
৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকেই 'মাইক্রোপ্লাস্টিক' বলা হয়। ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রিচার্ড টমসন তাঁর গবেষণাপত্রে প্রথম মাইক্রোপ্লাস্টিক শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি দেখান যে ব্রিটেনের উপকূলীয় পানিতে ১৯৬০-এর দশক থেকেই প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা জমতে শুরু করেছে এবং সময়ের সাথে এর পরিমাণ কেবলই বাড়ছে। যদিও সত্তরের দশক থেকেই সমুদ্রের পানিতে প্লাস্টিকের কণার উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছিল, তবে ২০০৪ সালের ওই গবেষণা প্লাস্টিক দূষণ গবেষণায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। গত দুই দশকে এই বিষয়ে সাত হাজারেরও বেশি গবেষণাপত্র বৈজ্ঞানিক মহলে প্রকাশিত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন একটি বহুল আলোচিত বিষয় কেননা দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব জায়গায় একে পাওয়া যাচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে এভারেস্ট পর্বত, নদী-মাটি-বাতাস, এমনকি মানুষের রক্ত ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও ধরা পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। এটি মূলত খুবই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক হওয়ায় প্রকৃতিতে সহজে মিশে যায় না বা পচে না, বরং দিনদিন এর পরিমাণ শুধু বাড়তেই থাকে।
চলুন এক নজরে জেনে নেই, গত বিশ বছরে মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষণা থেকে আমরা কি কি জানতে পেরেছি।
১৯৬০-৭০ দশক — সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের প্রথম প্রতিবেদন। উত্তর সাগর, সারগাসো সাগর, উত্তর-পশ্চিম আটলান্টিক ও দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে প্লাস্টিকের সুতো ও কণা পাওয়া যায়।
২০০৪ — "মাইক্রোপ্লাস্টিক" শব্দটি প্রথম ব্যবহার। রিচার্ড টমসনের গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশক থেকেই যুক্তরাজ্যের উপকূলে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা জমছিল।
২০০৭ — মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে রাসায়নিক পদার্থ পরিবহন ও নির্গত করে, তার প্রথম প্রমাণ মেলে।
২০০৮ — জোয়ার-ভাটা প্রাণীদের (যেমন ঝিনুক) শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্র থেকে রক্তসংবহনতন্ত্রে চলে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই বছরই ইইউ সামুদ্রিক কৌশল নির্দেশিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, আর NOAA (National Oceanic and Atmospheric Administration) আন্তর্জাতিক গবেষণা কর্মশালার আয়োজন করে।
২০১০ — মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে বিষাক্ত পদার্থ বহন করে, তা নিয়ে GESAMP (Group of Experts on the Scientific Aspects of Marine Environmental Protection) কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
২০১১ — বিশ্বজুড়ে সমুদ্রতীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) ইয়ারবুকে বিষয়টি প্রথমবার উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে উঠে আসে।
২০১৩ — বাণিজ্যিক সামুদ্রিক খাবার ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকসেও মাইক্রোবিড শনাক্ত হয়।
২০১৪ — গভীর সমুদ্র ও আর্কটিক অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। সমুদ্রে মোট মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি বৈশ্বিক হিসাবও প্রকাশিত হয়।
২০১৫ — টায়ারের ক্ষয়কে প্রধান উৎস হিসেবে শনাক্ত করা হয়। বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রমাণ মেলে। যুক্তরাষ্ট্র প্রসাধনীতে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা মাইক্রোবিড নিষিদ্ধ করে (Microbead-Free Waters Act)। প্রসাধনীতেও ব্যাপক মাইক্রোবিড শনাক্ত হয়।
২০১৭ — কাপড় থেকে মাইক্রোফাইবার নির্গত হওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
২০১৮ — মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন আসে। খাবার পানিতেও এর প্রমাণ মেলে। ক্যালিফোর্নিয়া "নিরাপদ পানীয় জল আইন"-এ মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে। ফ্রান্স ওয়াশিং মেশিনে মাইক্রোফাইবার আটকানোর ফিল্টার আইন করে।
২০১৯ — মানুষের মলে প্রথমবার মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়। "প্রকৃতি ও সমাজে মাইক্রোপ্লাস্টিক" নিয়ে SAPEA (Science Advice for Policy by European Academies)-এর বিশদ পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়, যা ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা তুলে ধরে। G20 সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য মোকাবিলায় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) খাবার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে প্রতিবেদন দেয়।
২০২০ — এভারেস্ট পর্বতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়! নদী ও সমুদ্রে টায়ারের কণা প্রবেশের প্রমাণ শক্তিশালী হয়।
২০২১ — মানুষের রক্তে প্রথমবার মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়, যা এই গবেষণায় একটি বড় মাইলফলক। রং (পেইন্ট)-কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
২০২২ — WHO ন্যানো ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাধ্যমে মানুষের সংস্পর্শ এবং স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২০২৩ — EU-এর REACH আইনের আওতায় পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয়। জাতিসংঘের "বৈশ্বিক প্লাস্টিক চুক্তি" নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয় (যা এখনো চলমান)।
২০২৪ — মানুষের স্বাস্থ্যের সাথে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে নতুন হৃদরোগ সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের জন্য FAO-এর স্বেচ্ছামূলক আচরণবিধি তৈরির কাজ চলছে।
এখানে একটি বিষয় জানা জরুরি যে, গবেষকরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ঠিক কতটা। প্রাণী ও কোষ পর্যায়ের গবেষণায় ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ মিলেছে, যেমন শারীরিক প্রদাহ, কোষের ক্ষতি- কিন্তু মানুষের শরীরে বাস্তব পরিস্থিতিতে এর প্রভাব বুঝতে আরও পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। অর্থাৎ, ভয় পাওয়ার আগে বিভ্রান্তি বা মিথ্যা তথ্যে কান না দিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের অপেক্ষা করা এবং যতসম্ভব মাইক্রোপ্লাস্টিক এড়িয়ে চলাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। তবে পরিবেশকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচানোর জন্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: Richard C. Thompson et al. ,Twenty years of microplastic pollution research—what have we learned? Science (2024).

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
