somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প - বিশ্বাসের পাড় ভাঙ্গা

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গল্প - বিশ্বাসের পাড় ভাঙ্গা

আমাদের ছোটবেলায় ঠাকুর মা’র একটা বড় কাজ ছিল আমাদেরকে গল্প বলা । কি চমৎকার করেই না তিনি আমাদের শোনাতেন নানান গলপ । অবাক ব্যাপার, এই গল্প বলা আবার ফিরে এসেছে কোন কোন পরিবারে । এঁরা তারাই যারা শিক্ষিত হয়েও এযুগে আল্ট্রা মডার্ন হয়ে যায় নি । অর্থাৎ এদের পরিবারের ঠাকুর মা’রা শিক্ষিত, কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে নির্বাসিত নয় । এদের পরিবারের শিশুসন্তানেরা বিদেশ প্রভাবিত শিক্ষার ভারে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নি ।
তবে এই ঠাকুর মা’দের কষ্টও কিন্তু কম নয় । আমাদের যুগে ঠাকুর মা’রা যা বলতেন আমরা তাই বিশ্বাস করে চুপ করে শুনে যেতাম । কিন্তু এ যুগের ছেলে মেয়েরা খুশী না হলেই প্রশ্ন করে । আর ঠাকুর মা’দেরকেও তার সঠিক উত্তর দিতে হয় । শিক্ষিত হবার কারনে অনেক সময়ই তাদের তেমন কষ্ট হয় না । তবে অনেক সময় তাদের উত্তর হয়, “এটা আমি নিজে জেনে পরে তোমাদের বলব” । এরা সৎ বলেই এমনটা করেন । আগের যুগের তথাকথিত পন্ডিতদের মতন সব জান্তার ভূমিকা পালন করেন না ।
সে যুগের আর এযুগের ঠাকুর মা’দের গল্প বলার পার্থক্যটা একবার দেখুন । এযুগের ঠাকুরমা বলছেন - মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছে ছাগল । ঘাস খাচ্ছে । একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ঘুরে ফিরে তারা ঘাস খায় । এর বাইরে যায় না । কিন্তু কিছু বাচ্চা, তাদের আবার এতসব বোঝার কোন দরকার নেই । তারা সুযোগ পেলেই দৌড়ে চলে যায় দূরে, বহুদুরে ।
- এরা এডভেনচারের পাগল, তাই না ঠাকুর মা ?
- হতে পারে । কিন্তু এরা বোকা ।
-কেন ? প্রচলিত নিয়ম ভাঙ্গা কি বোকামী ?
- হ্যা, অবশ্যই । যাদের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই তাদের পক্ষে এমন করাটা বোকামী । তারপর শোন, একটা ছাগলের বাচ্চা তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে অনেক দূর চলে গেল, সেই সেখানে যেখানে সূর্য্য ডোবে সাঁঝের বেলায় । বাচ্চাটা তখন একটু একটু ঘাস খেতে শিখেছে । হঠাত বাচ্চা ছাগলটা শুনলো, কে যেন ডাকছে । ডাকটা তার মা মাসীদের মত । সেই ডাক লক্ষ করে বাচ্চাটা গিয়ে উপস্থিত হলো একটা খাদের কিনারে । একটু ঝুঁকে সে দেখলো, নীচে খাদের মধ্যে একটা ধেড়ে ছাগল । বাচ্চাটা বললো, তুমি ওখানে কি করছো ? উত্তরে ছাগলটা বললো, এখানে অনেক ঘাস, খেতে চাও তো এসো ।
একটা মানুষের বাচ্চা বল্লো- আমি জানি ছাগলটা কিছু না দেখেই গর্তে লাফিয়ে পড়বে । ছাগলের বুদ্ধি তো ?
ঠাকুর মা বললেন –ঠিক তাই । বাচ্চা ছাগলটা নীচে পড়ার সাথে সাথে বড় ধেড়েটা সেটার মাথার উপর পা দিয়ে সোজা উপরে গেল । তারপর বলল- ওখানে ঘাস তেমন নেই । একজনের মিষ্টি কথায় ভুলে আগে ভালো করে না দেখে আমি লাফিয়ে পড়েছিলাম, আর এত দিন এখানে বন্দী ছিলাম। আজ তোমার বোকামীতে এতদিনে মুক্তি পেলাম । বাচ্চা ছাগলটা বুঝলো – সে ফেঁসে গেছে । তাকেও এখন অন্যদের ভুলাতে মিষ্টি মিষ্টি মিথ্যা কথা বলতে হবে । তারপর আর একটা বোকা ছাগল পেলেই তার মাথায় পা রেখে পালাতে হবে ।
একটি শিশু মেয়ে কন্ঠ বললো- ঠাকুর মা, আমি বলছি, পাঁচ বছর পর ঐ গর্তটা অনেক ছাগলে ভরে গিয়েছিল । তোমাকে এর সাথে মিল রেখা গল্পটা বলতে হবে । কি পারবে তো ?
- বেশ, তাই হবে । বাচ্চা ছাগলটা গর্তে পড়ার পর দেখলো, গর্তটা বশ বড়, আর এর চার দিকে বেশ উচু পাড় । নীচে পাথরের ফাকে অল্প অল্প ঘাস আছে । ঘাস থাকলে ছাগলের আর কি লাগে ? কয়েকদিন পর ছাগলটার একটা ছাগলীও জুটে গেল । আসলে এই ছাগলটার বয়সের আর একটা ছাগলী রাতের বেলা হঠাৎ করে গর্তে পড়ে গিয়েছিল । আর সে ছাগলটা জানতো, সে পাশে গেলেই এই ছাগলটা তার মাথায় চড়ে পগাড় পার হবে । তাই এ দুটোর কোনটা পাড়ের কাছে ঘেঁষতো না । দিনে দিনে দুটোর ভাব হয়ে গেল, আর নতুন নতুন ছাগলের বাচ্চার জন্ম হতে লাগলো ।
একটি শিশু কন্ঠ বলো - গর্তের ঘাস শেষ হয়ে গেল না ?
মেয়ে শিশু কন্ঠ বলল – না তা হবে কেন ? এতগুলি ছাগলের নাদি থেকে যে সার হবে তা দিয়ে অনেক ঘাস হবে । তাই না ঠাকুর মা ?
- হ্যা, ঠিক তাই । খাবার আর সঙ্গীর অভাব না থাকলেও জায়গাটা ছিল আবদ্ধ । কিন্তু ক্রমে ক্রমে তারা এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেল । তবে মাঝে মাঝে ছাগলের সংখ্যা করে যেতো । কেন ?
মেয়ে শিশু কন্ঠ বলল – আমি জানি । সব ছাগলই তো আর বোকা নয় । যারা সুযোগ পেয়েছে তারা অন্যের মাথায় চড়ে পাড় হয়েছে । আচ্ছা ঠাকুর মা, এই গল্প থেকে আমরা কি শিখলাম ?
ছোট শিশু কন্ঠ বললো- আমি শিখেছি, কেউ কিছু করার জন্য বললে ভালো করে না জেনে না দেখে হঠাত কোন কাজ করা ঠিক নয় । মানে হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে তারাই যারা –
ঠাকুর মা বললেন – বুঝে গেছি । আর খোলসা করে বলতে হবে না । ছাগলেরও সন্মান আছে । আচ্ছা, তুমি কি শিখলে ?
- আমার দুঃখ হচ্ছে ছাগলের বাচ্চাগুলির জন্য । এরা তো সবাই বোকা নয় । এরা তো আর না দেখে শুনে গর্তে ঝাপ দেয় নি । এদের পিতা মাতা বোকামী করেছে, আর এরা এখন তার আক্কেল সেলামী দিচ্ছে ।
ছোট শিশু কন্ঠ বললো – বেশ তো, ওরা যখন বুদ্ধিমান তখন ওরা তো জেনে গেছে যে ওদের এই আবদ্ধ গর্তের বাইরে আছে মুক্ত পৃথিবী । ওরা সেখানে চলে যাচ্ছে না কেন ?
- তুমি বোধহয় ভূলে গেছ আমি বলেছি, অনেকে সুযোগ বুঝে চলে গেছে । আর ঠাকুরমাও তাই বলেছেন ।
-না আমি ভুলি নি । অনেকে গেছে, কিন্তু সবাই তো যায় নি । কেন যায় নি ঠাকুর মা ?
মেয়ে শিশু কন্ঠ বলল – বা রে যাবে কি করে ? চার দিকে উঁচু পাঁড় রয়েছে না ? বড়রা ছোটদের মাথায় চড়ে পাড় হবে এটা তুমি সমর্থন কর ? মনে রেখ, আমি বড়, তুমি কিন্তু ছোট ।
- আমি তোমার কথা সমর্থন করি না । এতগুলি ছাগল, সবাই চেষ্টা করলে তো পাড়ের একটা অংশ ভেঙ্গেও ফলতে পারে ।
ঠাকুর মা বললেন – ঠিক বলেছে । এক বাপ মায়ের ভুলের মাশুল তাদের সব সন্তান দেবে কেন ? তারা ইচ্ছে করলে মাটির পাড় ভেঙ্গে ফেলতে পারে । এমন কি এটা বিশ্বাসের পাড় হলে তাও ভাঙ্গা সম্ভব । অনেকে তো তা করেছে । নিজের শিশুর উন্নত ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের মৃত্যুর কারনও হয়েছে ।







সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:১৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সত্যকে স্বীকার করার সাহস কি আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

সত্যকে স্বীকার করার সাহস কি আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে?

আমাদের দেশে এখন অদ্ভুত এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। আপনি কোনো দলের সমালোচনা করলে- আপনি সেই দলের শত্রু।
আপনি কোনো দলের একটি ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল- এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।
জুলাইয়ের পর- সেই পুলিশ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×