রাজপথে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সংঘাত এড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। রক্তপাত ছাড়াই এখন থেকে পুলিশ সদস্যরা সংঘাত মোকাবেলা করতে চায়। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ধরন কমিয়ে আগামীতে পুলিশ 'লেস লিথাল উইপন' (কম প্রাণঘাতী) অস্ত্র বেশি ব্যবহারের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি রাজপথে যে কোনো ধরনের আন্দোলন বা অন্য কোনো কর্মসূচিতে অনেক সতর্ক হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে পুলিশ। আন্দোলনের সময় তারা প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্র ব্যবহার করতে চায়, যাতে কেউ শারীরিকভাবে গুরুতর আহত বা নিহত না হন। এমনকি অস্ত্র ব্যবহারে মানবাধিকারের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশের হাতে এসে পেঁৗছেছে 'পিপার গান'। মরিচার গুঁড়ো শরীরে পড়লে যে ধরনের যন্ত্রণা হয়, ওই শেল ছুড়লে একই ধরনের 'ক্রিয়া' হবে। ইতিমধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) মানবদেহে পিপার শেল ছুড়ে পরীক্ষা চালায়।
রাজধানীতে পুলিশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে এ বিশেষ শেল সরবরাহ করা হয়েছে। কেনা হচ্ছে 'অ্যাকুস্টিক ক্রাউড কন্ট্রোল ডিভাইস' নামে একটি বিশেষ যন্ত্র। সম্প্রতি পুলিশের সব ইউনিটে অস্ত্র ব্যবহারের একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়। রক্তপাত ছাড়া রাজপথসহ সারা দেশে কীভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায়, তা ওই নীতিমালায় প্রতিফলিত হয়েছে। রাজপথে লোহার ব্যারিকেডে (রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোহার প্রতিবন্ধকতা দিয়ে সংঘাত এড়ানো হয়) আসছে পরিবর্তন। মৃদু বৈদ্যুতিক স্পর্শবিশিষ্ট লোহার ব্যারিকেড আনার চিন্তাভাবনাও চলছে।
আনা হচ্ছে 'মাল্টিপল গ্যাস গ্রেনেড লাঞ্চার। এ থেকে একসঙ্গে ৩০টি শেল বের হবে।
এমনকি শব্দের মাধ্যমে যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংঘাত মোকাবেলায় অ্যাকুস্টিক ক্রাউড কন্ট্রোল ডিভাইস নামে একটি বিশেষ যন্ত্র আনা হচ্ছে। ওই যন্ত্রের শব্দ বিশেষভাবে 'নিক্ষেপ' করা হবে। এর পর শব্দের তীব্রতায় সমাবেশস্থলে কেউ নিরুদ্বেগভাবে বসে থাকতে পারবে না। তবে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট স্থানে নিক্ষেপ করায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই শব্দের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাবেন।
পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার সমকালকে বলেন, পুলিশ বল প্রয়োগের নীতিতে নেই। জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে পুলিশকে একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। অস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালায় রক্তপাত ছাড়া কীভাবে সংঘাত এড়ানো যায়, সেই বিষয়ে খেয়াল রাখা হয়েছে। মানুষের অধিকার রক্ষায় পুলিশ আন্তরিক। প্রয়োজনে এ নীতিমালায় আরও সংযোজন-বিয়োজন হবে। আধুনিক ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশ কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে_ এ বিষয়টি মাথায় রেখে নীতিমালা করা হয়।
এদিকে গত ৯ জুলাই পুলিশের একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা হয়েছে। সেখানে পুলিশ বাহিনীর সব ইউনিটে অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়। ২০ বছর পর পুলিশের জন্য তৈরি করা ওই নীতিমালায় চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আগামীতে কীভাবে রক্তপাত ছাড়াই পুলিশ যে কোনো ধরনের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়; রাজধানীসহ সারা দেশের মেট্রোপলিটন শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব, উঁচু ভবন, এমনকি পুলিশের ভারী অস্ত্রের সংখ্যা কমানোর ব্যাপারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের পুলিশ সদস্যদের হাত থেকে লাঠি তুলে দেওয়ার ব্যাপারেও চিন্তাভাবনা চলছে। এমনকি পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াতকে আধুনিকায়ন করার চিন্তাভাবনাও চলছে। এ বাহিনীর হাতে 'কর্নার শটগান' নামে একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে। এ অস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, কেবল শত্রুকে না দেখেও যে কোনো অবস্থান থেকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যকে টার্গেট করা যায়। এ শটগানের সঙ্গে একটি মনিটরও থাকবে।
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই অস্ত্রটি ব্যবহার করেছিল। অস্ত্র ব্যাহারের নতুন নীতিমালা তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, ১৯৯২ সালে তৈরি করা নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বর্তমানে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন নীতিমালায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসংখ্যার ঘনত্বসহ বেশ কিছু বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া সংঘাতে জড়ানো ছাড়াই কীভাবে মানবাধিকার রক্ষা করা যায়, তা বিবেচনা করা হয়। পুলিশ আগামীতে লাঠি বা হাত বা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে চাচ্ছে। এমনকি বিতর্ক এড়াতে তিন পেশাজীবী শ্রেণীর যে কোনো কর্মসূচিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে। একান্ত বাধ্য না হলে সাংবাদিক, শিক্ষক ও আইনজীবীদের কর্মসূচিতে গিয়ে কোনো বিতর্কে জড়াতে চায় না পুলিশ।
পুলিশের নতুন অস্ত্রের নীতিমালায় দেখা যায়, বর্তমানে ৯ ও ৭ পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের পিস্তল ব্যবহার করছেন এসআই থেকে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। প্রস্তাবিত নীতিমালায় ৯, ৪ পয়েন্ট ৬ মিলিমিটার, ০ পয়েন্ট ৪৫, ০ পয়েন্ট ৪০ ইঞ্চির ক্যালিবারের পিস্তল ব্যবহারের কথা বলা হয়। প্রস্তাবিত নীতিমালায় নায়েক, হেড কনস্টেবল, এএসআই ও তদূর্ধ্ব পুলিশ কর্মকর্তারা ওই অস্ত্র ব্যবহার করবেন। এমনকি প্রস্তাবিত নীতিমালায় ইউনিট প্রধানের অনুমতিতে কনস্টেবলরা পিস্তল ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। নতুন পিস্তল ব্যবহারের যৌক্তিকতার ব্যাপারে নীতিমালায় বলা হয়, এ ধরনের অস্ত্র ৭ পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার পিস্তলের চেয়ে বেশি কার্যকরী। এতে 'গ্রাফাইট' ব্যবহার হওয়ায় ওজন কম। লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা বেশি। এ ছাড়া নতুন নীতিমালায় পুলিশে সাব মেশিনগান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদস্যদের ৪০ শতাংশ ও বিশেষ ইউনিট প্রধানের অনুমতি নিয়ে ১শ' শতাংশ সদস্য সাব মেশিনগান ব্যবহার করতে পারবেন। সাব মেশিনগান ব্যবহারে যৌক্তিকতায় বলা হয়, এটির ব্যারেল ছোট, কার্যকরী সীমা ১শ' থেকে ১২০ মিটার। বর্তমানে অন্যান্য উন্নত দেশে মহানগর এলাকায় সাব মেশিনগান ব্যবহৃত হয়। স্নাইপার রাইফেল, সিঙ্গেল গ্যাস লাঞ্চার, মাল্টিপল গ্যাস লাঞ্চার, গ্যাস গ্রেনেড, মাল্টিপল গ্যাস গ্রেনেড, ট্রেসার গান ব্যবহারের কথাও বলা হয়। কনস্টেবল থেকে তদূর্ধ্ব পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অস্ত্র ব্যবহার করবেন। এ ছাড়া পুলিশে আরও কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র যুক্ত করার ব্যাপারে নতুন অস্ত্র নীতিমালায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। তা হলো_ নেট গান, ট্রাংকুলাইজার গান, ফ্ল্যাশ ব্যাং, সাউন্ড গ্রেনেড, স্মোক গ্রেনেড প্রভৃতি। ইতিমধ্যে নেটগান পুলিশের হাতে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পুলিশ এখন পর্যন্ত যেসব বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার বেশির ভাগ 'রাজনৈতিক'। পুলিশের অনেক কর্মকর্তা পেশাদারিত্ব ভুলে রাজনৈতিক মতাদর্শের নিরিখে কাজ করেন। তাই অতিউৎসাহী হয়ে 'গলা টিপে ধরা' এমনকি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দৃষ্টিকটু আচরণ করে বসেন অহরহ। তাই অস্ত্র ব্যবহারে এমন একটি নীতি করা হয়েছে, যা মাঠে প্রয়োগ করলে পুলিশকে কোনো সংঘাতে শারীরিকভাবে জড়াতে না হয়। লক্ষ্যবস্তু থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে বিরোধ বা সংঘাত এড়ানোর কৌশল নিয়েছে পুলিশ।
সাহাদাত হোসেন পরশ
সমকাল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



