somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বই ব্যবচ্ছেদ ১ঃ নীল পাহাড়-ওবায়েদ হক

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি সেই অর্থে রিভিউ দিচ্ছি না, শুধু বইটি পড়ে নিজের একান্ত ভালো লাগা-না লাগার অনুভুতিগুলো শব্দে লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছিঃ

প্রথমেই আসি ভালো লাগার কথায়, ভালো লাগার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, পুরো বইটিই ভালো লেগেছে । উপন্যাসের কাহিনী, চরিত্র চিত্রণ, সর্বোপরি ওবায়েদ হক নামের অচেনা, অজানা, নতুন লেখকের অসাধারণ লেখনী । বইয়ের কিছু কিছু কথা শুধু মনই ছুঁয়ে যায়নি, বরং মনের অনেক গভীরে দাগ কেটেছে । যেমনঃ মা এসেছিল একদিন কালো স্লেটে, ‘ম’ এর সাথে ‘আ’ কার দিয়ে মা হয়েছিল । কিংবা কার্তিককে বলা মানিকের সেই কথাটা, ‘খাবার সময়ে আমার ডাল আমি তোকেই দিব, তুই তোর মা দিস ।’ ছোট একটা ছেলের মায়ের আদরের জন্য, ভালোবাসার জন্য গভীর আকুতি, লেখক কত সুন্দর করেই না ফুটিয়ে তুলেছেন এই দু’টি বাক্যে । কোথায় যেন শুনেছিলাম, একজন লেখক আসলে ছবি আঁকেন, লেখক ছবি আঁকেন শব্দ দিয়ে, কাহিনী তাঁর ক্যানভাস । এই দুটো বাক্য পড়ে আমার সেই কথাটাই মনে পড়ে গেল । এই বইয়ের আরেকটি কথা যেটি আমার মনে দাগ কেটেছে, সেটি হলো উমের সেই মানিকের কাছে তার সন্তানকে বাঁচাতে সেই আকুতি, ‘এইটাও মানুষ ডাক্তার বাবু, এইটারে বাঁচান ।’ আগের দু’টি বাক্যে যদি ছোট একটা শিশুর মায়ের জন্য আকুলতা প্রকাশ পায় তো এই উক্তিটি প্রকাশ করে গেছে একটা মায়ের তার সন্তানের জীবন বাঁচিয়ে রাখার ব্যকুলতা । সত্যিই অসাধারণ!


এইবার আসি খারাপ লাগায় । খারাপ লাগার কথা বলতে গেলেই প্রথমে আসে প্রত্যেকবার ‘বলল’র পর বিশাল বিশাল ড্যাশ দিয়ে উক্তিগুলো লেখা । প্রত্যক্ষ উক্তি তো বলল লিখে কমা দিয়ে উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতর দিলেই সুন্দর লাগে । দু’একটা জায়গায় ‘বুঝে’ শব্দটির প্রয়োগ দেখলাম যা আমার কাছে ভালো লাগেনি, মনে হয়েছে ‘বোঝে’ ব্যবহার করলে ভালো হতো । কিছু কিছু জায়গায় মূল কাহিনী থেকে বের হয়ে গিয়ে অন্যান্য কাহিনীর বর্ণনা পাঠক হিসেবে আমার মনোযোগ নষ্ট করেছে । উদাহরণস্বরূপ- মংওয়াই এর মা’র কথা বলতে গিয়ে লেখক হুট করে চলে গেলেন ‘বাংলাদেশে একজন ডাক্তার ছিলেন…’ । আরেকটা ব্যাপার হলো, একটা বিশেষ সময়কে ধরার চেষ্টা করা, এই বইয়ের শুরুর দিকে ‘১৯৮৪ সালের...’ আর দু’-এক জায়গায় ‘প্রেসিডেন্ট এরশাদ’ এর নাম উল্লেখ করা ছাড়া আশির দশকের সময়টাকে ধরার তেমন কোনো চেষ্টা আমি পাইনি । এইখানে আমি সত্যিই একটু আশাহত হয়েছি । এই কথাটা বলছি, কারণ, আমি লেখকের ‘জলেশ্বরী’ পড়া শুরু করেছিলাম । সেখানে অসম্ভব সুন্দরভাবে সময় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা ‘নীল পাহাড়’ এ হয়নি । কিছু জায়গায় প্যারা শেষ না করেই নতুন প্যারায় চলে যাওয়া হয়েছে, তবে আমার ধারণা, এইগুলো লেখকের ভুল নয় বরং বইটি ছাপিয়েছে যে প্রকাশক তিনি সঠিকভাবে সম্পাদনা করেননি কিংবা প্রুফ রিডিং এর সময় এই ভুলগুলো লক্ষ্য করা হয়নি । আর সব কিছু মোটামুটি ঠিক আছে ।

বই পড়তে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক ভুল চোখে পড়ল । এই বইয়ে এক জায়গায় ইউপিডিএফ এর নাম উল্লেখ আছে (সম্ভবত ৫৮ পৃষ্ঠায়) । বলা হয়েছে পাহাড় থেকে বিতাড়িত জনগোষ্ঠী জেএসএস, ইউপিডিএফ সহ অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনে যুক্ত হয় । এখন কথা হলো, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট সংক্ষেপে ইউপিডিএফ হচ্ছে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিত্তিক একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল। ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর এটি ঢাকায় একটি কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় । তাহলে ১৯৮৪-’৮৫ সালের ঘটনা অবলম্বনে লেখা বইয়ে এই সংগঠনের নাম উল্লেখ করা কতটা যৌক্তিক? এটা সেই অর্থে বড় কোনো ভুল নয় । এর জন্য উপন্যাসের সাহিত্যমানে কোনো প্রভাব পড়বে না । এমনকি যেসব পাঠক পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস জানেন না, তাঁদের কাছে এটা কোনো ভুলই নয় । কিন্তু তবু আমার মনে হয়, যেসব পাঠক সঠিক ইতিহাস জানেন, তাঁদের কথা মাথায় রেখে হলেও এই জায়গাটি সংশোধন করা উচিৎ ।

আমি যতদূর জানি, এই বইটার প্রথম মুদ্রণ প্রায় শেষ । ফেসবুকসহ কিছু সাহিত্য ব্লগে পাঠকদের পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠেছে, এই বইয়ের আরও সংস্করণ বের করার । নিশ্চয়ই বের হবেও, তখন এই ছোটখাট ভুলগুলো সংশোধনের ব্যাপারে লেখক সচেতন হবেন- এই আশা রইল ।

যাই হোক, ভালো লাগছে এটা ভেবে- অবশেষে বাংলা সাহিত্যে আরেকজন নতুন ভালো লেখক এসেছেন । গত পাঁচ বছর ধরে আমি যতগুলো নতুন লেখকের বই পড়েছি, সবগুলো শেষ করেই বিরক্ত হয়েছি । এইবার ব্যতিক্রম ঘটল ।

এই বইটির প্রচ্ছদ যিনি করেছেন তিনি একটি বিশেষ ধন্যবাদ পেতেই পারেন । দীর্ঘদিন পর এত সুন্দর একটা প্রচ্ছদ দেখলাম ।

এগিয়ে যাক লেখক ও এই লেখকের লেখালেখি । শুভকামনা অশেষ ।

বই পরিচিতিঃ
নীল পাহাড়
লেখকঃ ওবায়েদ হক
প্রকাশনীঃ কাকলী প্রকাশ
পৃষ্ঠাঃ১১২
দামঃ১৫০ টাকা

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৭ দুপুর ১:৪৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×