আমার নাম খোলপেটুয়া। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি থানায় আমার অবস্থান। সাতক্ষীরা জেলার অন্যতম এবং বাংলাদেশের ২৩০টি নদীর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত। বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরবন দৈনিক দু’বার আমার উদরের পানিতে সিক্ত হওয়ায় আমি আনন্দিত। আমার উপর দিয়ে অসংখ্যা নৌকা, লঞ্চ, বোট, স্টিমার, সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। আমি যদি বিদ্রোহী করি যে, আজ থেকে আমার উপর দিয়ে কিছু যাবে না, তাহলে সুন্দরবনের সাথে লোকালয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাবর হয়ে পড়বে। কিন্তু আমি তা করি না। আমি উদার, বড় মনের। আমার এই ক্ষমতা ও মহানুভবতা দেখে অনেক নদী ঈর্ষান্বিত হয়। আমার জন্ম সম্পর্কে কিছুই জানি না। তবে আমার গোড়ার দিকে ৪৫ হাজার লোকের বসতি দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার বয়স থেকে আমার জন্মের হিসাব রাখি। ইউনিয়নটির গোড়াপত্তন বাংলা ১৩৫০ সনে বলে শোনা যায়।
এখানকার মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, যাতায়াতসহ বাসস্থানের সঠিক সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত। গত ২০০৯ সালের ২৫শে মে ভয়াবহ আইলা এ ইউনিয়নকে একেবারে ডুবিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে ঝরে যায় ৫৯টি তাজা প্রাণ। ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা নামে খ্যাত বাগদা চিংড়ির বিরাট একটি অংশ জোগান দেয় এ ইউনিয়নটি। কিন্তু আইলা সব ভাসিয়ে দেয়, যার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতি পারিনি এখানকার মানুষ। তবে আমার করার কিছুই ছিল না, কেননা ওয়াপদা রাস্তায় (বড় বাঁধ) অসংখ্য স্লুইজ গেট ও এখানে সেখানে কেটে পানি ঢোকানোর ফলে রাস্তা আমার পানির চাপ সহ্য করতে পারিনি। যদিও আমি সবসময় পরিমানমত পানি ধারণ করি। কিন্তু সেদিন বঙ্গোপসাগর আমাকে অতিরিক্ত পানি নিতে বাধ্য করে যার ফলে এই ক্ষতি। তবে এ ইউনিয়নের একটি গ্রামের নামে (খোলপাটুয়া) রাখায় তাদের প্রতি দুর্বলতা একটু বেশি। এ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ নৌকা দিয়ে আমার উদর থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। আমি অকৃপন চিত্তে বিলিয়ে দেই আমার সর্বোচ্চ সামর্থ।
আমার পাশে আছে কপোতাক্ষ নদ। তবে কপোতাক্ষের উপর আমার মাঝে মাঝে রাগ হয়। কেননা সে আমার এই প্রিয় জনপদকে কষ্ট দেয়। এমন কোন বছর নেই, যে বছর সে এই জনপদকে তার উত্তাল পানি রাশি দিয়ে ডুবিয়ে দেয় না। আমি জানি কপোতাক্ষকে নিয়ে অনেক কবি সাহিত্যিক তাদের সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে মাইকেল মধুসুদন দত্ত এ নদীর স্তুতি গেয়েছে। কই!! কেউ তো তার ভয়াল উম্মাদ চরিত্রের বর্ণনা দেয়নি? আইলার পরে বারেবারে সে লোকালয়ের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। আমি একদিন ভেঙ্গে দিয়ে তাদের কষ্ট বুঝতে পেরে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি লোকালয়ের ভিতরে আর পানি না দিতে কিন্তু সে নিষ্ঠুরভাবে বারেবারে জনপদকে ভাসিয়ে দেয়।
আমি কোনদিন আমার প্রচার বা প্রকাশ চায়নি। আমি জানি ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। আমি শুধু সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমার নিয়ে কেউ কিছ লিখুক বা নেই লিখুক, এটা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই। আমাকে নিয়ে কে কি বললো, এ দিকে আমি খেয়াল করি না। আমার কাজ আমি করে যাব। আমি জানি গাছের গোড়ায় যে জল দেয়, সে গাছের ফল খেতে পারে না। তবে আমার মনে একটি দুঃখ আছে। আমার শত বছরের লালিত স্বপ্ন ছিল নিজের সত্ত্বা নিয়ে টিকে থাকবো, অকাতরে বিলিয়ে দেব অন্যের উপকারার্থে। কিন্তু সে সুযোগ মনে হয় আর হবে না। শুনলাম সরকার নাকি আমার উপরে দালান (ব্রীজ) তৈরি করবে, যার উপর দিয়ে মানুষ চলাফেরা করবে। বলুনতো! যে সমস্ত মানুষের ষ্পর্শ নিয়ে আমি বেঁচে আছি, যাদের এক মুহূর্তের বিচ্ছেদ আমার বিরহের কারণ, তাদের স্পর্শ ছাড়া কি আমি থাকতে পারবো?
নিজেকে নিয়ে আমি অত ভাবি না। জোয়ারে পলি বয়ে এনে তীরবর্তী জনপদে বিলিয়ে দেই যার কারণে এ জনপদের লোকেরা ভাল ফসল পায়। আবার ভাটার সময় জনপদের জন্য ক্ষতিকারক সব কিছু ভাসিয়ে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে যাই। আমার ক্ষণিক ক্ষতির কারণ হলেও এটাই আমার আনন্দ যে আমি নিজের জন্য কিছু করি না। আমি জনপদের লোকের জন্য অকাতর। আমি জানি পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীর তীরবর্তী স্থানে। আমি কোন সভ্যতার অংশ না হতে পারলেও একটি জনপদের অংশ হতে পেরেছি এটাই আমার স্বার্থকতা, আমার বড় চাওয়া ও পাওয়া।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইলঃ [email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



