somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

।। করোনাকালের দিনলিপি ।।

০৫ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবীর সব বাবাদের ন্যায় আমাদের বাবাও জীবন যুদ্ধ শেষে সন্তানদের মানুষ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন অনেক আগেই । গেল কিছুদিন আগে ‘বাবা দিবস’ বলেই শুধু নয়- বাবাকে রোজ রোজ মনে পড়ে আজও ! সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে, আমার জন্মস্থান গ্রামে শৈশবে বুঝজ্ঞান হওয়ার পরে বাবার কাঁধে চড়ে নদীতে যাওয়া হতো গোছল করতে । বাবার কাঁধ ব্যথা হয়ে গেলে আমাকে নামিয়ে দিতে চাইলেও আমি নামতে চাইতামনা । জোড় করে নামালেও কিছুটা হাটার পরে আবারও কাঁধে উঠতাম । তখনকার উত্তরবঙ্গের ( একাত্তরে যুদ্ধ অব্যবহিত আগে-পরে ) আমাদের এলাকার প্রায় সব পুরুষ মানুষ নদীতে গোছল করতো । কেননা, তখন গ্রামে কোন টিউবওয়েল ছিলনা । বেশীরভাগ মাটি কিংবা পাকা কুঁয়োতেও বছরের ফাল্গুন বা চৈত্র মাসে পানি পাওয়া যেতোনা । তবে, নদীর পানি তখন স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ ছিল ।
কেন যেন আমার মনেই ছিলনা বিগত ২৫ জুন ২০২০ ছিল আমার একমাত্র ছেলের জন্মদিন । একুশ বছর আগে এই দিনে তার এই অসার পৃথিবীতে আগমণ । নিউবর্ণ বেবী হিসেবে তার মায়ের অনুপস্থিতিতে ঠেকার খাবার হিসেবে হাফক্রিম ল্যাকটোজেন বাসায় রেখেছিলাম তার ক্ষুধার সময় যেন এটি কাজে লাগে । বলা বাহুল্য, নিউবর্ণ বেবীর মা একজন সরকারী চাকুরীজীবি হওয়ার কারণে বিকল্প হিসেবে এই ব্যবস্থা রাখা । কিন্তু বিপদ দেখা দিল বাচ্চার মুখে ফিডারে একফোটা সেই হাফক্রিম ল্যাকটোজেন দুধ কোনমতেই খাওয়ান‘তো দুরের কথা মুখে দেওয়াই সম্ভব হয়ে উঠেনি । বাধ্য হয়ে, তার মাকে ম্যাটারনিটি লিভ শেষ হওয়ার পরে বাধ্য হয়ে অফিসেই তাকে নিয়ে যেতে হতো । সময়ের ফেরে ও যখন বড়ো হলো বা নিজেই হাটা শুরু করলো তখন থেকে হাটতে গিয়ে আমার বাম হাতের তর্জনী আঙ্গুল ছাড়তেই চাইতোনা । জোর করে ছাড়ালেও কিছুক্ষন পর আবার এসে আঙ্গুল ধরে হাটা শুরু করতো । ছেলের এই অভ্যাসটি হাইস্কুলগামী হওয়ার আগ পর্যন্ত বহাল ছিল । বিষয়টি আমার বাপের কাঁধে চড়া আমার শৈশবের সেই ক্ষণটিকে রিপ্লে করতো । সবচেয়ে জ্বালাতন করতো রাত্রে খাবার পর যখন ঘুমোতে যেতাম । তার ঘুম না আসা পর্যন্ত রাজ্যের সব গল্প শুনিয়ে যেতে হতো । একেকদিন একেক গল্প । কোন গল্প দ্বিতীয়বার বললে সে ধরে ফেলে বলতো সেটি বাদ দিয়ে অন্য গল্প শুনানোর জন্য ।
আমার মাঝে একইসাথে ‘বাবা’ ও ‘সন্তানের’ বৈপরীত্য ভীষণভাবে এক টেলিপ্যাথিক সংযোগ ঘটিয়ে মায়াময় পৃথিবীতে এক ধুম্রজালের সৃষ্টি করে ! তাই'তো বাবা হয়েও আজকাল শৈশব বড় কাছে টানে । মনে হয় যদি কখনো সেলুলয়েডে রিপ্লে হয়ে আবারও ফিরে যাওয়া যেতো সেই 'বাবা'সঙ্গ ভরা মধুর দিনগুলোতে...!
আজ ছেলে অনেক বড় হয়ে গেছে । এখন গল্পতো দুরে থাক, তার স্বার্থের বাইরে কোন কথা তাকে এখন বলতে পারিনা । আমার বাবাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা এখানে পোস্ট দিলাম ।

।। বর্ষায়ী বিষাদ ।।

সেইসময় বর্ষায় টইটম্বুর
আমার ছোট্ট `হলধর' গ্রাম -
পেছনে বয়ে চলা
খরস্রোতা 'চাওয়াই' ।
আমাদের শৈশবে
নদীর দুকুল ছাপিয়ে '
বর্ষা আসতো ফি বছরে,
এখন অনায়াসে যেমন
আসে শরীরে 'অসুখ-বিসুখ' ।
আমার 'প্রাইমারি টিচার বাবার'স্কুল ছিল
নদীর ঠিক ওপারে ।
একবারের কথা মনে আছে-
বর্ষার স্রোতসিনী নদী 'চাওয়াই'
সাঁতরে পার হচ্ছেন বাবা !
এপারে আমরা দু'ভাই-
বাবার ডুব সাঁতারে
নদী পার হওয়া দেখছি .....।
খর স্রোতের বিপরীতে
'বাবার' সেকি যুদ্ধ... !
- বাবা পেরে উঠছেননা !
ফলাফল যা.....
বাবার স্রোতের টানে ভেসে চলা -
যেমনটা আজকাল
বাজার মূল্যের উদ্ধর্গতিতে
আমাদের ভেসে চলা হরদম !
তারপর-
ভেসে ভেসে অনেকদুর ....
বাবা ভেসেই চলছেন যেন
সময়ের স্রোতে অনন্তকাল -
ভেসেই চলছেন- ভেসেই চলছেন .... !
এপারে তখন 'কান্না'র বিকল্প
কিছুই ছিলনা আমাদের !
'বাবা' অনেক দুরে স্রোতের টানে
নদী পার হয়েছেন ঠিকই ।
কিন্তু, কিছু বুঝে উঠবার আগেই
মেজভাই তাগিদ দেয়-
'চল্ - বাড়ি ফিরে চল্' ।
তখন 'সাইন ল্যাংগুয়েজ'এর
কিছুই বুঝতামনা আমি,
যা দুর থেকে 'বাবা' জানান দিয়েছিলেন ।
হু-হু করে দীর্ঘক্ষণ কেঁদেছিলাম-
'বাবার' নদীর স্রোতে ভেসে
যাওয়া দেখে.... !
দীর্ঘদিন তাঁর নদীতে
ভেসে যাওয়ার স্মৃতি ধারণ করে
কতোবার চোখ ছল্ ছল্
করে উঠতো নিরবে আমার.... !
তখন অনেক কিছুই বুঝতাম না... !
এই যেমন-
'বাবার ফেস মুভমেন্ট'
কিংবা 'বডি ল্যাংগুয়েজ' ।
-'মেজভাই' যা অনায়াসে
বুঝতো ঠিকই !
আজ দীর্ঘ দিন পর -
আমিও 'বাবার' মতো
সময়ের স্রোতে ভেসে চলছি ।
কখনও ডুব সাঁতারে
কিংবা-
স্রোতের বিপরীতে পার হওয়ার
জীবন যুদ্ধ চলছে হরদম... !
শুধু ভেসেই চলছি- ভেসেই চলছি অনন্তকাল... !!
'বাবা' তাও নদী পার হয়েছেন ঠিকই,
কিন্তু আমি পারিনি !
কেননা , আমিতো কখনো বাবার
'ফেস মুভমেন্ট' - 'বডি লেংগুয়েজ'
অথবা দুরে থেকে জানানো
'সাইন ল্যাংগুয়েজ'
বুঝতে পারতামনা - কিংবা সেভাবে বুঝার
চেষ্টাও করিনি কোন দিন !
-যেভাবে বুঝেছিলেন
'মেজভাই' অনায়াসেই ।।
=============

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১১:৫৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইসলামী ব্যাংক - সবার ভাবী !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×