একসময় তুমি গান গাইতে। নজরুল গীতি গাইতে বড় শখ করে। তোমার গলায় বেশ সুন্দর লাগত। মাঝেমধ্যে ছুটির দিন সকালে যখন তুমি রেওয়াজ করতে বসতে, রাগ-গুলোর কোন মানেই আমি বুঝতাম না। অবাক বিস্ময়ে শুধু চেয়ে দেখতাম, তুমি আপন মনে রাগ তুলে যাচ্ছ একটার পর একটা। এসবের মানে কি তা কখনও জানতে চাইতাম না তুমি যদি বিরক্ত হও তা ভেবে। তবে একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করে দেখেছি, যেদিন সকাল বেলা তুমি রাগ প্রাকটিস করতে; সেদিন সন্ধায় তুমি নিজে থেকে গান গেয়ে শুনাতে আমায়। তোমার মনে আছে কি না, কোনটা ছিল আমার প্রিয় গান। “আমি চাঁদ নহি, অভিসার...” এই গানটা আমি নিজেও তোমার সাথে সাথে গাইতাম। আমার গানের সূর, তাল, লয়, গলার স্বর কোনকিছুরই ঠিক থাকত না। এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই তুমি আমাকে ক্ষ্যাঁপাতে।
আজকে হঠাৎ করে কেন এসব কথা বলছি, জানি না। হয়তবা আজ তুমি কাছে ণেই বলে। হয়তবা আজকে কোন একটা বিশেষ দিন যা আমি মনে করতে পারছি না। ভেবে দেখো, একসময় আমাদের জীবনে অনেক বিশেষ দিন ছিল, আর সেই দিন গুলো আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ন ছিল। একেকটা দিনের জন্য একেক ধরনের আয়োজন থাকত আমাদের নিজেদের মত করে। আর আজ! এখনতো আমার নিজের জন্মদিনটাই মনে থাকে না। তোমার বেলায় এমনটি হয় কি না আমি জানি না। তুমি চলে যাবার পর থেকে তোমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তো আর কিছুই জানতে পাই না। ভাল আছো নিশ্চয়ই। না হলে এতদিন আমার থেকে দূরে থাকতে না। ছুটে চলে আসতে আমার কাছে। তুমি ভাল থাক সেটা আমি সবসময়ই চাই। তবে রাগে অভিমানে আমার থেকে দূরে সরে থাকবে তুমি, সেটা আমি আজও মেনে নিতে পারি নি। তুমিই বল, আমার পক্ষে কি এতকিছু মেনে নেয়া সম্ভব? কেন আমাকেই সব মানতে হবে?
সেই কবে তুমি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছ। এত তাড়াতাড়ি গান ছেড়ে দিবে তা আমি বুঝতে পারিনি। ঠিক কি কারণে তুমি গান করা ছেড়ে দিলে, তা তুমি মুখ ফুটে কখনও বলনি আমাকে। তবে আমি অনুমান করে নিতে পেরেছিলাম ঠিকই। তুমি চেয়েছিলে গান বাঁজনা ছেড়ে দিয়ে ধর্ম কর্মে কিছুটা মনযোগ দিতে। তাই না? আমাদের মেয়েটা যখন তোমার গর্ভে আসল তারপর থেকেই তুমি গান গাওয়া, রেওয়াজ করা সবই ছেড়ে দিলে। আমি প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম, শারীরিক পরিবর্তনের কারণে হয়ত তুমি কিছুটা আনমনা হয়ে থাক। তাই গান বাঁজনা করতে তোমার ভাল লাগে না। কিছুদিন গেলে সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মনে মনে যে তুমি ভয় পাচ্ছিলে, ধীরে ধীরে ধার্মিক হওয়ার চেষ্টা করছিলে তা কিছুদিন পরেই আমি বুঝতে পেয়েছিলা।
তবে তোমার ভয় পাওয়া, গান বাঁজনা ছেড়ে দেওয়া, ধার্মিক হয়ে যাওয়া এসবের মধ্যে দিয়ে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলে তা কখনই আমি বুঝে উঠতে পারিনি। আজকে হঠাৎ মনে হচ্ছিল যে, যদি আমি জানতে পারতামও তাহলে কী করতে পারতাম আমি। তোমাকে বাঁধা দেবার, কিংবা তোমাকে ধরে রাখার কোন সামর্থ্য কি ছিল আমার? তুমি তো তোমার সিদ্বান্ত নিয়েই নিয়েছিলে। তোমাকে ধরে রাখার, কাছে থাকার চেষ্টা হয়ত আমি করতাম, কিন্তু তাতে কোন লাভ হত না। জানি না কি অপরাধ ছিল আমার? হয়তবা তোমাকে আমি নিয়মের থেকে অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছিলাম। তাই আমার এতটা খারাপ লাগে। অতীত জীবনের অনেক কিছুই আমার মনে ণেই। তবু তোমার সবকিছুই আমার মনে পড়ে। তোমার হাটাচলা, কথা বলা, বাচন ভঙ্গী, তোমার গান, তোমার অভিমান, তোমার চোখের পাপড়ি, ঠোটের মাঝখানে ছোট্ট একটা তিল, তোমার চুলের গন্ধ, তোমার প্রতিটা ব্যাপারই আমার স্পষ্ট মনে আছে। তুমি চলে যাওয়ার সময় যা কিছু আমার ঘরে রেখে গেলে তার মধ্যে তোমার কিছু জামা কাপড়, কিছু মেক-আপ সামগ্রী, রাঙ্গামাটি থেকে কেনা তোমার সেই মাটির কানে দুল। তুমি অনেক গোছালো টাইপের মেয়ে ছিলে। খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজয়ে রাখতে তোমার প্রতিটা জিনিস, আসবাব পত্র। তোমার সেই জিনিসগুলো তোমার হাতে যেভাবে সাজিয়ে-গুচিয়ে রেখেছিলে, আমি সবকিছু সেভাবেই রেখে দিয়েছি। কোনকিছুতেই হাত লাগাই নি। যদি জিনিসগুলো অগোছালো হয়ে যায় এই ভয়ে।
তুমি যেদিন প্রথম আমায় গান শুনিয়েছিলে, সেদিনের কথাটা নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে। সেইদিনটা বেশ রোদেলা ছিল। কিন্তু ভার্সিটি ক্যাম্পাসে লোকজন খুবই কম ছিল। পৌষ মাসের ১৮ তারিখ, রবিবার ছিল দিনটা। তুমি-আমি, মনিকা, রাশেদ, লুবনা আর নাজিয়া বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম ক্যামিষ্ট্রি ল্যাবের পেছনে। চা, সিংগাড়া আর সিগারেটের মধ্য দিয়ে ভালই চলছিল আমাদের আড্ডা। আমার সিগারেট খাওয়া তুমি একদমই পছন্দ করতে না। তারপরও যখন আমি তোমার সামনে সিগারেট টানতাম তখন তুমি খুব বেশি একটা কিছু বলতে না। সেদিন তুমি আমার সিগারেট খাওয়া দেখছিলে। হঠাৎ বলে উঠলে “আচ্ছা রফিক, আমি যদি তোকে এখন, এই পরিবেশে একটা গান শুনাই, তাহলে কি তোর ভাল লাগবে? আমার গানটা কি তুই তোর সিগারেটের ধুয়ার চেয়ে বেশি উপভোগ করতে পারবি? চেষ্টা করে দেখতো একবার...” আমি তোমার কথা শুনে ঠাট্টায় মশগুল হয়ে গেলাম। আমার সাথে সাথে রাশেদ আর নাজিয়াও বেশ তাল মেলাচ্ছিলো। আমাদের এসব ঠাট্টার মধ্যেই তুমি তোমার গানটা শুরু করলে। গানের কথা গুলো ছিল, “ওই ঝিনুক ............, আমি মন ভেজাবো ঢেউয়ের মেলায়, তোমার হাতটি ধরে .........” সেদিন আড্ডার পরিবেশটা কেমন জানি একটু অন্যরকম হয়ে গেল। গান শুনা শেষে আরেক পর্ব চা হল। তারপর হাটতে হাটতে সবাই বাসস্টপে চলে আসলাম। একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করেছিলাম, সেদিন বাসায় ফেরার পথে শুধু তুমি-আমি না, আমরা সবাই-ই খুব শান্ত আচরন করছিলাম। তোমার গান যে শুধু আমাকে স্পর্শ করেছিল তা না, থমকে দিয়েছিলো আমাদের সবাইকে। সেদিন বাস থেকে নেমে যখন আমরা রিক্সা নিলাম তখন তোমার চেহারায় একটা লাজুক ভাব ছিল। রিক্সায় বসে তুমি সেদিন আমাকে গিফট দিয়েছিলে আর্চিজের একটা লাভ পিলো। লাল রঙের পিলটা দেখে সেদিন আমি নিজেই লাল হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ তোমার দেয়া সেই লাভ পিলোটা আজও আমার গাড়ীর মিরারে ঝুলে। যতবার আমি ড্রাইভ করতে গিয়ে মিরার দেখি ততবারই আমি তোমার সেই লজ্জা রাঙ্গা চেহারাটা দেখি।
সেদিন ছিল চৈত্র মাসের ১২ তারিখ ১৪১৪। তুমি সেদিন তোমাদের বাসাতেই ছিলে। মা দুপুর বেলা ফোন করে জানালেন তোমাকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছেন। আমিও বের হয়ে পড়লান অফিস থেকে। হাসপাতালে ডুকেই দেখলাম আমার ভাগ্নিটা রিসেপশনে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমাকে দেখেই উঠে দাড়াল, বলল “মামা আমার খুব ভয় হচ্ছে, মামী কেমন জানি আবুল তাবুল বকছেন। ডাক্তার বলছে তার ইন্টারনাল ব্লিডিং হচ্ছে আর বাচ্চার অবস্থাও খুব একটা ভাল না।” আমি কিছু না বলেই গুটি গুটি পায়ে তোমার কেবিনে ঢুকলাম। দেখতে পেলাম তুমি জানালার দিকে তাকিয়ে কি জানি বলছিলে। তোমার মাথায় হাত রাখলাম, তুমি তাকালে আমার দিকে। বলতে লাগলে, “তোমার জন্য কাবাব বানিয়েছিলাম- খাও নি কেন? নাকি ফ্রিজটা খোলার সময়টাও পাও না? আজকে খুব বেশি কিছু না। পুই শাক সাথে আলু-টমেটো দিয়ে বোয়াল মাছ রান্না করেছি। তুমি গরম করে খেয়ে নিও। আমাকে ডেকো না। আমি আজকে খাব না ......”
কথাগুলো বলছিলে আর ঘামছিলে তুমি। আমি কোন কথা বলার আগেই ডাক্তার এসে ঢুকলেন কেবিনে। আমার সাথে আলাপ আছে বলে আমাকে তাঁর রুমে নিয়ে গেলেন। তুমি তখন কি জানি একটা কথা বলতে চাইছিলে, আর আমি না শুনে বললাম আসছি। ডাক্তারের রুম থেকে বের হয়ে এসে দেখলাম তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছো। ওরা শুধু একবার আমাকে তোমার কাছে আসতে দিয়েছিল। তোমার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলাম তাড়াতাড়ি ফিরে এসো প্লিজ। আসার সময় আমার জন্য উপহার নিয়ে আসবে তা আমি জানি। তবে সেই উপহারটা বয়ে নিয়ে আসতে তোমার অনেক কষ্ট হবে আমি জানি। তারপরও তুমি কষ্ট করে ফিরে এসো। আমি তোমার ফিরে আসা, তোমার উপহার এবং তোমার না বলা কথাগুলো শুনার জন্য অপেক্ষায় থাকবো। আমাকে ওরা তোমার সাথে যেতে দিবে না, তবে তুমি ওখানে একা যাচ্ছ না। আমার সর্বস্বত্বা উজাড় করা ভালবাসা তোমার সাথে যাচ্ছে। তুমি তখন গম্ভীর হয়ে শুয়েছিলে স্ট্রেচারে। তোমার অভিমানী চেহারা আমাকে জানি কিছু একটা বলছিল। বুঝতে পারিনি সেদিনও। ঘন্টা দুয়েক পরে ওই বিভিষিকাময় ঘরটা থেকে ডাক্তার নার্স সবাই একে একে বেরিয়ে এল। শুধু আসনি তুমি আর আমার তোফা...
তুমি তোমার জীবনের যতটা দিন আমার সাথে কাটিয়েছ, তার বেশির ভাগ সময়ই তুমি কাটিয়েছ আমাকে শোধরাবার চেষ্টা করে। আমার শত সহস্র ভুল আর বদভ্যাস শোধরানোই ছিল তোমার দৈনন্দিন জীবনের একটা কর্তব্য। তুমি কখনও আমার উপর অভিমান করে থাকলে তুমি মুখে কিছুই বলতে না আমাকে। আর আমি তোমার অভিমানের সঠিক কারণ কখনই বুঝতে পারতাম না। অনেক সময় লেগে যেত বুঝতে। এ নিয়ে প্রায়ই তুমি আফসোস করে আমাকে বলতে, “আমি কোনদিনই তোমার এই বোধের কোন উন্নতি দেখতে পেলাম না।” তোমার সেই কথাটা আজও সত্যি। আমি আজও বুঝতে পারিনি, তোমার সেই শেষ অভিমানের কারন। কেন আমায় ছেড়ে চলে গেলে? কী এমন অভিমান ছিল তোমার? কেন আজও ফিরে আসনি? তুমি কি সত্যিই আর কোনদিন ফিরে আসবে না? আচ্ছা তোমার কি আসতে ইচ্ছা করে না?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


