আমি সেই অর্থে রিভিউ দিচ্ছি না, শুধু বইটি পড়ে নিজের একান্ত ভালো লাগা-না লাগার অনুভুতিগুলো শব্দে লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছিঃ
প্রথমেই আসি ভালো লাগার কথায়, ভালো লাগার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, পুরো বইটিই ভালো লেগেছে । উপন্যাসের কাহিনী, চরিত্র চিত্রণ, সর্বোপরি ওবায়েদ হক নামের অচেনা, অজানা, নতুন লেখকের অসাধারণ লেখনী । বইয়ের কিছু কিছু কথা শুধু মনই ছুঁয়ে যায়নি, বরং মনের অনেক গভীরে দাগ কেটেছে । যেমনঃ মা এসেছিল একদিন কালো স্লেটে, ‘ম’ এর সাথে ‘আ’ কার দিয়ে মা হয়েছিল । কিংবা কার্তিককে বলা মানিকের সেই কথাটা, ‘খাবার সময়ে আমার ডাল আমি তোকেই দিব, তুই তোর মা দিস ।’ ছোট একটা ছেলের মায়ের আদরের জন্য, ভালোবাসার জন্য গভীর আকুতি, লেখক কত সুন্দর করেই না ফুটিয়ে তুলেছেন এই দু’টি বাক্যে । কোথায় যেন শুনেছিলাম, একজন লেখক আসলে ছবি আঁকেন, লেখক ছবি আঁকেন শব্দ দিয়ে, কাহিনী তাঁর ক্যানভাস । এই দুটো বাক্য পড়ে আমার সেই কথাটাই মনে পড়ে গেল । এই বইয়ের আরেকটি কথা যেটি আমার মনে দাগ কেটেছে, সেটি হলো উমের সেই মানিকের কাছে তার সন্তানকে বাঁচাতে সেই আকুতি, ‘এইটাও মানুষ ডাক্তার বাবু, এইটারে বাঁচান ।’ আগের দু’টি বাক্যে যদি ছোট একটা শিশুর মায়ের জন্য আকুলতা প্রকাশ পায় তো এই উক্তিটি প্রকাশ করে গেছে একটা মায়ের তার সন্তানের জীবন বাঁচিয়ে রাখার ব্যকুলতা । সত্যিই অসাধারণ!
এইবার আসি খারাপ লাগায় । খারাপ লাগার কথা বলতে গেলেই প্রথমে আসে প্রত্যেকবার ‘বলল’র পর বিশাল বিশাল ড্যাশ দিয়ে উক্তিগুলো লেখা । প্রত্যক্ষ উক্তি তো বলল লিখে কমা দিয়ে উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতর দিলেই সুন্দর লাগে । দু’একটা জায়গায় ‘বুঝে’ শব্দটির প্রয়োগ দেখলাম যা আমার কাছে ভালো লাগেনি, মনে হয়েছে ‘বোঝে’ ব্যবহার করলে ভালো হতো । কিছু কিছু জায়গায় মূল কাহিনী থেকে বের হয়ে গিয়ে অন্যান্য কাহিনীর বর্ণনা পাঠক হিসেবে আমার মনোযোগ নষ্ট করেছে । উদাহরণস্বরূপ- মংওয়াই এর মা’র কথা বলতে গিয়ে লেখক হুট করে চলে গেলেন ‘বাংলাদেশে একজন ডাক্তার ছিলেন…’ । আরেকটা ব্যাপার হলো, একটা বিশেষ সময়কে ধরার চেষ্টা করা, এই বইয়ের শুরুর দিকে ‘১৯৮৪ সালের...’ আর দু’-এক জায়গায় ‘প্রেসিডেন্ট এরশাদ’ এর নাম উল্লেখ করা ছাড়া আশির দশকের সময়টাকে ধরার তেমন কোনো চেষ্টা আমি পাইনি । এইখানে আমি সত্যিই একটু আশাহত হয়েছি । এই কথাটা বলছি, কারণ, আমি লেখকের ‘জলেশ্বরী’ পড়া শুরু করেছিলাম । সেখানে অসম্ভব সুন্দরভাবে সময় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা ‘নীল পাহাড়’ এ হয়নি । কিছু জায়গায় প্যারা শেষ না করেই নতুন প্যারায় চলে যাওয়া হয়েছে, তবে আমার ধারণা, এইগুলো লেখকের ভুল নয় বরং বইটি ছাপিয়েছে যে প্রকাশক তিনি সঠিকভাবে সম্পাদনা করেননি কিংবা প্রুফ রিডিং এর সময় এই ভুলগুলো লক্ষ্য করা হয়নি । আর সব কিছু মোটামুটি ঠিক আছে ।
বই পড়তে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক ভুল চোখে পড়ল । এই বইয়ে এক জায়গায় ইউপিডিএফ এর নাম উল্লেখ আছে (সম্ভবত ৫৮ পৃষ্ঠায়) । বলা হয়েছে পাহাড় থেকে বিতাড়িত জনগোষ্ঠী জেএসএস, ইউপিডিএফ সহ অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনে যুক্ত হয় । এখন কথা হলো, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট সংক্ষেপে ইউপিডিএফ হচ্ছে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল। ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর এটি ঢাকায় একটি কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় । তাহলে ১৯৮৪-’৮৫ সালের ঘটনা অবলম্বনে লেখা বইয়ে এই সংগঠনের নাম উল্লেখ করা কতটা যৌক্তিক? এটা সেই অর্থে বড় কোনো ভুল নয় । এর জন্য উপন্যাসের সাহিত্যমানে কোনো প্রভাব পড়বে না । এমনকি যেসব পাঠক পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস জানেন না, তাঁদের কাছে এটা কোনো ভুলই নয় । কিন্তু তবু আমার মনে হয়, যেসব পাঠক সঠিক ইতিহাস জানেন, তাঁদের কথা মাথায় রেখে হলেও এই জায়গাটি সংশোধন করা উচিৎ ।
আমি যতদূর জানি, এই বইটার প্রথম মুদ্রণ প্রায় শেষ । ফেসবুকসহ কিছু সাহিত্য ব্লগে পাঠকদের পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠেছে, এই বইয়ের আরও সংস্করণ বের করার । নিশ্চয়ই বের হবেও, তখন এই ছোটখাট ভুলগুলো সংশোধনের ব্যাপারে লেখক সচেতন হবেন- এই আশা রইল ।
যাই হোক, ভালো লাগছে এটা ভেবে- অবশেষে বাংলা সাহিত্যে আরেকজন নতুন ভালো লেখক এসেছেন । গত পাঁচ বছর ধরে আমি যতগুলো নতুন লেখকের বই পড়েছি, সবগুলো শেষ করেই বিরক্ত হয়েছি । এইবার ব্যতিক্রম ঘটল ।
এই বইটির প্রচ্ছদ যিনি করেছেন তিনি একটি বিশেষ ধন্যবাদ পেতেই পারেন । দীর্ঘদিন পর এত সুন্দর একটা প্রচ্ছদ দেখলাম ।
এগিয়ে যাক লেখক ও এই লেখকের লেখালেখি । শুভকামনা অশেষ ।
বই পরিচিতিঃ
নীল পাহাড়
লেখকঃ ওবায়েদ হক
প্রকাশনীঃ কাকলী প্রকাশ
পৃষ্ঠাঃ১১২
দামঃ১৫০ টাকা

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


