বাবা শিক্ষক হওয়ায় আমার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বেসরকারী শিক্ষকদের মানবেতর জীবন-যাপন। একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে কাজ তাদেরও সে কাজ করতে হয়। কত রাত জেগে যে আব্বাকে বিভিন্ন জরিপ এবং রিপোর্ট করতে সাহায্য করেছি তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের নীতি নির্ধারকেরা খোঁজ রাখেন কিনা তা জানার সুযোগ হয়নি। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে কাজ তাতে একজন কেরানীও কাজ করতে হিমশিম খেয়ে যাবে। কেননা প্রতি মাসে শত শত পৃষ্টার এ রিপোর্ট সে রিপোর্ট দিতে হয় থানা শিক্ষা অফিসে। প্রধান শিক্ষকের তো খাওয়-ঘুম হারাম হয়ে যায়। নীতি নির্ধারকদের এ কষ্ট বোঝারও কথা না কেননা তাদের ফরমায়েস করার জন্য তো টেবিলে টেবিলে কর্মচারী থাকে। তারা শিক্ষকদের কষ্ট কি বুঝবে? তাদের অনেক উপরি পাওনা বিভিন্ন দিবসে গিফট আরো কতো কি! আর একজন বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের দিন শুরু হয় পান্তা ভাত, একটি মরিচ সাথে আরো এক টুকরা পেঁয়াজ খেয়ে। এর মধ্যে সন্তানদের আবার কত বায়না তার ইয়ত্তা নেই। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আবার গৃহীনির কড়া নির্দেশ বাড়ী আসবার সময় চাল নিয়ে আসবে। এত সব ঝামেলা নিয়েও রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে বিদ্যালয়ে যেয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। তাদের একথা কেউ কোনদিন চিন্তা করেছেন কি?
যাইহোক মূল কথায় ফিরে আসি। বিভাগের কাজ শেষ করে রুমে আসার জন্য শাহবাগের দিকে আসি। শাহবাগ থানার পাশে জলকামান ও শত পুলিশের উপস্থিতি। ফটো নেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের দৌড় ঝাঁপ। পুলিশের যুদ্ধাংদেহী ভাব। ছিন্ন বস্ত্রে হাড় জিরজিরে হাজার হাজার শিক্ষক রাজপথে বসে পড়েছে। পাশে সমাবেশ হচ্ছে। শিক্ষকদের চোখের চাহনি আর তাদের মানবেতর জীবন-যাপনের অবস্থা দেখে চোখের কোণে পানি জমে গেল। তাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের দাবি-দাওয়া সম্বলিত স্মারকলিপি দিতে যাচ্ছিল। পুলিশ আটকে দিয়ে বলে সরকারের কেউ আসবে না। আপনারা কয়েকজন গিয়ে স্মারকলিপি দিয়ে আসেন। শিক্ষকরা এ দাবি মেনে নেয়নি। তাঁরা সেখানে বসে প্রতিবাদ করে। কয়েকজন পুলিশ বলে উপরের নির্দেশ আপনারা সামনে যেতে পারবেন না। আর জোর করে যেতে চাইলে আমরা অ্যাকশানে যাব, আমরা আপনাদের কিছু না বললে আমাদের চাকুরী যাবে। আমরাতো নিজেদের পেটে লাথি মেরে চুপ করে বসে থাকবো না।
রুমে এসে সংবাদে দেখলাম পুলিশ শিক্ষকদের উপর গরম পানি ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। সংবাদটা দেখে খুব খারাপ লাগলো। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরল। হায়! হায়!! এ আমরা কোন দেশে বাস করছি। যে শিক্ষকদের হাতে আমাদের হাতে খড়ি, যারা আমাদের ভীত গড়ে দেন তাদের গায়ে হাত! কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে শিক্ষকদের উপর এ আক্রমন মেনে নেওয়া কষ্টকর। কিন্তু এ অভিযোগ আমরা কাকে বলবো? দেশে কি কেউ আমাদের অভিভাবক আছেন? আর যাদেরকে অভিভাবক হিসেবে মনে করি তাদের চাটুকারিতা এবং অন্যকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তোলার কসরত দেখে ঘৃনায় গা ঘিন ধরে যায়। সংবাদে দেখলাম ষাটোর্দ্ধ শিক্ষকদের কান্না আর আফসোস করে বলছে, হায়! আমরা কি তোমাদের এই শিক্ষা দিয়েছি। জানিনা কোন নীতিনির্ধারকেরা এবং হোমরা-চোমরারা এসংবাদ দেখেছে কিনা। আর দেখলেও চাটুকারিতায় পারদর্শী এজাতির কোন নীতি-নির্ধারকেরা যে টু শব্দ করবেনা তা বলা যায় নির্দ্বিধায়। মগজে পচনশীল কোন জাতি ছাড়া তার কারিগরদের উপর হাত তুলতে পারে না কেউ। তবে প্রগতিশীল ছাত্রসমাজকে অন্তরের অন্তরস্থল থেকে স্যালুট তারা অসহায় শিক্ষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু আন্দোলনস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সেহেতু এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের থেকে আমরা সহমর্মিতা আশা করেছিলাম। কিন্তু সদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী শিক্ষকেরা আমাদের আশাহত করেছে।
একই দিন সংবাদে দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা ঘোষনা করেছেন। আর অন্যদিকে তীব্র গরমের মধ্যে অসহায় বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর গরম পানি নিক্ষেপ আর লাঠিচার্জ। সাবাস! রাষ্ট্র যন্ত্রের ক্ষমতাধর কর্মচারীরা। তোমাদের কাছে শিক্ষার ও শিক্ষকের কোন মূল্য নেই, তোমরা রাষ্ট্রের বাধ্যগত গোলাম। তোমাদেরকে যা বলা হয় তাই করো। তোমাদের বিবেক দিয়ে কোন কাজ করো বলে মনে হয় না। তোমাদের বা দোষ দিবো কি করে। তোমাদের উপরওয়ালার আদেশ আসলে তোমরা ঝাঁপিয়ে পড় যে কোন জায়গায়। তোমাদের মগজে যে ঘুন ধরেছে তা অনেক আগে বুঝতে পারলেও পুরোপুরিটা উপলব্ধি করলাম ঐদিন। তুমি যে সময় অ আ (বর্ণমালা) পড়তে পারতে না তখন হাতে ধরে ধৈর্য্য সহকারে কারা তোমাদের শিখিয়েছিল? যাদের নির্দেশে তোমরা বিবেক বিবর্জিত কাজ করেছ তারা নাকি হাড্ডিসার বের হওয়া রাজপথে নিজেদের নায্যদাবীর জন্য আন্দোলনরত এই হতভাগ্য শিক্ষকরা? তোমরা যারাই এ কাজ করেছ তাদের রাতে ঘুম হয়েছে কিনা জানিনা তবে তোমাদের পিতা-মাতাদের কাছে ফোন করে জেনে নিও তোমার মত বখে যাওয়া সন্তানের পরিচয় দিতে তারা লজ্জাবোধ করবে। তোমাদের এই কাজের প্রতিবাদ বা ঘৃনা প্রকাশ করার ভাষা আমাদের নেই। পৃথিবীর সব ঘৃনা তোমাদের দিকে নিক্ষেপ করলেও আমাদের ক্ষোভ উপশম হবে না। তোমরা কি মিশর ও মালদ্বীপের সরকারী বাহিনীদের থেকে শিক্ষা নিতে পারো না। তোমাদের বিবেক এতটা ভোতা হয়ে গেছে যে তোমাদের পিতাত’ল্য শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতে অন্তরাত্মা কাঁপেনি। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারজনের দু’জন মারা গেছে আর বাকি দু’নের মধ্যে আমার আব্বা ও মামা জীবিত। তাদের কথা মনে উঠলে চোখ ছলছল করে। শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আছে। পরলোকগত দু’জন শিক্ষকের জন্য জান্নাতের দোয়া করি। কোনদিন বাড়ীতে গেলে গায়ে জড়িয়ে ধরে বলবে না আব্দুল্লাহ কেমন আছো? লেখাপড়া কেমন চলছে? গাঁয়ের মাটির গন্ধে তাদের বুকে মাথা রেখে থাকতে ইচ্ছে করলেও পারিনা। ইসলাম ধর্ম মতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সিজদা দেওয়ার অনুমতি থাকলে আমি আমার মা-বাবার পরেই শিক্ষককে দিতাম।
আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অনেক আশার কথা শোনান। কয়েকদিন ধরে শিক্ষকেরা শহীদ মিনারে অবস্থান করছে, সরকারের কেউ কি সেখানে যেতে পারতো না? প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীও প্রয়োজনবোধ করলেন না সেখানে যাবার। শেষে দায় উদ্ধারের জন্য নিজের ব্যক্তিগত সহকারীকে পাঠিয়েছেন। আমাদের মন্ত্রী মহোদয়েরা আমাদের চেয়ে জ্ঞানে-গুনে ক্ষমতায় অনেক এগিয়ে কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় একি করলেন! তিনি যদি নিজেই শহীদ মিনারে যেয়ে শিক্ষকদের সাথে কথা বলতেন তাহলে শিক্ষকেরা সদ্য সাথী হারানো কষ্ট ভ’লে যেত। বরং নিজের অধিনস্ত একজন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাদের কষ্ট মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। পত্রিকায় দেখলাম এ কয়দিন শিক্ষকেরা প্রচন্ড গরমে পূরুষ মহিলা সবাই খোলা আকাশের নিচে কালাতিপাত করেছে। অনেকে দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারিনি। এত মানুষের টয়লেট ও গোসলের হাজারো সমস্যা। কারো মধ্যে কোন ভাবান্তর নেই। আমাদের দেশের মানবাধিকার কর্মীরা নিশ্চুপ।
সরকারের অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারনে যে সরকারের কবর রচনা হলো তা হয়তোবা আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা বুঝতে পারিনি। অপেক্ষা করুন আগামী নির্বাচন পর্যন্ত। আমাদের মন্ত্রীরা দলের নাকি দেশের এপ্রশ্ন দেশের সবার কাছে। নির্বাচনের আর বেশি বাকি নেই, আপনারাই আবার ভোটের জন্য এই শিক্ষকদের দ্বারে দ্বারে ধর্না দিবেন। তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নিজেদের দলে ভোট দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করবেন। কিন্তু যে শিক্ষকদের গায়ে আপনাদের কর্মচারীর ছোড়া গরম পানি পড়েছে এবং ডান্ডা পড়েছে, তাদের কাছে কোন মুখে যাবেন তা আপনাদের ব্যাপার। আপনারা সব পারেন, রাতের আধারে যেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে হয়তো সব ভ’লে যেয়ে সামনে এগুনোর কথা বলবেন কিন্তু তাদের গায়ের ফোস্কা ও ডান্ডার ঘা কি শুকাতে পারবেন? আমাদের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দায়সারা একটি প্রতিবাদ শুনলেও কোন আশার বাণী তারা শোনাননি কেননা ভবিষৎ তারা ক্ষমতায় এসে হয়তোবা একই কাজ করবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কেউ শিক্ষকদের উপরে আক্রমন সম্পর্কে মুখ খুলিনি। এটা এজাতির জন্য দুঃখজনক এবং লজ্জাজনকও বটে। দেশের অবান্তর সব বিষয় নিয়ে পাতি নেতা থেকে রাঘববোয়াল নেতারা সকাল সন্ধ্যা মিডিয়ায় বকবক করে যাচ্ছে অথচ শিক্ষকদের উপর আক্রমনে সবাই মুখে কুলোপ এটে বসে আছে। হায়! হতভাগ্য জাতি, তোমরা শিক্ষকের মর্যাদা দিতে পারলে না। দেশের কোন বিবেকবান ব্যক্তি বিশ্বাস করবে না যে পুলিশ স্ব-উদ্যোগে শিক্ষকদের উপরে আক্রমন করেছে। উপরের নির্দেশ ব্যতিত একাজ তারা করতে পারে না। আর উপরের নির্দেশ ছাড়া যদি একাজ করেই থাকে তবে সরকারের জন্য এটা সুখকর নয়। অপেক্ষা করুন আপনাদের তৈরি এ বাহিনী আপনাদেরই খাবে তাতে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয় এদেশে গুনীজনের সন্মান দিন দিন কমে যাচ্ছে। মূর্খের ও মূর্খতার আনাগোনা দিনকেদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে দেশে শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা হয় সে দেশের নৈতিক অবক্ষয় কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা ঠাওর করার সময় এখনই! আজ যারা নীতি নির্ধারক বা ক্ষমতায় আসীন,তার জন্য বিন্দুমাত্র অবদান ঐ শিক্ষকদের রয়েছে।
আমার লেখা পড়ে কেউ রেগে যেতে পারেন কিন্তু একথা আমার না এটা আপামর ছাত্র-ছাত্রীদের। আমাদের ক্ষমতা নেই, নিজের আজ্ঞাবহ লোকজন নেই যে এর প্রতিবাদ করবো। আমার যে কলমের শক্তি আছে, তা দিয়ে নিজেদের প্রতিবাদের ভাষাকে প্রকাশ করলাম। তাতে কেউ দুঃখ পেলে ক্ষমা চাই, তবে আমার শিক্ষকের গাঁয়ে যে নখের আঁচড় দিয়েছেন, সে অপমান ফেরত দেবার কেউ আছেন কি?
এ লেখার সময় জানতে পারলাম একজন শিক্ষক নাকি মারা গেছে। আমাদের কপাল মন্দ যে একজন শিক্ষক তাঁর নায্য দাবী আদায় করতে যেয়ে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। পরে সরকারের আশ্বাসে বেসরকারী শিক্ষকেরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জানিনা সরকার তার আশ্বাস পূরন করবে কিনা, আবার এই শিক্ষকেরা রাজপথে এসে লাঞ্চিত হবে কিনা। তবে সরকারের লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর হিং¯্র থাবায় যে আবার তাদের আত্মা ক্ষত বিক্ষত হবেনা তার নিশ্চয়তা কে দিবে। আমি আপাতত মগজে পচন ধরা এজাতির কাছে এ আশা করি না।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



