গল্প - বিশ্বাসের পাড় ভাঙ্গা
আমাদের ছোটবেলায় ঠাকুর মা’র একটা বড় কাজ ছিল আমাদেরকে গল্প বলা । কি চমৎকার করেই না তিনি আমাদের শোনাতেন নানান গলপ । অবাক ব্যাপার, এই গল্প বলা আবার ফিরে এসেছে কোন কোন পরিবারে । এঁরা তারাই যারা শিক্ষিত হয়েও এযুগে আল্ট্রা মডার্ন হয়ে যায় নি । অর্থাৎ এদের পরিবারের ঠাকুর মা’রা শিক্ষিত, কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে নির্বাসিত নয় । এদের পরিবারের শিশুসন্তানেরা বিদেশ প্রভাবিত শিক্ষার ভারে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নি ।
তবে এই ঠাকুর মা’দের কষ্টও কিন্তু কম নয় । আমাদের যুগে ঠাকুর মা’রা যা বলতেন আমরা তাই বিশ্বাস করে চুপ করে শুনে যেতাম । কিন্তু এ যুগের ছেলে মেয়েরা খুশী না হলেই প্রশ্ন করে । আর ঠাকুর মা’দেরকেও তার সঠিক উত্তর দিতে হয় । শিক্ষিত হবার কারনে অনেক সময়ই তাদের তেমন কষ্ট হয় না । তবে অনেক সময় তাদের উত্তর হয়, “এটা আমি নিজে জেনে পরে তোমাদের বলব” । এরা সৎ বলেই এমনটা করেন । আগের যুগের তথাকথিত পন্ডিতদের মতন সব জান্তার ভূমিকা পালন করেন না ।
সে যুগের আর এযুগের ঠাকুর মা’দের গল্প বলার পার্থক্যটা একবার দেখুন । এযুগের ঠাকুরমা বলছেন - মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছে ছাগল । ঘাস খাচ্ছে । একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ঘুরে ফিরে তারা ঘাস খায় । এর বাইরে যায় না । কিন্তু কিছু বাচ্চা, তাদের আবার এতসব বোঝার কোন দরকার নেই । তারা সুযোগ পেলেই দৌড়ে চলে যায় দূরে, বহুদুরে ।
- এরা এডভেনচারের পাগল, তাই না ঠাকুর মা ?
- হতে পারে । কিন্তু এরা বোকা ।
-কেন ? প্রচলিত নিয়ম ভাঙ্গা কি বোকামী ?
- হ্যা, অবশ্যই । যাদের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই তাদের পক্ষে এমন করাটা বোকামী । তারপর শোন, একটা ছাগলের বাচ্চা তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে অনেক দূর চলে গেল, সেই সেখানে যেখানে সূর্য্য ডোবে সাঁঝের বেলায় । বাচ্চাটা তখন একটু একটু ঘাস খেতে শিখেছে । হঠাত বাচ্চা ছাগলটা শুনলো, কে যেন ডাকছে । ডাকটা তার মা মাসীদের মত । সেই ডাক লক্ষ করে বাচ্চাটা গিয়ে উপস্থিত হলো একটা খাদের কিনারে । একটু ঝুঁকে সে দেখলো, নীচে খাদের মধ্যে একটা ধেড়ে ছাগল । বাচ্চাটা বললো, তুমি ওখানে কি করছো ? উত্তরে ছাগলটা বললো, এখানে অনেক ঘাস, খেতে চাও তো এসো ।
একটা মানুষের বাচ্চা বল্লো- আমি জানি ছাগলটা কিছু না দেখেই গর্তে লাফিয়ে পড়বে । ছাগলের বুদ্ধি তো ?
ঠাকুর মা বললেন –ঠিক তাই । বাচ্চা ছাগলটা নীচে পড়ার সাথে সাথে বড় ধেড়েটা সেটার মাথার উপর পা দিয়ে সোজা উপরে গেল । তারপর বলল- ওখানে ঘাস তেমন নেই । একজনের মিষ্টি কথায় ভুলে আগে ভালো করে না দেখে আমি লাফিয়ে পড়েছিলাম, আর এত দিন এখানে বন্দী ছিলাম। আজ তোমার বোকামীতে এতদিনে মুক্তি পেলাম । বাচ্চা ছাগলটা বুঝলো – সে ফেঁসে গেছে । তাকেও এখন অন্যদের ভুলাতে মিষ্টি মিষ্টি মিথ্যা কথা বলতে হবে । তারপর আর একটা বোকা ছাগল পেলেই তার মাথায় পা রেখে পালাতে হবে ।
একটি শিশু মেয়ে কন্ঠ বললো- ঠাকুর মা, আমি বলছি, পাঁচ বছর পর ঐ গর্তটা অনেক ছাগলে ভরে গিয়েছিল । তোমাকে এর সাথে মিল রেখা গল্পটা বলতে হবে । কি পারবে তো ?
- বেশ, তাই হবে । বাচ্চা ছাগলটা গর্তে পড়ার পর দেখলো, গর্তটা বশ বড়, আর এর চার দিকে বেশ উচু পাড় । নীচে পাথরের ফাকে অল্প অল্প ঘাস আছে । ঘাস থাকলে ছাগলের আর কি লাগে ? কয়েকদিন পর ছাগলটার একটা ছাগলীও জুটে গেল । আসলে এই ছাগলটার বয়সের আর একটা ছাগলী রাতের বেলা হঠাৎ করে গর্তে পড়ে গিয়েছিল । আর সে ছাগলটা জানতো, সে পাশে গেলেই এই ছাগলটা তার মাথায় চড়ে পগাড় পার হবে । তাই এ দুটোর কোনটা পাড়ের কাছে ঘেঁষতো না । দিনে দিনে দুটোর ভাব হয়ে গেল, আর নতুন নতুন ছাগলের বাচ্চার জন্ম হতে লাগলো ।
একটি শিশু কন্ঠ বলো - গর্তের ঘাস শেষ হয়ে গেল না ?
মেয়ে শিশু কন্ঠ বলল – না তা হবে কেন ? এতগুলি ছাগলের নাদি থেকে যে সার হবে তা দিয়ে অনেক ঘাস হবে । তাই না ঠাকুর মা ?
- হ্যা, ঠিক তাই । খাবার আর সঙ্গীর অভাব না থাকলেও জায়গাটা ছিল আবদ্ধ । কিন্তু ক্রমে ক্রমে তারা এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেল । তবে মাঝে মাঝে ছাগলের সংখ্যা করে যেতো । কেন ?
মেয়ে শিশু কন্ঠ বলল – আমি জানি । সব ছাগলই তো আর বোকা নয় । যারা সুযোগ পেয়েছে তারা অন্যের মাথায় চড়ে পাড় হয়েছে । আচ্ছা ঠাকুর মা, এই গল্প থেকে আমরা কি শিখলাম ?
ছোট শিশু কন্ঠ বললো- আমি শিখেছি, কেউ কিছু করার জন্য বললে ভালো করে না জেনে না দেখে হঠাত কোন কাজ করা ঠিক নয় । মানে হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে তারাই যারা –
ঠাকুর মা বললেন – বুঝে গেছি । আর খোলসা করে বলতে হবে না । ছাগলেরও সন্মান আছে । আচ্ছা, তুমি কি শিখলে ?
- আমার দুঃখ হচ্ছে ছাগলের বাচ্চাগুলির জন্য । এরা তো সবাই বোকা নয় । এরা তো আর না দেখে শুনে গর্তে ঝাপ দেয় নি । এদের পিতা মাতা বোকামী করেছে, আর এরা এখন তার আক্কেল সেলামী দিচ্ছে ।
ছোট শিশু কন্ঠ বললো – বেশ তো, ওরা যখন বুদ্ধিমান তখন ওরা তো জেনে গেছে যে ওদের এই আবদ্ধ গর্তের বাইরে আছে মুক্ত পৃথিবী । ওরা সেখানে চলে যাচ্ছে না কেন ?
- তুমি বোধহয় ভূলে গেছ আমি বলেছি, অনেকে সুযোগ বুঝে চলে গেছে । আর ঠাকুরমাও তাই বলেছেন ।
-না আমি ভুলি নি । অনেকে গেছে, কিন্তু সবাই তো যায় নি । কেন যায় নি ঠাকুর মা ?
মেয়ে শিশু কন্ঠ বলল – বা রে যাবে কি করে ? চার দিকে উঁচু পাঁড় রয়েছে না ? বড়রা ছোটদের মাথায় চড়ে পাড় হবে এটা তুমি সমর্থন কর ? মনে রেখ, আমি বড়, তুমি কিন্তু ছোট ।
- আমি তোমার কথা সমর্থন করি না । এতগুলি ছাগল, সবাই চেষ্টা করলে তো পাড়ের একটা অংশ ভেঙ্গেও ফলতে পারে ।
ঠাকুর মা বললেন – ঠিক বলেছে । এক বাপ মায়ের ভুলের মাশুল তাদের সব সন্তান দেবে কেন ? তারা ইচ্ছে করলে মাটির পাড় ভেঙ্গে ফেলতে পারে । এমন কি এটা বিশ্বাসের পাড় হলে তাও ভাঙ্গা সম্ভব । অনেকে তো তা করেছে । নিজের শিশুর উন্নত ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের মৃত্যুর কারনও হয়েছে ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


