মনে আছে আমার। যুবক বয়সে শিক্ষকতাকালে এই শ্লোক ক্লাসে বলতে গিয়ে একটু থমকে গিয়েছিলাম। কোথায় যেন অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ মনে হচ্ছিল। তখন আরো দুটি পঙ্ক্তি জুড়ে দিয়ে উপমাটি সুগম করলাম।
পরিমার্জিত করে লিখলাম,


//কচ্ছপের স্মরণে মাকড়সার মরণে
হট্টিটি পৃষ্ঠে কুমিরের দৃষ্টে
কালে কালে বিজনে প্রাণীকুল সৃজনে
মাতাকুল অনুরূপ করে ভূপৃষ্ঠে।//

এখন কি কিছু আঁচ করতে পারছেন?

মাস দুই আগে এখানে প্রকাশ করা "অবন্তি তুমি কোথায়" কবিতাটিতে আমি লিখেছিলাম, "কচ্ছপের ডিম নিত্য আমায় টানে"। সেদিন কেউ এর রহস্যভেদ করতে পারেননি। আজ সেই রহস্য আমি ভাঙিয়ে দিচ্ছি।

যাঁরা মনোযোগী পাঠক এবং যাঁরা বাংলাকে অনুভব করেন, বোঝেন, তাঁরা হয়ত এতক্ষণে কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছেন। যদি না পারেন তবে সে দুর্ভাগ্য আমার নয়, দুর্ভাগ্য বাংলা ভাষার।

খেয়াল করলে দেখবেন, আমি ওখানে "প্রাণীকুল সৃজনে" কথাটি ব্যবহার করেছি। থাক, মেলাতে পারবেন না, সহজ কথায় বলি, ওই শ্লোকটিতে বলা হয়েছে চারটি প্রাণীর জন্মকথা বা রহস্য।

কচ্ছপ, মাকড়সা এবং কুমির আপনারা চেনেন। হট্টিটি চিনবেন বলে মনে হয় না। বুদ্ধদেব বসু আর হুমায়ূন আহমেদের প্রভেদ এবং দুর্ভাগ্য এখানেই।

হট্টিটি মানে হচ্ছে টুনটুনি।
টুনটুনি পাখি যখন ডিম পারে, তখন সে চিন্তাগ্রস্ত হয়। সে আকাশ দেখে আর ভয় পায়। ভাবে, ওই আকাশটার তো কোন খুঁটি নেই! যদি ভেঙে পড়ে?
আহা, যদি ভেঙে পড়ে তবে আমার ডিমগুলোর কী হবে ? আমার এত সাধের ডিমগুলো !

এই হচ্ছে মাতৃমনের মমতার সহৃদ অভিব্যক্তি। টুনটুনি আর রাতে ঘুমাতে স্বস্তি পায় না। পাছে আকাশ ভেঙে পড়ে ডিমগুলো গুড়িয়ে যায় এই ভয়ে সে চিৎ হয়ে ঠ্যাং দুটো আকাশের দিকে খাড়া করে দিয়ে পিঠ দিয়ে ডিম তা দেয় আর ভয়ে ভয়ে রাত কাটায়। আকাশ যদি ভেঙেই পড়ে তবে পা দিয়ে সে আকাশকে ঠেকিয়ে ধরে পরম মমতার ডিমগুলোকে রক্ষা করবে এই তার প্রতিজ্ঞা বা ভরসা! এই না হলে মাতৃমন!

টুনটুনির ছানা এভাবেই সৃষ্টি হয়।

ওভারব্রিজের তল দিয়ে হাঁটার সময় আমারও মনে হয় মাথায় একটা ছাতা ধরে রাখলে তবে ওভারব্রিজ ভেঙে পড়লে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যেত হয়ত!


এবার বলছি কুমিরের কথা।
কুমিরের ডিম তা দিতে বেশ সময় লাগে। কিন্তু কুমিরের যা স্বভাব, একনাগাড়ে বেশিক্ষণ পানি ছাড়া থাকতে পারে না। ডিম তো আর পানিতে বসে তা দেয়া যায় না।
তাই কুমিরের আছে ডিমে তা দেয়ার এক অভিনব প্রযুক্তি।

সে ডিমগুলোকে ডাঙায় বা তীরে রেখে সূর্যের দিকে মুখ করে পানিতে গিয়ে বসে। সূর্য যেদিকেই থাক, চোখের মাধ্যমে আলোক প্রতিফলন দ্বারা সে সৌরতাপকে কেন্দ্রীভূত করে তার ডিমের ওপর ফেলে। ডিম তাপ পায়। বাচ্চা ফোটে। ছানা সৃষ্টি হয়।
(টীকা দ্রষ্টব্য)

কচ্ছপের কথা বলব সবার শেষে, মাকড়সার মরণের ব্যাপারটি আপনাদের সবারই জানা আছে। মা মাকড়সা তার ডিম্বথলি নিজ পেটে বয়ে বেড়ায়। একটি থলিতে যতদূর মনে পড়ে দশহাজার পর্যন্ত ডিম থাকতে পারে। ওই ডিম থলিতে "তা" পায়, ডিম ফোটে, বাচ্চা সৃষ্টি হয় আর সে বাচ্চা মুক্ত পরিবেশে বের হবার ক্ষমতা না পাওয়া পর্যন্ত আহারস্বরূপ নিজের মায়ের শরীরের মাংসই খেতে শুরু করে। যেদিন শরীরটি সম্পূর্ণ খাওয়া শেষ হয়, মা মাকড়সার মৃত্যু হয়, সেদিনই মাকে খাওয়া বাচ্চারা বাইরে বেরিয়ে আসে। এই তার রহস্য।

আজ মা দিবস নয়। মা দিবস কবে আমি সে হিসেব রাখি না, দরকারও নেই তার। এই হলো মা। আত্মত্যাগ ও আত্মবিসর্জনের প্রতিভূ মা। এই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন । সর্বোৎকৃষ্ট ভালোবাসাটুকু মাকে দিতে চেষ্টা করুন।
বাঘিনী মা আর বেড়াল মায়ের নবজাতক নিয়ে সংগ্রামের কথা আপনারা জেনে নেবেন।

লেখার স্পেইস শেষ। কচ্ছপের স্মরণে দিয়ে অভীষ্ট সমাপ্ত করি। কচ্ছপ ডিম পাড়ে বালিতে গর্ত করে। তার পরে সে ডিমের কথা ভুলে যায়। পানিতে নেমে মা কচ্ছপ সেই যে সাঁতার শুরু করে, আর তার খবর থাকে না। ডিম ওভাবেই বালি চাপা থাকে, চাই কি বছরের পর বছর। একদিন হঠাৎ মা কচ্ছপের স্মরণ হবে যে, আরে, আমি না অমুক জায়গায় সেবার ডিম পেড়ে এলাম! আহা, কোথায় আমার বাচ্চা?

যেখানেই থাকুক, সেদিনই ডিমগুলো ফুটে ছানা সৃষ্টি হয়।

খুঁৎ ধরতে আসবেন না। মন্তব্যে টীকা দেখুন। উত্তর পাবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০১৪ রাত ১২:২৯
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×