somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধারাবাহিক ছোটগল্প: নীল নিশিতা (প্রথম পর্ব)

০৯ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ৮:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ কতদিন হয়ে গেছে, তাই না? তিন বছর? চার বছর? নাকি তার চেয়েও বেশি? আমার তো হিসাব রাখা হয়নি । তুমিও নিশ্চয়ই রাখনি?

ঐশী নামের মেয়েটার কথা মনে আছে তোমার? আরে ঐ যে সেই মেয়েটা, প্রতিদিন বাবার অনেক দামী একটা গাড়িতে করে আসত, আর মাথার চুল হেকে পায়ের নখ, শরীরের প্রতিটা অংশ থেকে যেন আলাদা আলাদা করে অহংকার ঝরে পড়ত । সত্যি বলি, প্রথমদিন মেয়েটাকে আমার একদমই ভালো লাগেনি ।

আনোয়ার স্যারের অংক কোচিংয়ে প্রথম দেখেছিলাম মেয়েটাকে । স্যার সাংঘাতিক ভালো জিওমেট্রি আর ক্যালকুলাস করান—এই কথা শোনার পর আমিও কলেজের আরও অনেক ছেলের সাথে স্যারের ওখানে ভর্তি হয়ে গেলাম । প্রথমদিন মেয়েটা যখন স্যারের সাথে কথা বলছিল, সেদিন একটা ‘মেয়েমানুষ’-এর এমন চ্যাটাং চ্যাটাং কথা একদম ভালো লাগেনি আমার ।

জানো, আমার সেই সময়ের জীবনটা না খুব বেশি পানসে ছিল । ঢাকা শহরের নামকরা একটা কলেজে চান্স পেয়ে নতুন নতুন শহরে এসেছি, হোস্টেলে উঠেছি । চোখের সামনে শহরের ‘রঙ’ যা-ই দেখছি তা-ই হাঁ করে গিলছি ।

বন্ধুবান্ধব আমার একদম ছিল না । কেন ছিল না সেই কারণটা আমি নিজেও জানি না, কে জানে হয়তো আমার দোষেই কারও সাথে বন্ধুত্ব হয়নি । আমার নিজের ভেতরের সেই সময়কার ‘আমি’কে নিয়ে দারুণ কুণ্ঠাবোধ ছিল আমার । আমি আর সবার মতো কথার মাঝখানে ফটাফট কঠিন কঠিন ইংরেজি শব্দ বলতে পারি না, বিশুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলতে পারি না, সিনেমা-টেলিভিশনের সুপারস্টারদের খবর দূরে থাক নামও ঠিকঠাক মতো জানি না, জানি না হালের ফ্যাশনে কোন খেলোয়াড়ের চুলের ছাঁট চলছে; এরকম আরো কত না পারা, কত না জানা ছিল আমার । এখন হয়তো ভাবলেই হাসি পায়; কিন্তু বিশ্বাস করো, সেই সময়ে এই ‘না পারা’, ‘না জানা’গুলোকে রীতিমতো অপরাধ মনে হতো আমার কাছে ।

বিশুদ্ধ বাংলা-ইংরেজিতে আমি পাতার পর পাতা লিখে যেতে পারি । কিন্তু কথা বলতে গেলেই যে কী হয়! ভুলে দু’-একটা আঞ্চলিক উচ্চারণ বের হয়ে যায়, আর তখন সেটাই হয়ে যায় বন্ধুদের হাসির প্রধান খোরাক । আমার প্রতিটা কথার প্যারোডি করা হয়, নিত্য নতুন নাম বের করা হয় আমার । বাধ্য হয়ে আমাকেও হাসতে হয়; হাসিও আমি । কিন্তু ভেতরে ভেতরে কষ্টে বুকটা ফেটে যায়, নিজের অপারগতায় নিজেকেই অপরাধী মনে হয় ।

কাজেই যা হবার তা-ই হলো । নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিলাম, কলেজের বন্ধুদের আড্ডায় আর সময় দেই না, পারতপক্ষে কারও সাথে কোনো কথা বলি না ।

সকাল পৌনে আটটায় কলেজে ব্যাগ নিয়ে ঢুকি আর দুপুর দেড়টায় বের হই । প্র্যাকটিক্যাল থাকলে বিকাল চারটা-পাঁচটা বেজে যায় । কলেজের পর দু’জন স্যারের বাসা ঘুরে সোজা হোস্টেল । এরপর বইয়ে মুখ ডোবানো, পাঠ্যবই কিংবা গল্পের বই ।

রাত যখন গভীর থেকে গভীরতর হয় তখন হোস্টেলে আড্ডা বসে । আলোচনা শুরু হয় কোন নায়িকা কোন পোশাক পরে কতটা ‘হট’ হয়েছে কিংবা নীল ছবি দেখে কে কত টাকার ইন্টারনেট ফুরিয়েছে তা নিয়ে । সেসব আলোচনায় যাই না আমি । বন্ধুরা অনেক অনুরোধ করে, রাত জেগে কী এত পড়াশোনা করিস? চল না । একদিন গেলেই মজা পাবি, দেখবি আর উঠতেই ইচ্ছা করবে না । বড় ভাইরাও ডেকে পাঠায় । তবুও যাই না আমি, যাওয়া হয় না । আমিও তো ওদেরই মতো রাত জাগি, তবু কেন যাই না আমি?

ঠিক ধরেছ, ওদের সাথে সিনেমা-খেলার আলোচনায় পেরে উঠব না আমি, ‘হংস মধ্যে বক যথা’ হয়ে বসে থাকা লাগবে, তাই যাই না । তবে এটাও কিন্তু একমাত্র কারণ নয়; ততদিনে আমি বুঝে গেছি তোমাদের এই ঢাকাই স্মার্টনেসটা ঠিক আমি যেরকম ভাবি সে রকম নয়; এখানে শুদ্ধ ভাষা বললে সেটা আধুনিকতা হয় না, বরং শুদ্ধ প্রমিত ভাষায় কথা বললেই সে ‘খ্যাত’, এখানে বাংলাও বলতে হয় ইংরেজির মতো করে, টেনে টেনে ।

তাই কোনো আড্ডায় যাই না আমি, যাওয়া হয়ে উঠে না, মাঝে মাঝে ইচ্ছা করলেও সাহস করে যেতে পারি না । তিনশ’ বোর্ডারের হোস্টেলে থেকেও আমি সঙ্গীহীন । প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ছাত্রের কলেজে পড়েও আমি বন্ধুহীন । এই বিশাল শহরে প্রায় দু’কোটি মানুষের মাঝে থেকেও আমি একা; বড় একা ।

******

ঠিক সেই সময়ে আমার মুঠোফোনে একদিন একটা ক্ষুদেবার্তা এল, ‘কেমন আছো?’ আমি রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম । আমার মাত্র বারো শ’টাকায় কেনা ফোনে তো মোবাইল কোম্পানী ছাড়া আর কেউ বার্তা পাঠায় না, বাড়ির লোকের সাথে যা কথা হবার তা সরাসরিই হয়, মেসেজ-টেসেজ লাগে না । সেই আমাকে কে এসএমএস পাঠাল?

আমি প্রথমে কোনো উত্তর দেইনি । পরপর তিনবার সেই একই এসএমএস এল । চতুর্থ এসএমএস, ‘আমার সাথে কথা বলবে না?’
প্রায় আধঘন্টা পর আমি ভয়ে ভয়ে রিপ্লাই পাঠালাম, ‘কে আপনি? আমি কি আপনাকে চিনি? আপনি আমার পরিচিত?’

উত্তরে এল একটা হাসির ইমোটিকন । সাথে লেখা, ‘চিনতে চাইলেই চেনা যায় । পরিচিত ভাবলেই পরিচিত ।’

এই একটা এসএমএস-ই আমার বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল । কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কেমন যেন ভয় ভয় লাগছিল, আবার সাথে সাথে মানুষটা কে তা জানার প্রবল কৌতূহলও দমিয়ে রাখতে পারছিলাম না ।
কে হতে পারে? কে! কে! অজস্রবার এই এক শব্দের একটা প্রশ্নই আমার মনে ঝড় তুলছে । পরিচিত কেউ? বন্ধুদের কেউ মজা করছে? কে সে?

উত্তেজনার বশে কৌতূহল শেষ পর্যন্ত দমন করতে পারলাম না, আগের চাইতেও কয়েক গুণ বেশি ভয় নিয়ে নাম্বারটাতে ফোন ধরলাম । রিংটোনের সমাপ্তির পর অপর প্রান্তে শুনতে পেলাম নারীকণ্ঠের রিনঝিন হাসির শব্দ । হাসতে হাসতেই বলল কণ্ঠটা, ‘ভয় ভাঙল তাহলে? আরে ভাই, আমি বাঘ-ভাল্লুক না, তোমার মতোই মানুষ ।’

হাসির রিনঝিন শব্দ, অপূর্ব মাতাল করা একটা কণ্ঠস্বর, কত সহজে অপরিচিত একটা ছেলেকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে ফেলল মেয়েটা । তুমিই বলো, এরকম একটা মেয়েকে ভালো না লেগে পারা যায়? দুইটা চকচকে পাঁচশ’ টাকার নোট বাজি রেখে বলছি, আমার জায়গায় তুমি থাকলে আর তুমি যদি ছেলে হতে তাহলে তোমারও আমার মতো অনুভূতি হতো ।

শিরদাঁড়ায় শিহরণ তখনো কমেনি আমার, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কোনো রকমে জিহ্বা দিয়ে মুখের ভেতরটা ভিজিয়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘কে আপনি?’


(চলবে)

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ৯:০০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি একটি বেঈমান আর গাদ্দারদের দল।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫০

‘বিএনপি ৭৫এর যোদ্ধাদের রক্ষা করেনি, ২৪ এর যোদ্ধাদেরও রক্ষা করবে না।’ ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×