somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি নদীর আত্মকথা

২২ শে মে, ২০১২ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার নাম খোলপেটুয়া। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি থানায় আমার অবস্থান। সাতক্ষীরা জেলার অন্যতম এবং বাংলাদেশের ২৩০টি নদীর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত। বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরবন দৈনিক দু’বার আমার উদরের পানিতে সিক্ত হওয়ায় আমি আনন্দিত। আমার উপর দিয়ে অসংখ্যা নৌকা, লঞ্চ, বোট, স্টিমার, সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। আমি যদি বিদ্রোহী করি যে, আজ থেকে আমার উপর দিয়ে কিছু যাবে না, তাহলে সুন্দরবনের সাথে লোকালয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাবর হয়ে পড়বে। কিন্তু আমি তা করি না। আমি উদার, বড় মনের। আমার এই ক্ষমতা ও মহানুভবতা দেখে অনেক নদী ঈর্ষান্বিত হয়। আমার জন্ম সম্পর্কে কিছুই জানি না। তবে আমার গোড়ার দিকে ৪৫ হাজার লোকের বসতি দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার বয়স থেকে আমার জন্মের হিসাব রাখি। ইউনিয়নটির গোড়াপত্তন বাংলা ১৩৫০ সনে বলে শোনা যায়।

এখানকার মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, যাতায়াতসহ বাসস্থানের সঠিক সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত। গত ২০০৯ সালের ২৫শে মে ভয়াবহ আইলা এ ইউনিয়নকে একেবারে ডুবিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে ঝরে যায় ৫৯টি তাজা প্রাণ। ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা নামে খ্যাত বাগদা চিংড়ির বিরাট একটি অংশ জোগান দেয় এ ইউনিয়নটি। কিন্তু আইলা সব ভাসিয়ে দেয়, যার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতি পারিনি এখানকার মানুষ। তবে আমার করার কিছুই ছিল না, কেননা ওয়াপদা রাস্তায় (বড় বাঁধ) অসংখ্য স্লুইজ গেট ও এখানে সেখানে কেটে পানি ঢোকানোর ফলে রাস্তা আমার পানির চাপ সহ্য করতে পারিনি। যদিও আমি সবসময় পরিমানমত পানি ধারণ করি। কিন্তু সেদিন বঙ্গোপসাগর আমাকে অতিরিক্ত পানি নিতে বাধ্য করে যার ফলে এই ক্ষতি। তবে এ ইউনিয়নের একটি গ্রামের নামে (খোলপাটুয়া) রাখায় তাদের প্রতি দুর্বলতা একটু বেশি। এ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ নৌকা দিয়ে আমার উদর থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। আমি অকৃপন চিত্তে বিলিয়ে দেই আমার সর্বোচ্চ সামর্থ।

আমার পাশে আছে কপোতাক্ষ নদ। তবে কপোতাক্ষের উপর আমার মাঝে মাঝে রাগ হয়। কেননা সে আমার এই প্রিয় জনপদকে কষ্ট দেয়। এমন কোন বছর নেই, যে বছর সে এই জনপদকে তার উত্তাল পানি রাশি দিয়ে ডুবিয়ে দেয় না। আমি জানি কপোতাক্ষকে নিয়ে অনেক কবি সাহিত্যিক তাদের সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে মাইকেল মধুসুদন দত্ত এ নদীর স্তুতি গেয়েছে। কই!! কেউ তো তার ভয়াল উম্মাদ চরিত্রের বর্ণনা দেয়নি? আইলার পরে বারেবারে সে লোকালয়ের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। আমি একদিন ভেঙ্গে দিয়ে তাদের কষ্ট বুঝতে পেরে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি লোকালয়ের ভিতরে আর পানি না দিতে কিন্তু সে নিষ্ঠুরভাবে বারেবারে জনপদকে ভাসিয়ে দেয়।

আমি কোনদিন আমার প্রচার বা প্রকাশ চায়নি। আমি জানি ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। আমি শুধু সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমার নিয়ে কেউ কিছ লিখুক বা নেই লিখুক, এটা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। আমাকে নিয়ে কে কি বললো, এ দিকে আমি খেয়াল করি না। আমার কাজ আমি করে যাব। আমি জানি গাছের গোড়ায় যে জল দেয়, সে গাছের ফল খেতে পারে না। তবে আমার মনে একটি দুঃখ আছে। আমার শত বছরের লালিত স্বপ্ন ছিল নিজের সত্ত্বা নিয়ে টিকে থাকবো, অকাতরে বিলিয়ে দেব অন্যের উপকারার্থে। কিন্তু সে সুযোগ মনে হয় আর হবে না। শুনলাম সরকার নাকি আমার উপরে দালান (ব্রীজ) তৈরি করবে, যার উপর দিয়ে মানুষ চলাফেরা করবে। বলুনতো! যে সমস্ত মানুষের ষ্পর্শ নিয়ে আমি বেঁচে আছি, যাদের এক মুহূর্তের বিচ্ছেদ আমার বিরহের কারণ, তাদের স্পর্শ ছাড়া কি আমি থাকতে পারবো?

নিজেকে নিয়ে আমি অত ভাবি না। জোয়ারে পলি বয়ে এনে তীরবর্তী জনপদে বিলিয়ে দেই যার কারণে এ জনপদের লোকেরা ভাল ফসল পায়। আবার ভাটার সময় জনপদের জন্য ক্ষতিকারক সব কিছু ভাসিয়ে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে যাই। আমার ক্ষণিক ক্ষতির কারণ হলেও এটাই আমার আনন্দ যে আমি নিজের জন্য কিছু করি না। আমি জনপদের লোকের জন্য অকাতর। আমি জানি পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীর তীরবর্তী স্থানে। আমি কোন সভ্যতার অংশ না হতে পারলেও একটি জনপদের অংশ হতে পেরেছি এটাই আমার স্বার্থকতা, আমার বড় চাওয়া ও পাওয়া।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইলঃ [email protected]
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশভাগের পর-

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৮



সময় তখন ১৯৫০ সাল।
ওমর আলীর জ্বর এসেছে। জ্বর নিয়েই তিনি পত্রিকা পড়ছেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। টারজান গিয়েছে বাজার করতে। এর আগেও টারজান বেশ কয়েকবার বাজার করেছে। বাজার করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হায়ার সেলফ্‌

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪১


শীতের সময়ে রাত ১০ টা অনেক রাত। আর তা যদি হয় শহর থেকে দূরে শহরতলীতে,আবাসিক এলাকার আশপাশে,তাহলে তো কথাই নেই। রাত আটটা বাজতে না বাজতেই পাড়ার সকলে সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এফএম রেডিও

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২০

২০০৯ সাল। একটি ছেলে। সে তার নানা নানীর সাথে মুন্সীগঞ্জ এ থাকতো। নানা তার নাতিকে একটি মোবাইল উপহার দেয়। নকিয়া ১৬৬১। সেই মোবাইলে এফএম রেডিও ছিলো। সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন কার ভয়ে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৮


থাপ্পড়-কাণ্ডের পর দেশ ছেড়েছেন শাহজালাল রুমি। টঙ্গীতে নিজের মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জন্য। গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি, ব্যক্তিগত বার্তায় ভয়ভীতি প্রদর্শন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×