কাজী নজরুল ইসলাম বাদ। রবীন্দ্রনাথকে সর্বপ্রথম মূল্যায়ন করে তার পরের আসনেই অধিষ্ঠানের অপচেষ্টা করা হয়েছে তাকে নিয়ে। ইদানীং তাকে সৈয়দ হক অথবা হক নামেও ডাকা হচ্ছে।
তিনি সৈয়দ শামসুল হক।
বাংলা সাহিত্যের বর্তমান ধারায় অশ্লীলতা অন্তর্ভুক্তির জনক সৈয়দ হক ছেলেবেলায়ই যে খারাপ পাড়ার সংস্পর্শে গিয়েছেন তা তার রচনায় খোলামেলা স্বীকার করেছেন।
এদিকে অন্য কেউ নয়, খোদ তসলিমা নাসরীন তার লেখায় সৈয়দ হক কিভাবে তাকে পটিয়ে পটিয়ে ভোগ করেছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
সৈয়দ হক অবশ্য তার মান-সম্মান রক্ষার্থে তসলিমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে
তসলিমার বিরুদ্ধে
মামলা ঠুকেছেন
রায়ও পেয়েছেন।
তবে এক্ষেত্রে সৈয়দ হক কিন্তু নিজের, সমমনা সাহিত্যিক এবং ‘খেলেরাম খেলে যা’ ধারার সাহিত্য রচনারই পরাজয় স্বীকার করলেন। নিকৃষ্টতা প্রমাণ করলেন।
তিনি আবহমান কালের নীতিবোধের অধিষ্ঠানের কাছে নত হলেন।
ব্যভিচার যে পাপ এবং ব্যাভিচার যে লজ্জাকার ব্যাপার;
ব্যভিচারী যে ঘৃণিত ও ধিকৃত পাত্র
-ইসলাম ঘোষিত সে মর্মবাণীরই প্রকাশ্য জয়গান করলেন।
শুধু তাই নয়, এদেশের মানুষের মনে যে এ চেতনাবোধ এখনো জোরদার তার জাগরুক আছে এবং তদপ্রেক্ষিতে তসলিমার অভিযোগ অস্বীকার না করলে সৈয়দ হক প্রকাশ্যে ধিক্কারের পাত্র হবেন সে ভয়ে তিনিও ব্যভিচারের বিরুদ্ধ অবস্থানে গেলেন।
জোর গলায় কোর্টে বললেন, “ব্যভিচার তিনি করেননি।” এবং “তিনি তসলিমার সাথে ব্যাভিচার করেছেন”- তসলিমা নাসরিন একথা লিখাতে তার মান-সম্মানের ক্ষতি হয়েছে।” -একথা বলে কোর্ট থেকে মানহানির মামলার রায়ও নিলেন।
এখানে সৈয়দ হক গংদের লেখনী এবং সমাজের অবস্থা
তথা নিজেদের বাস্তবতা
যে পরস্পর বিরোধী
সে বিষয়টি বিশেষভাবে স্পষ্ট ও জোরদারভাবে প্রমাণিত হয়।
বাস্তবে সৈয়দ হকরা; ব্যভিচারের দায় স্বীকার করবেন না। কিন্তু তাদের যত রচনা রয়েছে তাতে বলতে গেলে ছত্রে ছত্রে ব্যভিচারের উন্মাদনা উজাড় করে দিবেন।
এ উন্মাসিকতার অবাধ চর্চা অদ্যাবধি তারা করছেন। অদ্ভুত স্ববিরোধিতার নজির রাখছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম-এর সম্পর্কে এখনও গ্রামের মূর্খ লোককেও কনভিন্সড করতে হয়না।
কিন্তু জন্মের ৭৫ বছর পর সৈয়দ হক এখনো কনভিন্সড করতে নেমেছেন।
জীবনের পড়ন্ত বেলায় নবীন-কাঁচা সাংবাদিকদের কাঁধে ভর করেছেন। তাও আবার ঐ নিজস্ব ঘরনায়ই ঢু মেরেছেন।
৭৫তম জন্মদিবস পালনের দু’দিন আগ থেকেই চিহ্নিত এজেন্ট পত্রিকা ‘আমাদের সময়ে’ প্রথম পৃষ্ঠায় হাইলাইট করে ক্যানভাস করিয়েছেন।
ক্যানভাসের হেডিং ছিলো- “তার স্থান এ জাতি এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি॥ শিল্পাত্মা সৈয়দ হকের ৭৫তম জন্মদিন আগামীকাল।”
কবি সৈয়দ শামসুল হক। বিরল প্রতিভার এক সব্যসাচী লেখক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, সঙ্গীত, চিত্রকলা- শিল্পের কোন শাখা আছে, যেখানে সৃষ্টি নেই সৈয়দ হকের? রবীন্দ্রনাথের পর একমাত্র সৈয়দ হকই তার সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মহৎ জীবনবোধের সমৃদ্ধ সব ফসল তুলে এনেছেন বাঙালির রত্নঘরে।
সৈয়দ হক, সৈয়দ হকই। তার তুলনা তিনি নিজেই, আর কেউ নন। সকল ক্ষেত্রে এমন কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি সমকালের আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিকের নেই।
কবিতায় সৈয়দ হক যেমন আন্তঃনিপুণ দ্রষ্টার চোখে তুলে এনেছেন আবহমান বাঙালির ভূমি, প্রকৃতি, নিসর্গ মানুষ আর এ সকল অনুষঙ্গের অতল গভীর সূক্ষ্ম জীবনবোধ, তেমনি গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধসহ অন্য শিল্পমাধ্যমেও তিনি বিশ্বমানবের উম্মিলিত চেতনার ভূভাগে প্রতিস্থাপিত করেছেন বাঙালির সহস্র বছরের অন্তঃশীল জীবনপ্রবাহকে।
রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষের স্বপ্ন ও সৌন্দর্যময় ক্রমোগ্রসরমান বেঁচে থাকার মহৎ চেতনাজাত এই মহান শিল্পী অবশ্যম্ভাবী সেই স্বপ্ন-সৌন্দর্য চলমানতার জয়-পরাজয়-সফলতা-ব্যর্থতা-আশা-হতাশা-উত্থান-পতন, পুষ্প-ক্লেদ-রক্ত-পূর্ণিমা কিংবা অন্ধকার অসাধারণ তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সার্চলাইটে তুলে ধরেছেন তার ব্যাপক সৃষ্টিকর্মে।
বাঙালির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন- মাতৃভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরশাসনবিরোধী অব্যাহত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, ভয়ঙ্কর মৌলবাদী অন্ধত্বভেদী সাহসী লড়াই সব কিছুতেই সৈয়দ হকের অপ্রতিরোধ্য মসিযুদ্ধ, চেতনাবারুদ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার অযুত প্রেরণার উৎস হয়েছে। শুধু তাই নয় কালজয়ী এই শিল্পাত্মা বারবার জীবনবাজি রেখে তার ব্যথিত, দলিত, নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ত্রাতা হয়ে। স্ববোধ, স্বচেতনা, স্বপ্রেমের প্রশ্নে আপস করেননি কখনো। তার জনগণমন নিঃসারিত শুভ-শুভ্র চেতনার জয় হয়েছে বারবার। দলমত, গোষ্ঠীস্বার্থকিলবিল ক্লীব, ভীরু দাসানুদাস সমাজে সৈয়দ হক নিরপেক্ষ নন, অজাতশত্রু নন, ঊর্ধ্বে নন বিতর্ক কিংবা সমালোচনার, পছন্দ-অপছন্দের কিংবা অসম্মানের। কিন্তু সৈয়দ হক, সৈয়দ হকই। তার সৃষ্টির বিশাল ব্যাপক আদিগন্ত বিস্তৃতি, শক্তি, ক্ষমতা ও নিপুণতার কাছে সব শত্রুতার উলঙ্গ তরবারি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় আঘাতের পূর্বেই।
তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে সৈয়দ হক তার জীবদ্দশায় প্রকৃতভাবে মূল্যায়িত নন। তার চেয়ে অনেক কম প্রতিভার ব্যক্তিপূজা যেভাবে হয়েছে সে তুলনায় তার প্রাপ্য সম্মান কিংবা স্থান এ জাতি এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি। কেন? (আমাদের সময়, ২৬ ডিসেম্বর/২০০৯ )
‘আমাদের সময়’ কথিত এই ব্যক্তিপূজার প্রসঙ্গটি টানতে হয়।
ব্যক্তিপূজা বলতে হুমায়ূনকে নিয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে কীনা সে বিতর্কে না গিয়ে যে,
‘কেন’? প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে: তার জবাব যে নেহায়েত রকমারী ও কৌশলী বিজ্ঞাপনী প্রচারণা সে বিষয়ে বলতে গেলে সবাই একমত হবেন।
এমনকি সৈয়দ হকও সেটি বুঝতে পেরে ৭৫ বৎসর বয়সেও পত্রিকার পাতায় জোরদার প্রচারণা চালালেন।
সৈয়দ হক অনুরক্ত- ‘মোহন রায়হান’ জাতিকে ধমকের সুরে শাসালেন!
হে জাতি তোমরা কেন সৈয়দ হককে নিয়ে পূজা-অর্চনা কিছুই করছো না। (নাঊযুবিল্লাহ)
সৈয়দ হককে ‘আমাদের সময়’- সব অনুষঙ্গের অতল গভীর সূক্ষ্ম জীবনবোধের’, আন্তঃনিপুর দ্রষ্টা বিশ্বমানবের উম্মীলিত চেতনার বোদ্ধা ও সমঝদার বলে উল্লেখ করেছে।
যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে তাহলে তো সৈয়দ হক ইতোমধ্যে জনজীবনের এ অনুভূতি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন যে, আম জনগণ এখনো পর্যন্ত তার নামই শুনেনি।
শতকরা ৫ ভাগ লোকও তার কোন লেখাই পড়েনি।
আবার যারাই পড়েছে তার মধ্যে শতকরা ১ ভাগও তার লেখা পছন্দ করেনি।
বিশ্বাস করেনি।
ভক্তে পরিণত হয়নি।
সৈয়দ হক্বের এ নিরেট ব্যর্থতাকে উল্টো উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর মতই চাপিয়েছে ‘আমাদের সময়’।
হেডিং দিয়েছে, ‘তার স্থান এ জাতি এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি।’ (নাঊযুবিল্লাহ)
উল্লেখ্য, ‘আমাদের সময়’ আরো মন্তব্য করেছে, “বাঙালির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন- মাতৃভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরশাসনবিরোধী অব্যাহত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, ভয়ঙ্কর মৌলবাদী অন্ধত্বভেদী সাহসী লড়াই সব কিছুতেই সৈয়দ হকের অপ্রতিরোধ্য মসিযুদ্ধ, চেতনাবারুদ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার অযুত প্রেরণার উৎস হয়েছে।”
যদি তাই হয়ে থাকে তবে একই প্রেক্ষাপটে এক ‘বিদ্রোহী’ কবিতা দিয়েই তো কাজী নজরুল ইসলাম সবার কাছে বিদ্রোহী কবি হয়ে উঠলেন।
কিন' কই! সৈয়দ হক্কের ৭৫ বছরের রচনা তো এক বিদ্রোহী কবিতার মর্মবাণীর কাছেও পৌছতে পারলো না। সে তুলনায় তার কোন লেখাই কোনই আলোড়ন তুললো না।
-০-
এদিকে সৈয়দ হকের সাথে রাবেয়া খাতুন নামক আরেক উপন্যাসিকেরও একই দিনে জন্মদিন হওয়ায় সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে।
আবেদনময়ী লেখায় তারও পিছুটান নেই।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘পরকীয়া প্রেম ভীষণ মিষ্টি’।
রাবেয়া খাতুন শুধু একজন লেখিকাই নন। তিনি চার সন্তানের জননীও।
আজকে এই পরিণত বয়সে যদি তার ছেলে-মেয়েরা একসাথে প্রশ্ন করে যে, তিনি কী করে বুঝলেন, পরকীয়া প্রেম ভীষণ মিষ্টি?
অথবা তিনি পরকীয়ায় কেমন আসক্ত ছিলেন? তার জবাবে যে ‘ঘরেও বোম ফাটবে’ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এদিকে রাবেয়া খাতুনেরও সৈয়দ হকের মতই খ্যাতির কাঙ্গালিপনা।
বাংলা একাডেমির সংবর্ধনা সভায়- ‘বাংলা একাডেমীর আজকের এই আয়োজন আমার বিগত জীবনের দুঃখ এবং কান্নার সান্ত্বনা।’ রাবেয়া খাতুনের এ স্বগোতক্তি কিন্তু তার বিগত জীবনের অখ্যাতি এবং অর্জনহীনতারই সরল স্বীকারোক্তি।
কুশীলব প্রকাশনী বইয়ের ফ্লাপে (ফ্লাপ বলতে সাধারণ অর্থে বইয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় জ্যাকেটে বই সম্পর্কে যা কিছু আকর্ষণীয় বক্তব্য দেয়া হয়) কৌশলী কায়দায় যা কিছু গুরুগম্ভীর ভাষায় সাজায় সে ফরমায়েশী লেখাই কেবলই তাদের বাহারী বিজ্ঞাপন। আসলে ফ্লাপের সেসব টেকনিক্যাল ভাষার সাথে তাদের লেখনীর মিল নেই। তাই পাঠক সমাজেও মূলতঃ তাদের নিয়ে আলোড়ন নেই।
এবং সে কারণেই এই শেষ বয়সেও এখন তারা নতুন নতুন বিজ্ঞাপনী প্রচারণার দিকেই ঝুঁকেছেন।
বলতে গেলে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তি বিশেষ মহল, এমনকি ভিন দেশীয় সংযোগ- এসবই এখনো বড়ও জনপ্রিয় লেখক হবার মুখ্য মাধ্যম।
এসব মাধ্যম যে হক-খাতুনরা অবলম্বন করেনি তা নয়। বরং করেছে বলেই এ যাবৎ তাদের এতটুকু প্রচারণা। কিন্তু তারপরেও তারা জনমনে আসন গড়তে পারেননি।
সে কারণেই সবশেষে ধমকের সুর এবং বাড়তি বিজ্ঞাপনের আয়োজন।
হক-খাতুন গংদের এসব বিজ্ঞাপনী মনোভাব যে ইসলামের দৃষ্টিতে ঠিক নয় সে কথা বললে তারা নাক সিটকাবেন। কিন্তু তারা যদি কথিত সাহিত্যের ইতিহাসও চর্চা করতেন তাহলেও কিন' আজকের ধারায় বিজ্ঞাপন বিরোধী মনোভাবের নজির পেতেন।
১৮৭৪ সালের এপ্রিল মাসে ‘স্বর্ণলতা’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। পাঠকের ভাষায় অসাধারণ জনপ্রিয় উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্রের কথিত খ্যাতি তখন মধ্যগগনে। সে খ্যাতির সঙ্গে পাল্লা দিলো ‘স্বর্ণলতা’। কিন' আশ্চর্য ব্যাপার, উপন্যাসের আখ্যাপত্রে ছাপা হয়েছে প্রকাশকের নাম- যোগেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ছাপা হয়েছে মুদ্রাকরের নাম- শেখ আতাহাব আলী, কিন্তু বইয়ের লেখকের নাম কোথাও নেই। ঔপন্যাসিকের জীবদ্দশায় বইটির সাতটি সংস্করণ ছাপা হয়। কিন্তু লেখক প্রথম তিনটি সংস্করণেই অজ্ঞাত থেকে গেলেন। পরে লেখকের অন্তরঙ্গ বন্ধু ঔপন্যাসিক ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে একান্ত অনুরোধ করলেন চতুর্থ সংস্করণে নাম প্রকাশ করার জন্য। কারণ, এত জনপ্রিয় একটি উপন্যাসের লেখকের নাম যদি দীর্ঘকাল অজ্ঞাত থাকে তা হলে অন্য কেউ এটার উপর দাবি বসাতে পারে। ইন্দ্রনাথ বাবু ‘স্বর্ণলতা’র রচয়িতাকে চিঠি লিখেছিলেন: “ ... প্রিয়তমেসু, নামের ভার নেই, বিজ্ঞাপনের আড়ম্বর নেই, তবু তোমার স্বর্ণলতা চতুর্থবার মুদ্রিত হচ্ছে। বাংলা ভাষায় এখনকার অবস্থায় এটা সামান্য শ্লাঘার কথা নয়। তার উপর ইংরেজি ধরনের প্রণয়লীলা, চোর-ডাকাতের অদভুত খেলা, আকস্মিক বিচ্ছেদ, অভাবনীয় মিলন- এ সকল প্রসঙ্গের ছায়াপাত বর্জিত হয়েও যে গ্রন' এত আদরের সামগ্রী তার অসাধারণ কোন গুণ আছে, এটা কে না স্বীকার করবে? বাস্তবিক স্বর্ণলতা স্বর্ণলতাই বটে।
মনে করিও না যে, তোমার কাছে তোমার গ্রনে'র গুণগান করার জন্যই এ পত্র লিখেতেছি। যে জন্য এ পত্র লিখিতেছি, বলি- স্বর্ণলতার যশে তুমি যশস্বী হয়েছে, বাংলা সহিত্যের পরিচয় দেয়ার জন্য এখন যে সকল বক্তৃতা ও প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে এ যশের ঘোষণা দেখতে পাই, অথচ তুমি কে তা অনেকেই জানে না। না জানাটা বড় অন্যায় বলে আমার বোধ হচ্ছে। প্রথমত: এতে পাপিষ্ঠের প্রলোভন; এই সেদিন বগুড়াতে এক ব্যক্তি স্বর্ণলতার যশোলাভে মুগ্ধ হয়ে আপনার গ্রন'কার পরিচয় দিয়া ধৃষ্টতা প্রকাশ করেছিলো। এটা আমার অসহ্য। দ্বিতীয়ত: আমার আত্মীয় লোকের মধ্যেও কোনও কোনও ব্যক্তি আমাকে স্বর্ণলতা লেখক মনে করে থাকেন। এ পরিচয়ে আমি গর্বিত হতে পারি বটে; কিন্তু যাতে আমার অধিকার নেই, তোমার সে গৌরব চুরি করে আমি বড় হবে কেন? যাদের এ প্রকার ভ্রম আছে, তাদের ভ্রম দূর করা উচিত। তাই বলছি যে, তুমি তোমার সম্পত্তি তোমার করে নাও।
আমি জানি তুমি আমার কথা রাখবে। জানি বলে অনুরোধ করছি যে, সাক্ষাৎ সম্বন্ধে গ্রন্থে নাম যোজনা করতে তোমার মনে যদি কোনও দ্বিধা হয়, বিজ্ঞাপন স্বরূপে আমার এই পত্রখানি গ্রন্থারম্ভে মুদ্রিত করে আমার বাসনা পূর্ণ করবে। ইতি- প্রণয়গর্বিত শ্রী ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বর্ধমান, জ্যৈষ্ঠ, ১২৯০ সাল।
অবশেষে প্রচারিত হলো ঔপন্যাসিকের নাম। তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। গ্রন্থের চতুর্থ সংস্করণে তারকনাথ এই পত্র মুদ্রিত করে তার বন্ধুর অনুরোধ রাখেন। ঊনিশ শতকের অন্যতম প্রধান কবি নবীনচন্দ্র সেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অবকাশরঞ্জিনী’ ১৮৭১ সালে কবির নাম প্রকাশ না করেই ছাপা হয়েছিলো। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বঙ্কিমও এটাকে সমীহ করেছিলেন। লেখকের নামবিহীন আর একটি গ্রন্থ ‘মানসবিকাশ’ আজকের সাহিত্যিকদের গুরু বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে।
গত শতকের উল্লেখযোগ্য কবি বলদেব পালিতের দুটি বই ‘কাব্যমালা’ ও ‘ললিত কবিতাবলী’তে তার কোন নাম ছিলো না। ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত ‘হুতোম প্যাচার নকশা’য় লেখকের নাম নেই। ১৮৭২ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা প্রথম গ্রন' ‘কিঞ্চিৎ জলযোগ’ নাটক ও ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় গ্রন' ‘পুরুষ বিক্রম’ নাটকে প্রণেতার নাম গোপন ছিলো। অমৃতলাল বসুর প্রথম গ্রন্থ ‘হীরক চূর্ণ’ নাটকের (১৮৭৫ সাল) আখ্যাপত্রে গ্রন্থকারের নামের বদলে ছিলো * , স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। নাম ছিল না লেখকের। মহিলা কবি গিরিন্দ্র মোহনী দাসীর লেখা ‘কবিতাহার’ (১৮৭৩ সাল) ও ‘ভারত কুসুম’ (১৮৮২ সাল) কাব্যগ্রনে' কিংবা বিখ্যাত মহিলা কবি কামিনী রায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আলো ও ছায়ায়’ কবির নাম প্রকাশিত ছিলো না।
-০-
হক-খাতুনের সংবর্ধনা সভায় ইমদাদুল হক মিলনও ছিলেন। তিনি অবশ্য আরেকটি দিক উন্মোচন করেছেন।
‘কালের খেয়ায়’ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘কাঁচা যৌনতার অবাধ ব্যবহার করেই তার বইয়ের কাটতি বেড়েছে।’ (নাঊযুবিল্লাহ)
দেখা যাচ্ছে, শুধু বিজ্ঞাপনই নয় পাশাপাশি যৌনতাও এ সময়ে বইয়ের কাটতি বাড়ানোর বড় অনুষঙ্গ। যদি তাই হয়- তাহলে এসব সংবর্ধনা কী নেহায়েতই অন্তঃশারশূন্য?
হক আর খাতুন কী কাষ্ঠপুতুল মাত্র?
(লেখাটি ২-০১-১০ এ দৈনিক আল ইহসান শরীফ থেকে নেয়া
http://www.al-ihsan.net)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০১০ দুপুর ১২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



