somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেসিলিয়া প্যেন: বিজ্ঞানের নক্ষত্র, নক্ষত্রের বিজ্ঞান

১৭ ই জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৪:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৯০০ সালের ১০ই মে, ততদিনে ইংল্যান্ডে অস্তমিত হচ্ছে ভিক্টোরিয়ান সূর্য। গ্রামীণ ইংল্যান্ডের এক সুশিক্ষিত পরিবারে জন্ম হলো ছোট্ট শিশু সেসিলিয়ার। নিয়তির ফেরে ৪ বছর বয়সে ব্যারিস্টার বাবাকে হারিয়ে মায়ের কাছে বড় হচ্ছিলো কৌতূহলী শিশুটি। সেই সময়ের ইংল্যান্ডে নারী শিক্ষার সুযোগ এবং সম্ভাবনা ছিল খুবই সীমিত। সমস্ত প্রতিকূলতার বিপক্ষে গিয়ে সেসিলিয়া প্যেনের মা চেয়েছিলেন সন্তানদের সুশিক্ষিত করতে।

শৈশবেই সেসিলিয়া অনুপ্রেরনা পেয়েছিলেন প্রকৃতির রহসগুলো জানতে। লন্ডনের বরেণ্য সেন্ট পলস গার্লস স্কুলে পড়ার সময় গতিবিদ্যা, তড়িৎক্রিয়া, চৌম্বকত্ব, তাপগতিবিদ্যায় আগ্রহী হতে থাকেন তিনি। মেধাবী শিক্ষার্থী হওয়ায় সেসিলিয়া কৈশোরের শেষের দিকে পেয়ে যান ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা নিউহ্যাম কলেজ স্কলারশিপ।
মজার ব্যাপার হলো, জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে মেধাবী পি.এইচ.ডি থিসিস লেখার কৃতিত্ব পাওয়া সেসিলিয়া, নিউহ্যাম কলেজে উচ্চশিক্ষা শুরু করেছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানে। তবে পদার্থ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেসিলিয়ার বরাবরই বিশেষ আগ্রহ ছিলো। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেসিলিয়ার চূড়ান্ত মনোনিবেশ ঘটে মহারথী আইনস্টাইনের কল্যাণে।

ক্যামব্রিজের বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ স্যার আর্থার এডিংটানের থিওরী অফ রিলেটিভিটি নিয়ে বক্তৃতা দিতে আসেন নিউহ্যাম কলেজে। সেসিলিয়া প্যেন নিজের আত্মজীবনীতে সেই দিনটিকে অত্যন্ত আবেগপ্রবন ভাবে সরন করেছেন। তার বক্তব্য অনুসারে, থিওরি অফ রিলেটিভির বিশালতা অনুভব করে সেসিলিয়ার নার্ভাস ব্রেকডাউন হন। তিনি পরবর্তী তিন রাত ঘুমাতে পারেননি। অবশেষে বোটানী ছেড়ে চূড়ান্তভাবে সেসিলিয়া চলে আসেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের পৃথিবীতে। নিউহ্যামের স্বল্প সুযোগের মধ্যেই রাতের আকাশে তদন্ত চালিয়েছেন মাসের পর মাস।

মেধাবী এই শিক্ষার্থীকে চিনতে একটুকুও ভুল করেননি স্যার আর্থার এডিংটন। এডিংটনের নেতৃত্বেই সেসিলিয়া শুরু করেন নক্ষত্রের গঠন সম্পর্কিত একটি প্রজেক্ট। উদ্দেশ্য ছিলো, একটি নক্ষত্রের গঠন কাঠামো গানিতিক যুক্তি সমূহদ্বারা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু একটি জটিল গানিতিক সমস্যার সমাধানে ব্যার্থ হন সেসিলিয়া। বছরের পর বছর স্বয়ং স্যার আর্থার এডিংটনও ওই সমস্যাটিতেই আটকে ছিলেন।

আরনেস্ট রাদারফোর্ডের সাথে তিক্ত স্মৃতি রয়েছে সেসিলিয়া প্যেনের। তৎকালীন সমাজে উচ্চ সিক্ষায় ব্রতী নারীদের নানাভাবে হেয় বিদ্রুপ করা হতো। যদিও রাদারফোর্ডের ক্লাসে একমাত্র নারী শিক্ষার্থী হিসেবে সেসিলিয়া সেসব গায়ে মাখেননি। পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং একাগ্রতাই সেসিলিয়াকে উপহার দিয়েছে সময়ের শ্রেষ্ঠত্ব।
ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ে নারীদের আনুষ্ঠানিক ডিগ্রী দেওয়ার রীতি ছিলো না। ওদিকে পশ্চিমের আরেক সম্রাট আমেরিকায় নারী শিক্ষায় প্রতিকূলতা দিন দিন দ্রুত কমে আসছিলো। তাই হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিকেরিং ফেলোসিপের জন্য আবেদন করেন সেসিলিয়া। মেধাবী এই মানুষটিকে আমেরিকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাগ্যই পাল্টে দেয় হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

হারভার্ড কলেজ অবসারভেটরির পরিচালক হারলো স্যাপলের তত্ত্বাবধানে ডক্টরাল থিসিস শুরু করেন সেসিলিয়া প্যেন। সেই সময়েও নক্ষত্রের গঠন কাঠামো নিয়ে বিজ্ঞানী মহলের যথেষ্ট সন্দেহ ছিলো। অনেকে ভাবতেন নক্ষত্রগুলোতে অস্তিত্ব আছে ভারী মৌলিক পদার্থের। কিন্তু, এই চিন্তার একটি সমস্যা আছে। নক্ষত্রের বহিরাবরণে ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক পদার্থের উপস্থিতি থাকলে শতশত নক্ষত্রের শতশত রঙ বৈচিত্র্য দেখা যাওয়ার। কিন্তু রাতের আকাশে শুধুমাত্র সাত প্রকার নক্ষত্রের খোঁজ পাওয়া যায়। তাহলে প্রশ্নটি হলো, কোন কোন মৌলিক পদার্থ নিয়ে সৃষ্টি হয় নক্ষত্রেরা? এই বিতর্কেরই কূল কিনারা আবিষ্কার করেন আমাদের সেসিলিয়া প্যেন। আর গর্বের সাথেই বলতে হয়, এই আবিষ্কারের গল্পে জড়িয়ে আছে বাঙ্গালির গর্ব মেঘনাদ সাহার নাম।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে মেগনাদ সাহার হইচই ফেলা আবিষ্কার, নক্ষত্রের বিখ্যাত তাপ- আয়নায়ন তত্ত্ব। সোজা অর্থে যার মানে, উত্তপ্ততা এবং রাসায়নিক ঘনত্বের সাথে সম্পর্ক আছে নক্ষত্রের আয়নিক অবস্থার। হারভার্ডের উন্নত আলোক বর্নালি সমূহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্যেন বুঝতে পারেন যে, প্রতিটি নক্ষত্রই শুধু মাত্র হাইড্রোজেন- হিলিয়াম দিয়ে গঠিত! তবে বিভিন্ন তাপমাত্রা এবং আয়নিক অবস্থার কারনে নক্ষত্রের মধ্যে সীমিত সংখ্যক রঙ বৈচিত্র্য দেখা যায়।
সুতরাং, নক্ষত্রে ভারী মৌলিক পদার্থের উপস্থিতি নাকচ করে দেন সেসিলিয়া প্যেন। যার মানে, মহাবিশ্বের প্রাথমিক মৌল হাইড্রোজেন এবং অসংখ্য হাইড্রোজেন মিলিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে অন্যান্য মৌলিক পদার্থ। মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বে এই ধারনার গুরুত্ব আশা করি পাঠক উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই থিসিসটিকেই অনেকে বলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী পি.এইচ.ডি থিসিস। গবেষণাগারে হাইড্রোজেন-হিলিয়ামের বিভিন্ন কৃত্রিম বর্নালী পরীক্ষা করে প্যেনের থিসিস সঠিক প্রসানিত হয়। তবে এই আবিষ্কারটি সরাসরি প্রত্যাখান করেছিলেন তখনকার বিজ্ঞানী মহলের একাংশ। তবে ধীরে ধীরে এই আবিষ্কারটির ভিত্তি মজবুত করেন সমসাময়িক অন্যান্য জ্যোতির্বিদরা। থিসিসটির জন্য রাডাক্লিফ কলেজ থেকে Ph.D ডিগ্রী লাভ করেন সেসিলিয়া প্যেন।

সেসিলিয়া প্যেন পরবর্তী জীবনে জ্যোতির্বিজ্ঞানে অপরিসীম অবদান রেখেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্বামী সের্গেই গাপোসকিনের সাথে মিলে তৈরি করেছিলেন অজস্র নক্ষত্রের তথ্যভাণ্ডার। একসময় বিশ্বব্যাপী জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে যা ছিলো আদর্শ টেক্সটবুক রেফেরেন্স। হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৬ সালে প্যেন পান প্রফেসরের মর্যাদা। ওই বছরই দায়িত্ব পান হারভার্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগে। জীবনের প্রতিকূলতা জয় করা নারীদের ইতিহাসে যা ছিলো একটি তাৎপর্যপূর্ন ঘটনা। সারা জীবনে অজস্র পদক এবং সম্মাননা পাওয়া এই মহীয়সী নারী আজো পৃথিবীতে অসংখ্য বিজ্ঞান শিক্ষার্থী নারীর অনুপ্রেরনা। ১৯৭৭ সালে এই মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সম্মানে সৌরজগতের একটি মাইনর গ্রহকে ''প্যেন গাপোসকিন'' নামে নামকরন করা হয়।


তথ্যসূত্র:
www.aps.org/ publications/apsnews/201501/physicshistory.cfm
owlcation.com/humanities/ The-Pioneering-Woman-Astronomer-Cecilia- Payne-Gaposchkin
https://en.wikipedia.org/ wiki/Cecilia_ Payne-Gaposchkin

ছবি: উইকিপেডিয়া থেকে নিয়ে নিজের এডিট করা
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০২১ বিকাল ৪:২২
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ সাহেব তো নেই, উনাকে জানার, বুঝার উপায় কি?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ রাত ৮:৫০



শেখ সাহেব নেই, যারা উনার আশপাশে ছিলেন, তাদের অনেকেই নেই; উনার সাথে যারা ছিলেন, আজো আছেন, তাদের মাঝে সুক্ষ্ম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোন মানুষ নেই, যিনি শেখ সাহেবের বিশ্বাস, ভাবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার আঁকা চারটা ছবি

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ রাত ৯:৩৮



গত ১৫ বছরে নদিপথে মোট ৫৮৭ টি নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ১৪ হাজার । তদন্ত ৬১৩ টি । তদন্তের একটিও রিপোর্ট মানেনি নৌযান মালিক-চালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত হিসেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরিবের বিয়ে

লিখেছেন এমএলজি, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ রাত ১০:১৯

ছবিটি গরিবের।

গরিবের কথাটি বলেছি যথার্থ অর্থেই। কারণ, এমন ছবিতে কনের গলায় জড়িয়ে থাকার কথা ছিল বিভিন্ন আকারের ঝলমলে সোনার হার। অথচ, স্বর্ণ বলে তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না মেয়েটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোভিড ভাতা- হিসাবে মিলে না

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৮ ই মার্চ, ২০২১ ভোর ৪:১৩


আবারো আমেরিকান সিনেট/কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর থেকে প্রস্তাবিত প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ($২,০০০,০০০,০০০,০০০) এর কোভিড বিল পাশ করছে। টাকাতে এর পরিমান কত হবে??? 169,510,440,000,000 Bangladeshi Taka। এর থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্বোধনে ভালবাসা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৮ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ১০:৩৯

আলতাফ সাহেব তার লেখার টেবিল ছেড়ে একটা দরকারি কাগজ খোঁজার জন্য বেডরুমে প্রবেশ করলেন। তার স্ত্রী তখন প্রাতঃরাশ সেরে কেবল বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সেলফোনটা হাতে নিয়ে কিছু একটা দেখছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×