হীরা খুঁজতে কয়লার খনিতে হাত কালো হবার কথা ভাবা দরকার।
পাঁচ বছরের বেশী সময় পর আগামী ১০-১১ জুলাই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৭তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে উচ্ছলতা ও প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে তেমনি অনেক হতাশাও পরিলক্ষিত হয়েছে। এ হতাশার মধ্যে আবেগ ছিল যার শিকার আগের নেতাকর্মীরাও হয়েছে। এর মেয়াদ সংসদ নির্বাচনের মত হয়ে গেছে যেখানে অন্তত বয়সের কোন সীমাবদ্ধতা নেই। অনেকের ত্যাগ, অভিযোগ যেমন বিবেচনা প্রয়োজন তেমনি সুষ্ঠু ছাত্র রাজনীতি আশা করলে বয়স অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু তার সমাধান করতে হবে রাষ্ট্র বা সরকারকে দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে নয়।
ছাত্ররাজনীতির গত দেড় যুগ:
ছাত্র রাজনীতির গত প্রায় আঠার বছরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় এর মৌলিক কিছু পরিবর্তন খুব স্পষ্ট। ৯০ এর পর ছাত্র রাজনীতি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে তার অন্যতম কারণ পেশাজীবীদের পৃথকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের অধিকারের দাবীতে যেমন আন্দোলন করেছেন তেমনি ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ থেকে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তারা কৃষকের পক্ষে যেমন কথা বলেছে, ছাত্রদের দাবীর কথাও বলেছে, সোচ্চার হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও। ৯০ এর পর পেশাজীবীদের সংগঠনগুলো যত পৃথক ভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে ছাত্র রাজনীতি গুরুত্ব হারাতে থাকে। একে নেতিবাচকভাবে দেখার উপায় নেই। কারণ শুধু ছাত্র সংগঠন নির্ভর হলে রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক প্রত্যাশাই পূরণ হতো না।
ছাত্র রাজনীতিতে নীতি ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীর অভাব এই সমালোচনার শীর্ষে থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। মূলত তারাই সূচনা করে হল দখল, পেশীশক্তির ব্যবহার, টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজি ও তদবীরবাজীর। ছাত্রদের দাবিদাওয়া নিয়ে কখনোই সোচ্চার হয়নি। তার সাথে যুক্ত হয়েছে সুবিধাবাদী রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বদলের সাথে দলবদলের ধারা। শিবিরের অনুপ্রবেশের সূচনা হয় মূলত ছাত্রদলে। ছাত্রলীগে ৯৬ পর্যন্ত এই ধারা পরিলক্ষিত হয়নি। ৯৬ এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শহীদ জিয়ার সৈনিকেরা দলবলে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হয়ে যায়। তাদের প্রায় সকলেই ঝরে গেলেও কিছু রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের সরকারে আসার পর দলের কথা স্মরণ করেছে।

ছাত্রলীগের সম্মেলন:
ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে শেখ হাসিনা নিজে ভূমিকা রাখেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং নিজের বিবেচনা এখানে কার্যকর থাকে। যে কারণে ছাত্রলীগের বিশেষত্ব হল কোন বিবাহিত, ক্যাডার, চাঁদাবাজ, বা গুরুতর কোন অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ কখনও শীর্ষ নেতৃত্বে নির্বাচিত হয়নি। ৯৩ এর ছাত্রলীগের সম্মেলনে নির্বাচিত শামীম-পান্না কমিটি এবং তাদের নেতৃত্বে থাকা একেকটি কর্মীও ছিল দলের জন্য নিবেদিত। ৯৮ এ নির্বাচিত বাহাদুর-অজয় কমিটি, তাদের দুজনই ভাল নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। বাহাদুর বেপারী শুধু মেধাবী ছিল না তার মধ্যে সৃজনশীলতা ও নিয়মতান্ত্রিকতা ছিল। এ কমিটির বিশেষত্ব হল তারা গঠনতন্ত্র অনুসারে সম্মেলন করে যা ছাত্রলীগে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
২৫তম সম্মেলনে নির্বাচিত লিয়াকত-বাবু কমিটির দুজনই সাংগঠনিক বলে পরিচিত ছিল। লিয়াকত শিকদার কেন্দ্রীয়ভাবে এবং নজরুল ইসলাম বাবু ঢাকা মহানগরে জনপ্রিয় ছিল। ২০০৬ সালের কমিটিতে হঠাৎ করে ২৯ বছরের সীমা বেধে দেয়া হয়। নির্বাচিত রিপন-রোটন দুজনের কারও নামে অভিযোগ ছিলনা। বিশেষত রোটন ছিল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনে যুক্ত ছিল। কিন্তু তারা নিজেরাই বড়জোর একটি কেন্দ্রীয় সম্পাদকীয় পদের প্রত্যাশী ছিল। তাদের চেয়ে ৬/৭ ব্যাচ সিনিয়ররাও কেন্দ্রীয় প্রার্থী ছিল যারা সন্দেহাতীতভাবে নিবেদিত এবং পরীক্ষিত ছিল। তাদের ধরে রাখতে বিকল্প কোন ব্যবস্থা না করায় কিছু নেতা জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান করে নিতে পারলেও অনেক যোগ্য নেতা হারিয়ে যায়। দলকে নিবেদিত নেতা থেকে বঞ্চিত করার দায়ভার ২৬তম কমিটিকে বহন করতে হবে।
বয়স-সীমা ও অনেকের হতাশা:
গত কমিটি ছাত্রদলের প্রবীণ নেতাদের সাথে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে সফল হত কিনা তা ১/১১ এর প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়নি। কিন্তু সকল জেলা, থানা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতারা সিনিয়র হওয়ায় কমান্ড এর ক্ষেত্রে ইগো কাজ করে। এর ফলাফল দেখা যায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ অনেক ক্ষেত্রই ছাত্রলীগ সমালোচনার সম্মুখীন হয়। শিবিরের অনুপ্রবেশের অভিযোগ পাওয়া যায়। নেত্রী সাংগঠনিক প্রধানের পদ থেকেও সরে দাড়ায়। তাদের পরিপক্বতার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় গত এক বছরে তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কমিটি। পাঁচ বছর পর সম্মেলন হলে যারা দলের জন্য দু:সময়ে নিবেদিতভাবে কাজ করেছে এমন অনেক নেতা বয়সের কারণে বাদ পড়ে যাচ্ছে। আবার স্থানীয় কমিটিগুলোতে খুব কমই গঠনতন্ত্রের এ ধারা অনুসরণ করা হয়। নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এমন নেতা বাদ পড়লে মূলত দলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিক ফজলুল বারী ভাইয়ের একটি এফবি স্ট্যাটাস

পুলিশের পিডা খাওনের ডরে মোটর সাইকেলের পিছনে করি যে লোকটা ভাগতাছে তার নাম সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। ইনি খালেদা জিয়ার নির্বাচিত ছাত্রদলের সভাপতি! আইচ্ছা ভাইজানেরা ক'ন দেখি এইডারে দেখলে কি ছাত্র মনে হয়? খালেদা জিয়া তাঁর এইসব আংকেল মার্কা ছাত্রদল নিয়া করবেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন! বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'এর সৌজন্যে পাওয়া ছবিটি সোমবারের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বাধা দেবার পর তোলা ছবি।
---------------------------------
অর্থাৎ সন্তান ছাত্র হবার পর পিতা ছাত্রনেতা হবে এটা বোধ হয় ছাত্রদলের অলিখিত নিয়ম।
ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি আমার ৩/৪ ব্যাচ জুনিয়র। ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি আমার ৪/৫ ব্যাচ সিনিয়র। এবারের নির্বাচিত নেতৃত্ব ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির পিতৃতুল্য নেতাদের সাথে সাংগঠনিকভাবে মোকাবেলা করবে কি করে এটা ভাবা দরকার।
হাইকোর্টের রায়:
সম্প্রতি হাইকোর্ট এক রায়ে বলা হয়েছে চাকুরী আবেদনের সময়সীমা যেহেতু ৩০ সুতরাং ৩০ বছর পর্যন্তই একজনকে ছাত্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রনেতার বয়স-সীমা ৩০ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। নি:সন্দেহে এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। বিরোধী ছাত্রদলের অধিকাংশ ছাত্ররা এর সাথে একমত হবে।
বয়স-সীমা যখন যৌক্তিক
আমাদের আগে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হত তাদের জন্য সেশনজট ছিল একটি সাধারণ নিয়ম। মাস্টার্স পাশ করতে ৮/৯ বছর লাগতো। কিন্তু অনেক বছর থেকেই এই সেশনজট নেই। তাই একজন সাধারণত ১৭/১৮ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মাস্টার্স পাশ করতে তার সর্বোচ্চ বয়স হবে ২৫ এবং তা সার্টিফিকেট অনুসারে। বয়স-সীমা ২৯ বছর ধরলে অতিরিক্ত চার বছর সময় পাচ্ছে। সুতরাং ছাত্র রাজনীতিকে গতিশীল রাখতে এ বয়স-সীমা যৌক্তিক। কিন্তু সম্মেলনের সেশনজটের জন্য নিবেদিত বাদ পড়া ছাত্রনেতাদের মধ্যে অনেকে মামলার শিকার হয়েছে। নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে। তাই তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে দলে রাখতে বিশেষত যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে যুবলীগ সহ অন্যত্র স্থান দেয়া প্রয়োজন। শিবির অনুপ্রবেশ সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্কতা প্রয়োজন।
দলে নিবেদিত নেতাকর্মীদের ভূমিকা অপরিসীম। নিবেদিত একজন নেতা দলের জন্য সম্পদ স্বরূপ। সেই আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। একই সাথে চাঁদাবাজি, টেন্ডার-বাজী, তদবির এই সব অভিযোগে অভিযুক্তরা দলের জন্য বোঝা স্বরূপ। একজন সাবেক ছাত্রনেতা ঠিকাদারি করতেই পারে কিন্তু দলের দুর্দিনে না থেকে যদি সুসময়ে আবির্ভূত হয় তা অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত নয়। হাইকোর্টের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সরকারেরও উচিত সকল ছাত্র সংগঠনে যেন এ রায় সমভাবে কার্যকর হয়। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন মজবুত করা সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দলের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। সেই আলোকে নেতৃত্বের মূল্যায়ন না করলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক গুণগত পরিবর্তনে দু:সময়ে দলের জন্য দাঁড়াবে এমন নেতাকর্মীর সংখ্যা প্রকৃতির নিয়মের মত ক্রমহ্রাসমান এটা ভুলে গেলে চলবে না।
যোগ্য নেতৃত্ব নির্ধারণে সঠিক ও সতর্ক পদক্ষেপ প্রয়োজন। দলকে শক্তিশালী করতে আলোচনায় নেই এমন কেউ যদি যোগ্য হয় তাকে নির্বাচিত করা উচিত। ছাত্রলীগের সম্মেলন সফল হোক এই কামনা করি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০১১ ভোর ৪:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



