আওয়ামী লীগের ৭২ এর সংবিধান ফিরিয়ে আনা এবং বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম থাকা না থাকার ব্যাপারে আমাদের সুশীল সমাজের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। অনেক লেখক একে আত্মঘাতী বলছে। আবার এ সংবিধানের আলোচনায় ইসলামকেও বিতর্কিত করা হচ্ছে। এখানে প্রথমত আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন এখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব নেই যার কথা নির্বিশেষে সকলে দ্বিধা-হীনভাবে মেনে নিবে। ৭৫ এর পর পাকিস্তানের অনুকরণে সামরিক শাসকরা ১৫ বছরে ধর্মের যথেচ্ছা ব্যবহার করেছে। সংবিধানের পোস্টমর্টেম করা হয়েছে কিন্তু কেউ সেভাবে এর প্রতিবাদ করতে পারেনি। ৮৩ পরবর্তীতে সামরিক শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করাই মূল লক্ষ ছিল, অন্য বিষয়গুলো ছিল গৌণ। ৯১ এর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারও ধর্ম-ব্যবসায়ীদের মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ ছিল। এখন পর্যন্ত সেভাবেই আছে। বরং আর্থিক ও সাংগঠনিকভাবে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আওয়ামী লীগ বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু রাতের আঁধারে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। শেয়ার মার্কেট ধ্বসে যে যার সমালোচনাই করুক মীর কাশেম আলী আর সাকা চৌধুরীর উত্তোলনকৃত টাকা কোথায়? এটি কি মার্কেট ধ্বসে ভূমিকা রাখেনি?

আওয়ামী লীগের সীমাবদ্ধতা
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, দলীয় কাউন্সিল হচ্ছেনা, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দলীয় অবস্থা শোচনীয়। পৌরসভা নির্বাচন এর কিছু ইঙ্গিতও দিয়েছে। সাংবিধানিক সংকট সমাধান করতে হবে। এর মাঝে নারী নীতি ও এ সংশ্লিষ্ট ইসলাম প্রসঙ্গও উল্লেখযোগ্য। খালেদার হাতে মদের গ্লাসসহ যখন ছবি ছাপা হয় তাতে ইসলামের ক্ষতি হয়না কিন্তু শেখ হাসিনা ধর্ম পালন করলে সেটা হয় সমালোচনার বিষয়। আর আওয়ামী লীগ ইসলাম মুছে দিতে চায়, এদেশকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে চায় এ ধরণের প্রচারণার দায়িত্ব পালন করছেন শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান আর পাকিস্তানের ডেইলি পাকিস্তান সহ কিছু পত্রিকা।
ইসলাম সম্পর্কে কিছু সুস্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন:
১) ইসলামের যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্ব প্রথম বিবেচ্য আল-কোরআন।
২) আল-কোরআন এর বিস্তারিত জানা যাবে সহি হাদিসে। সহি হাদিস কখনওই আল-কোরআনের সাথে কন্ট্রাডিক্ট করবেনা। এছাড়া নবীজীর সন্নাহও উল্লেখযোগ্য।
ইসলামের মৌলিক নির্দেশনার জন্য কোন গবেষণার প্রয়োজন নেই। মূলত উল্লেখিত দুই ভাগেই ইসলামের সকল সমাধান সম্ভব।
কালক্রমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নবীর মৃত্যুর পর তৎকালীন সময়ে মূলত চার ইমাম ইসলামী হুকুমত পরিচালনার জন্য সংগ্রহে থাকা পর্যাপ্ত হাদিসের ভিত্তিতে যে ফতোয়া দেন তা আজও অনুসৃত হচ্ছে। অথচ অনেক হাদিসই দুর্বল বা জঈফ বা বাতিল বলে পরবর্তীতে প্রতীয়মান হয়েছে। ইমামদের নির্দেশনা ছিল আমার প্রদত্ত কোন ফতোয়া কোরআন-হাদিসের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে আমার ফতোয়া বাতিল হবে। যেমন পাকিস্তানের ওলামাগণ কর্তৃক উদ্ভাবিত ২/৪ দিনের জন্য হিল্লা বিবাহ যা হারাম, ইসলামে এরূপ কোন বিবাহ অনুমোদিত নয়, এটি বিকৃত করা নিয়ম।
ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী আইন:
আমরা পার্সোনাল ল আর স্টেট ল যদি মিলিয়ে ফেলি তাহলে দ্বিধা থাকাটা স্বাভাবিক। মনে রাখা প্রয়োজন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম কিন্তু এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র নয়। অন্যদিকে নারী নীতি, অধিকার যাই বলি এসব কিছুই মুসলিম পার্সোনাল ল এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে ফতোয়াও পার্সোনাল ল এর অন্তর্ভুক্ত। একে বাতিল করার যেমন কোন অবকাশ নেই আবার কার্যকর করার প্রেক্ষাপটও নেই। আর নারী নীতি তো কোন আইনই নয়। এটি নীতিমালা মাত্র।
ইসলামে নারীর অধিকার
নারীর অধিকার সাদামাটা চোখে দেখলে এর স্বরূপটা বোঝা কষ্টকর হবে। আমরা কত ধরণের অধিকার ভোগ করি? একইভাবে নারীর অধিকারের প্রকারভেদ বিশ্লেষণ করলেই ইসলামে নারীর স্থান বোঝা যাবে।
নারীর অধিকার:
১) সামাজিক অধিকার
২) রাজনৈতিক অধিকার
৩) অর্থনৈতিক অধিকার
৪) আইনগত অধিকার
৫) ধর্মীয় অধিকার
৬) শিক্ষাগত অধিকার
অনেকে সুরা বাকারা'র ২২৮ নং আয়াত ভ্রান্ত-ভাবে অনুবাদ করে সমালোচনা করে। আয়াতটি হল:
"And Women shall have rights, similar to the rights against them, according to what is equitable, but men have a degree of advantage over them".
এখন কেউ যদি ডিগ্রী অফ এ্যাডভান্টেজ এর কারণে বলে যে ইসলাম নারী পুরুষের অধিকার সমান নয় তাহলে বলতে হবে দৈহিক গঠনের ভিত্তিতে কি নারী-পুরুষ একরকম? নারী পুরুষের সমানাধিকার মানে সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার ইসলাম সেটা বোঝায় না। কোন ক্ষেত্রে নারী প্রাধান্য পায়, কোন ক্ষেত্রে পুরুষ সামগ্রিক ভাবে বিবেচনা করলে সমানাধিকার বলা যায়।
অধিকারের যে প্রকারভেদ দেয়া হল এতে কিছু প্রশ্ন আসবে।
নারী পিতার সম্পত্তির ভাইয়ের অর্ধেক পাবে কেন?
১) নারীকে পিতা ভরণপোষণ করে। পিতা না থাকলে ভাইয়ের সেটা কর্তব্য। বিয়ের সময় নারীকে দেনমোহর দেয়া হয়। অনেকে বলবে দেনমোহর তো একটি আয়াতও হতে পারে। হ্যাঁ হতে পারে আবার পাহাড় সম স্বর্ণও হতে পারে। নারীর স্বামী এবং সন্তানের সম্পত্তিতেও অধিকার আছে। উদাহরণ স্বরূপ বর্তমানে দেনমোহরের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ+ ও হয়ে থাকে। এ দেনমোহর না দেয়ার আগে বিবাহ বৈধ নয়। স্বামীর ভরণ পোষণের পর সে যদি পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগসহ করে রাখে ত্রিশ বছর পর টাকার অংক কত হয়? তার ভাই কি এ টাকা পাচ্ছে? তাকে তো টাকা দিয়ে বিয়ে করে আনতে হবে।
২) নারী কে অনেক ক্ষেত্রে ছোট করা হয়েছে। দুইজন নারী সাক্ষী একজন পুরুষ সাক্ষীর সমান। আপনারা মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখবেন ২ আর ১ এর ব্যাপারটি আর্থিক বা হত্যা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেই শুধু হয়ে থাকে। অন্যান্য কোন ক্ষেত্রে কেউ এ ধরণের দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবে না।
৩) কর্মক্ষেত্রে নারী: নারী কাজ করতে পারবে না এমন কোন নির্দেশনা দেয়া নেই। মহানবী (স
৪) নারী রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবেনা: ওহুদের যুদ্ধ সহ যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত আছে। নারী কি রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে? যে কারণে এটি বলা হয় তার কারণ একটি হাদিস যেখানে নারী রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না এমন বলা নেই বলা আছে উন্নয়ন হয়না। অনেক আলেমরা বলেছেন, তৎকালীন সময়ে পার্সিয়ার প্রধান ছিলেন রাণী সেই প্রেক্ষাপটে হাদিসটি বর্ণিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্ন অবান্তর কারণ এটি ইসলামিক স্টেট নয়।
সংবিধান, বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম:
একটি মজার ব্যাপার লক্ষ করেছি "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" কথাটির অর্থ কাউকে জিজ্ঞেস করলেই সে উত্তর দিয়ে বসে, "পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি।" শুরু করিতেছি - এই অতিরিক্ত শব্দটি কে বা কারা শুরু করেছে কে জানে? আল-কোরআনে সুরা তওবা কি বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু হয়েছে?
ইসলামে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা/গুরুত্ব নেই। ইসলাম ইউনিভার্সেল ব্রাদারহুড এ বিশ্বাস করে। জাতীয়তাবাদ শব্দটি ইসলাম বিরোধী। ইসলামে বিভাজন, বিভক্তি হারাম। ইসলাম উম্মাহ ধারণায় বিশ্বাস করে।
সুরা হুজরাত এর ১৩ নং:
"O human kind, We have created you from a single pair of male and female, and have divided you into nations and tribes, so that you shall recognize each other, not that you shall divide each other."
সুরা আনাম এর ১৫৯
"Anyone who breaks the Religion into sects, Allah has nothing to do with him."
এখন প্রশ্ন হল বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কি সরানো দরকার? যদি পাল্টা প্রশ্ন করা হয় অপরিবর্তিত রাখলে কি কোন সমস্যা হবে? এটি একটি গণতান্ত্রিক সরকার। সরকার চাইলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব করতে পারেনা। এটা আওয়ামী লীগের সাথে অন্য দলের গুণগত পার্থক্য।
একদল অন্ধ জনতাকে কে বোঝাবে যে রাষ্ট্রের কোন ধর্ম হয়না! কে তাদের বোঝাবে যে নবী সম্পাদিত চুক্তিগুলোতে "বিসমিল্লাহ" ছিলনা। কে তাদের বলবে এটা সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে অন্য ধর্মের অনুসারীদের উপর ইসলামী শর্ত চাপিয়ে দেয়া যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ!
সুরঞ্জিত বাবু একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, "বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বাদ দিতে হলে গণআন্দোলন লাগবে"
রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ'র রাজনীতির অপেক্ষায় বিরোধী দল:
প্রকৃতপক্ষে জনতার তো কোন দোষ নেই। দল যা বলবে তাকেই তারা ধ্রুব বলে ধরে নিবে। বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেয়া হলেই তাদের বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হবে। ইসলাম দেশ থেকে চলে গেছে এরকম হুঙ্কার দিবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সরকারের পতন ঘটাতে হবে। এরশাদও তার কৃত কর্ম বাতিল হলে খুশী হবে না। নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার জন্য ইস্যু তৈরি হবে। আমিনীরাতো আছেই। যুদ্ধাপরাধী ইস্যুটি ঢাকা পড়ে যাবে অন্তরালে।
বিষয়টি আমাদের প্রগতিশীল সুশীল সমাজকে হয়তো ব্যথিত করেছে। কিন্তু তারা কি মাঠের বাস্তবতা জানেন না? আমাদের গোয়েন্দা সংস্থারাও সবকিছু পরে জানেন। বিএনপি-জামাতের এই ইস্যু নিয়ে গভীর এক পরিকল্পনা আছে। এ লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছে। তাদের লক্ষবস্তু মসজিদ-মাদ্রাসা। এই মসজিদ-মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে তারা সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করবে। তাদের লক্ষ্য থাকবে নামাজে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ইসলাম রক্ষার আন্দোলনে শরীক হতে আহবান জানানো। জানা যায় এখনও এ কাজটি চলছে সাংকেতিকভাবে।
আমাদের সুশীল সমাজের কাছে সনির্বদ্ধ অনুরোধ বিষয়গুলো নীতি বা বিবেকের মধ্যে বন্দী না করে জনমত এবং রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভাবুন। মাঠে আসুন, জনমত গড়ে তুলুন - বলতে বা সমালোচনা করতে হবেনা আওয়ামী লীগ নিজের তাগিদেই জনমত প্রাধান্য দিবে। আমাদের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এ সব অর্জনেই সময় লেগেছে। আমাদের জনতাকে বেশী দিন রঙিন চশমা পরিয়ে রাখা যায় না। যথোপযুক্ত সময়ে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে বলে আমরা আশা করতে পারি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম তুলে দেয়া মানে হবে বিরোধী দলের হাতে ইস্যু তুলে দেয়া এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার সুযোগ করে দেয়া। আপনারা কি পারবেন এর দায়-দায়িত্ব নিতে!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০১১ রাত ২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



