রেজিষ্ট্রেশন আইনের ২৮ ধারা ও কতিপয় কর্মকর্তার মনোপলি রমরমা ব্যবসা:
দলিল রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে যখন থেকে আইন সংশোধনের মাধ্যমে জুরিডিকশান নির্ধারন করা হয়েছে, তখন থেকেই শুরু হয়েছে রেজিষ্ট্রারীং কর্মকর্তাদের মনোপলি ব্যবসা। একটা উদাহরন দেই, ধরুন আপনি চট্টগ্রাম শহরের ডবলমুরিং থানা এলাকা থেকে একখন্ড জমি ক্রয় করলেন। এখানে আপনাকে বাধ্যতামূলকভাবে সদর সাব রেজিষ্ট্রারী অফিসেই তা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আপনি যদি একই অফিসের সংলগ্ন পাহাড়তলী বা চান্দগাঁও সাব রেজিস্ট্রারী অফিসে তা রেজিস্ট্রী করতে চান, তাহলে তা করা যাবে না। কাজেই কোন দলিল সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রারীং কর্মকর্তা তাদের সুবিধা মত যখন তখন আটকিয়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের অবাধ সুযোগ এখানে রয়েছে। যেহেতু আপনার আর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু একটি বিকল্পও যদি এক্ষেত্রে থাকতো, তাহলে তারা এমন মনোপলি ব্যবসা কি করতে পারতেন ? সকল জুরিডিকশানে অন্ততঃ দু’জন সাব রেজিষ্ট্রার থাকা প্রয়োজন। এখানে জনবলের প্রশ্ন নেই। বর্তমানে যারা আছেন, তাদের মধ্যেই এ দায়িত্ব ভাগ বাটোয়ারা করা যায়। যেমন, চট্টগ্রাম শহরের যে কোন দলিল সদর, পাহাড়তলী এবং চান্দগাঁও -এ তিনটি সাব রেজিস্ট্রারী অফিসের যে কোন একটিতে রেজিস্ট্রি করা যাবে মর্মে আইন থাকলে দূর্নীতি কমার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতো। ঠিক যেমন বেসরকারী ব্যাংকের সেবার মান প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় এখন সরকারী ব্যাংকগুলো ক্লাইন্ট হারানোর ভয়ে সেবার মান বৃদ্ধি করেছে। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই তারা এটা করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধবে কে ?
থানায় মামলা নেয়ার বাধ্যবাধকতা:
থানায় মামলা নেয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে ফৌজদারী কার্য্যবিধির ১৫৪ ধারা এবং পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল ১৯৪৩’ (পি আর বি) এর ২৪৪ নং রুলে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত থাকা সত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থানা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। আদালতে অনেক আইনজীবীকেও বলতে শুনা যায়, থানায় মামলা নেয়নি তাই বাধ্য হয়ে তিনি সি,আর কেইচ ফাইল করছেন। অথচ থানায় মামলা না নেয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বটে। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ২৯ নং ধারায় এর শাস্তি হিসাবে ৩ মাস বেতনের সমপরিমান জরিমানা অথবা তিন মাস পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু থাকলেই বা কি, এরা পুলিশ আর এটা বাংলাদেশ, আইন তো এদেশে কেবল দূর্বলের জন্যে। পুলিশ এসব আইন মানবে এমনটা আশা করার সময় কি এখনো এসেছে ?
মানবাধিকারের প্রহসন ও ৫৪ ধারা, পুলিশ কর্তৃক মৃত্যু ঘটানো
ক্রিমিনাল জুরিসপ্র“ডেন্স ম্যাজিস্ট্রেটের দেয়া ওয়ারেন্ট ব্যতীত কাউকে গ্রেফতার করা অনুমোদন করে না। কিন্তু বাংলাদেশের দণ্ডবিধির অনেক ধারাই এ নীতি লঙ্ঘন করেছে। বিনা ওয়ারেন্টেই গ্রেফতারের বিধান এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। কার্য্যবিধির ৫৪ ধারা পুলিশের জন্য তো পোয়াবারো। এ ধারা পুলিশকে পুলিশ থেকে একেবারে মহারাজা বানিয়ে দিয়েছে। কোন কারণ ছাড়াই তারা আপনাকে আটক করতে পারে। ‘সন্দেহ’ হলেই তারা আপনাকে আটক করতে পারে। যদি এ সন্দেহের কোন যুক্তিসংগত কারণ না দেখালেও তাদেরকে কোনরূপ জবাবদিহি করতে হয় না। প্রত্যেক সরকারই এই ৫৪ ধারাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। কোন আন্দোলনকে দমন করার জন্যে পুলিশ এখন ‘গণপ্রেফতার’ অভিযান পরিচালিত করে। সবাইকে ৫৪ ধারায় চালান করে দেয়। এছাড়াও ৫৪ ধারাকে ব্যবহার করে পুলিশ তাদের রমরমা গ্রেফতার বানিজ্যও চালায় কখনো কখনো। একই আইনের ৪৬ ধারার কতক বিধানও সরাসরি মানবাধিকার পরিপন্থী। ৪৬ (৩) ধারার বিধান মতে গ্রেফতার করতে গিয়ে কোন ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটাতে পারে পুলিশ। তবে শর্ত হলো, মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত নয়, এমন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটানো যাবে না। আইনের আরেকটি প্রহসনের কথা বলি, ফৌজদারী কার্যবিধি মতে যে গ্রেফতার আইনানুগ নয়, সেই গ্রেফতার যিনি করেন, তিনি দণ্ডবিধির ২২০ ধারায় অপরাধী। প্রতিদিন বাংলাদেশে হাজার হাজার আদম সন্তান পুলিশের অবৈধ গ্রেফতারের শিকার হচ্ছেন, ঐ ধারায় আজ পর্যন্ত কোন পুলিশের শাস্তি হয়েছে কি? আর ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারার অপব্যবহার সম্পর্কে প্রায় প্রতিদিনই লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি সরকারের টনক নড়ছে বা নড়বে!
হেবার ঘোষনাপত্র ও কতিপয় সম্পর্ক:
বিগত সরকারের আমলে আইন হয়েছে, বাবা-মা, ভাই-বোন, নানা-নাতি, দাদা-নাতি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দান হলে মাত্র ১০০/- ফি দিয়ে হেবার ঘোষনাপত্র রেজিষ্ট্রী করা যাবে। যদিও এই একশত টাকা ফি এর ব্যাপারটা শতাব্দীর সেরা জোকস হিসাবে প্রতীয়মান হয়েছে। (দূর্নীতি দমন বিভাগ নামে আমাদের আসলে কিছু আছে কিনা সন্দেহ হয়) যাক, আমার বিষয়টা সেদিকে নয়। বিষয়, হেবার ব্যক্তিদের সম্পর্কের ব্যাপারে। মামা-ভাগ্নে, ফুফু-ভাতিজা, চাচা-ভাতিজা-এরাও তো রক্ত সম্পর্কের তথা একই গ্র“পের, তাহলে এদের ক্ষেত্রে হেবার ঘোষনাপত্র কেন হবে না আইনে তার কোন ব্যাখ্যা নেই। ব্যরিষ্টার মন্ত্রী সাহেব কি বুঝে আইনটা পাশ করলেন, সেটাই ভাবার বিষয়।
গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যা করার ক্ষেত্রে:
আমাদের দণ্ডবিধিতে হত্যা করলে ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হওয়ার বিধান আছে। কিন্তু তা না করে ক্ষমতাবানরা আরো সহজেই গাড়ী চাপা দিয়ে তাদের প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে পারে। সেক্ষেত্রে আইন তাদের রক্ষা করবে। আমাদের দেশের আইন গাড়ীওয়ালাকে বেশ সুবিধা দিয়েছে। অপরাধ হচ্ছে-৩০৪-খ ধারা। বেইলেবল সেকশন। ইয়াহু!
নারী পুরুষের বৈষম্য ও নারী নির্যাতনের নামে:
সংবিধানে নারী পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন আইনে এর হেরফের করা হয়েছে। যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তাহলে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দণ্ডনীয় হবে।’ কিন্তু নারী যদি এক্ষেত্রে প্ররোচনা দেয় বা প্ররোচিত করে তাহলে তার কিন্তু কোন শাস্তির বিধান নেই। আবার বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারার সংজ্ঞা অনুযায়ী কেবল পুরুষই ধর্ষণ করে। কিন্তু এর বিপরীতও তো হতে পারে। সেক্ষেত্রে এদেশে কোন বিধান নেই।
নাগরিকত্ব আইনে নারীর প্রতি আরেক বৈষম্য:
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। সংবিধানের ২৮ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ট, বর্ণ, নারী পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারনে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।’ সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৫নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ব্যক্তির পিতা তার জন্মের সময় বাংলাদেশের নাগরিক হয়, তাহলে পিতার নাগরিকত্ব অনুযায়ী সে বাংলাদেশের নাগরিক হবে।’ যে সন্তানের পিতা বাংলাদেশের নাগরিক সে সন্তানই কেবল বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করবে। পিতার নাগরিকত্ব সন্তানের উপর বর্তায়। লক্ষ্য করুন, মাতার নয়। বৈষম্যের শুরু তো এখান থেকেই।
নিরাপত্তা হেফাজত নাকি জেলে রেখে শাস্তি ?
বাংলাদেশের কোন আইনেই নিরাপত্তা হেফাজত নামে কোন কিছু আছে বলে এখনো জানা যায়নি। অথচ নিরাপত্তা হেফাজতের নামে হাজার হাজার নারী পুরুষ এদেশে কারা প্রকাষ্টে মাথা ঠুকে মরছে। অনভিজ্ঞ ম্যাজিষ্ট্রেটরা অন্যের দেখাদেখি হরদম এই নিরাপত্তা হেফাজতের আদেশ দিয়ে চলেছেন। অথচ আইনে এ ধরনের কোন প্রভিশন আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করছেন বলে মনে হয় না। ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী যে কাউকে শিশু হিসাবে গন্য করা হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক অপরাধী ও শিশুদের একসঙ্গে রাখা যাবে না এবং একসঙ্গে বিচার করা যাবে না। কিন্তু এসবই কেতাবের কথা। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


