somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজ সমাচার

২৯ শে অক্টোবর, ২০১৪ সকাল ১১:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেক দিন হয় গালগল্প মারা হয় না। আজ মুখ উসখুস করছে। রাজ সমাচারে যেসব গল্প বলা হবে তা অভিনব নয়, এগুলোর অনেকই হয়ত আপনাদের শোনা আছে। তবুও বলি, কিজানি হয়ত এ প্রজন্ম এসব পায়নি।

১.
এক সেনাপতির মনে বড় অসন্তোষ। মন্ত্রী ব্যাটা দিনরাত রাজার কানের কাছে বসে বসে কূট কূট করে, আর বেচারা সেনাপতিকে ময়দানে ময়দানে যুদ্ধ করতে হয়। অথচ বেতনের বেলায় ওই মন্ত্রীই পায় তার দ্বিগুণ!

একদিন সে আক্ষেপ করে কথাটা বলেই ফেলল রাজাকে।

রাজা শুনে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, শুনলাম রাজগোয়ালে নাকি একটি কুকুর বাচ্চা দিয়েছে! যাও তো দেখি, খবর নিয়ে এস।

সেনাপতি খবর নিয়ে এল।

খবর এনেছ?
জ্বী মহারাজ।

ঘটনা সত্যি?
জ্বী।

কয়টি বাচ্চা দিয়েছে?
তা তো দেখিনি।

যাও, দেখে এস।

সেনাপতি দেখে এল।

দেখেছ? কয়টি বাচ্চা?
আজ্ঞে, সাতটি।

পুরুষ কয়টি, নারী কয়টি?
আজ্ঞে, তা তো দেখিনি।

যাও, দেখে এস।

দেখে এল সে।

এবার?
হুজুর, তিনটি পুরুষ, চারটি নারী।

আচ্ছা। কোনটির কী রং?
সেনাপতি এবার মাথা চুলকায়।

রাজা এবার মন্ত্রীকে ডাকলেন এবং কুকুরের খবর নিয়ে আসতে বললেন। মন্ত্রী খবর নিয়ে এল।

বল মন্ত্রী, ঘটনা সত্যি?
জ্বী, হুজুর।

কয়টি বাচ্চা?
আজ্ঞে, সাতটি।

কয়টি নারী, কয়টি পুরুষ?
হুজুর, তিনটি পুরুষ, চারটি নারী।

কোনটির কী রং?
হুজুর, দুইটি লাল এবং সাদা, চারটি সাদা এবং কালো আর একটি পুরোই সাদা।

এবার রাজা সেনাপতির দিকে ফিরলেন। সেনাপতিকে আর কিছু বলতে হল না। বেতনের পার্থক্য সে এবার টের পেয়েছে।

মোরাল: যোগ্য কাজে যোগ্য লোকই লাগে। সবাইকে দিয়ে সব হয় না।

২.
এক রাজ্যে তুমুল যুদ্ধ হল। যুদ্ধ শেষে পরাজিত রাজা তাঁর মন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। কী যুদ্ধ করল তোমার বাহিনী যে হেরে গেলে?

মহারাজ, আমার বাহিনী যুদ্ধে প্রাণপণে লড়েছে। পিছপা হয়নি। সম্মুখ সমরে প্রাণ দিয়েছে। আমি একাই বধ করেছি দুই সহস্রাধিক শত্রুসৈন্য!

রাজা বললেন, তুমি বা তোমরা কী করেছ সেটা কথা নয়, তোমরা যে যুদ্ধে হেরেছ সেটাই বড় কথা!

এই গল্পের মোরাল নিজেরা বুঝে নেবেন।

৩.
এক রাজার গোপন বাসনা জাগল, তিনি কুচো খাবেন। কুচো চেনেন তো? সাপও না ব্যাঙও না, কুইচ্যা।

এমন ন্যাক্কারজনক বাসনা কি আর সবখানে বলা যায়? তিনি অতঃপর বললেন তাঁর উজিরকে। উজির ব্যাবস্থা করল এবং রান্না করলেন রাণী নিজ হাতে, যাতে আর কেউ না জানে। রান্না শেষে রাণী গেলেন গোসলে। কুচো ছিল সরা (ঢাকনা) দিয়ে ঢাকা।

রাজা বিচার সভা সেরে এসে খাবেন। কিন্তু এদিকে বেড়াল এসে সে কুচো খেয়ে বসল। সব খেয়ে খেদানোর সময় কেবল মাথা আর লেজটা রেখে পালিয়েছে।

এমন মর্মান্তিক খবর রাজাকে তুরন্ত দিতেই হবে। খবর নিয়ে উজির ছুটে এল রাজসভায়। সবার সামনে তো আর কুচোর কথা বলা সম্ভব নয়, বুদ্ধিমান উজির তাই চেঁচিয়ে বলল, মহারাজ, সর্বনাশ হয়ে গেছে!

মহারাজসহ সবাই তাজ্জব। কী সর্বনাশ হয়েছে?

হুজুর, আপনার কুচবিহারে তো আক্রমণ ঘটে গেছে!

রাজার পেট মোচড় দিল। বলো কী? কখন?
হুজুর, এই একটু আগেই খবর পেলাম!

কে আক্রমণ করেছে? কার এত দুঃসাহস?
হুজুর, চৌকিতলার বাঘমাসি!

মহারাজ ঢোক গিলে বললেন, আহা হা, এ কী অঘটন!

সভার অন্যরা বেকার মত মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

তা, আমাদের মহাকর্ত্রী? সে ছিল না?
মহারাজ, সে তো নদীয়ায়!

ওহ, তাহলে ঢাকনবেগ? সে ছিল না?
ছিল তো।

তবে?
আরে সে তো প্রথমেই কাইত! একদম ঘায়েল, উল্টে পড়ে আছে!

উফ! কী বীভৎস!
রাজার কণ্ঠে অকৃত্রিম আকুতি ঝরে পড়ল।

তা, ক্ষয়ক্ষতি?
প্রায় সব বেদখল।

একটা অঞ্চলও রক্ষা পায়নি?
আজ্ঞে, লেঙ্গুরখোলা আর মাথাব্দি নগর!

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা বললেন, কী আর করা তবে? আমি নাহয় ওই দুই নগর নিয়েই আপাতত সন্তুষ্ট থাকছি। আর উজিরে আজম, তুমি যত দ্রুত সম্ভব কুচবিহারের নতুন পথ আবিষ্কারের কাজে মন দাও!
জে আজ্ঞা।

৪.
মানুষের মন বড় বাকপ্রবণ, কেবলই বলতে চায়। না বলে স্বস্তি পায় না। আর তা যদি হয় কোন গোপন ঘটনা, তবে তো কথাই নেই। এক রাজার এমনই এক গোপন কথা ছিল। সে এমনই কথা যে, জানাজানি হলে রাজার আর মানসম্মান থাকবে না। অনেক কষ্টে রাজা তা মনের মধ্যে চেপে রেখেছেন। কিন্তু কতদিন আর? মনটা কেবলই আকুলিবিকুলি করে কাউকে না কাউকে বলার জন্য। এমন কথা বৌকেও বলা চলে না। অবশেষে রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন পরম বিশ্বস্ত বন্ধু উজিরকে সে কথা বলার। তিনি অতঃপর উজিরকে তা বললেন এবং হুঁশিয়ার করে দিলেন, এই কথা যদি ঘুণাক্ষরেও তোমার মুখ দিয়ে বের হয়, তবে তোমার গর্দান যাবে!

এবার এই গোপন কথাটা বলে দিয়ে রাজা তো স্বস্তি পেলেন, কিন্তু উজিরের শুরু হল অস্বস্তির পালা। বেচারার তো পেট ফুলে ঢোল হয়ে গেছে কথাটা শোনার পর। এমন কথাটা চেপে রাখতে গেলে বুঝি সে পেট ফেটেই মারা যাবে!

ওদিকে রাজা কথা উগরে স্বস্তি পেলেও তাঁর শুরু হল নতুন দুশ্চিন্তা। কখন না উজির আবার কথাটা কাউকে বলে দেয়!
অতএব রাজা একজন গণক নিযুক্ত করে বললেন, আমি আমার উজিরকে একটি গোপন কথা বলেছি, আপনি সারাক্ষণ এই গণনা করবেন যে উজিরের মুখ থেকে কথাটা কখনও প্রকাশ পায় কিনা!

এক দিন.. দুই দিন.. তিন দিন গেল। চার দিনের দিন গণক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল সন্ধ্যাবেলা। হুজুর অনর্থ ঘটে গেছে! মহা অনর্থ ঘটে গেছে, আপনার গোপন কথা তো ফাঁস করে দিচ্ছে ব্যাটা! আজ দুপুরের পর হতে ব্যাটা কমপক্ষে চারশো বার কথাটা মুখ থেকে প্রকাশ করেছে!

শুনে তো রাজার কলিজায় কামড়! ধরে আন ওই বিশ্বাসঘাতককে!

মহাসমারোহে ধরে আনা হল উজিরকে দূর পাহাড়ের এক নির্জন গুহা থেকে।

ওরে নেমকহারাম! বল তুই কোথায় একথা বলে আমায় ডুবিয়েছিস?

উজির হাতজোড় করে বলল, মহারাজ শান্ত হোন। আমি বেইমানি করিনি। তবে আমি এ কদিনে বুঝলাম, মানব মন কতই না বিচিত্র! গোপন কথা চেপে রাখা যে কেমন যন্ত্রণার সে আমার শিক্ষা হয়েছে। আপনার সে কথা আমার কাছে পাহাড় সমান বোঝা হয়ে বুকে চেপেছিল। না বলে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। তাই চলে গেলাম নির্জন পাহাড়ের গুহায়। সেখানে মন মিটিয়ে কথাটা একা একা বলতে লাগলাম যাতে অন্য কেউ শুনতে না পায়!

এ গল্প শেষ। কাউন্সেলিংয়ের সুবাদে আমার পেটের মধ্যেও অপর মানুষের অজস্র গোপন কথা জমে ঢোল হয়ে আছে। কিন্তু এসব কথা আমি কোথাও বা আমার কোন গল্পে তো নয়ই, নিজের কাছেও কখনও বলিনি। :-(
আমি কথা চেপে রাখতে পারি।
১০টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের জগৎ বিখ্যাত উপন্যাস ‘A Prisoner of Birth’ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


ছবিতে আমি, মারুফ জামান এবং লেঃ কর্নেল রাজীব।
জেলে থাকতে জেফরি আর্চারের (Jeffrey Archer) লেখা ‘A Prisoner of Birth’ বইটির পড়ার জন্য বলেছিলেন ক্যাপ্টেন (চাকুরিচ্যুত) খন্দকার রাজীব... বইটি সম্পর্কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কো রুবিও ভারতে কী করছেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২


আওয়ামী দোসর নবনীতা আপার মতে, মার্কো রুবিও ভারতে গেছেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বর মাসে যাতে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন, সেই আলোচনা করতেই নাকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুন্দর সর্বনাশ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২১



সবকিছুই পাওয়া যায় এখন বিপণনের কল্যাণে,
বিপনি বিতানে বিতানে;
চাইলে কিনে নিতে পারো লালনীলহলুদ মনও!

মন চাইলে পোষ মানাতে পারো বনের অবাধ্য পশুও;
শুধু পোষ মানাতে যেও না মানুষ;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×