সম্প্রতি আব্দুল কাদের মোল্লার ’যাবজ্জীবন কারাদন্ড’ রায়ের পর জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিটিং-এ গুরতর একটি অভিযোগ উন্থাপণ করা হয়েছে। সোজা কথায় তা হলো- জামায়াত ও ক্ষমতাশীন দলের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে যার প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালে আটক জামায়াত নেতা মোল্লার বিরুদ্ধে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে।
’মাননীয় আদালত স্বাধীনভাবে রায় দিয়েছেন’- একথা ধরে নিয়েই রায়ের পরে উন্থাপিত অভিযোগ ও গনমানুষের আন্দোলনের পিছনে কী আশংকা কাজ করেছে এবং কী ধারণা তৈরী হযেছে তা বলার চেষ্টা করব।
যেনতেন কেউ নন, কয়েকজন সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রী যখন এরকম অভিযোগ করেন তখন বিষয়টি ভাবার বিষয়। তাও আবার জাতীয় সংসদে। কেননা, আমরা জনসাধারণ মনে করি তারা সরকারেরই একটি অংশ এবং এর নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন। সুতরাং যদি সমঝোতার কিছু ঘটে থাকে তারাই সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা ও জানার সুযোগ পেয়েছেন।
সংসদে জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলনে, ‘আপস করার মতো নয়, এমন একটি বিষয়ে আপস করা হয়ছে। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘--- সর্বোচ্চ শাস্তি কাম্য ছিল। অথচ অপরাধের শাস্তি হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এই রায়ে সবার মন ভেঙে গেছে। আমরা সাপ নিয়ে খেলছি। সাপের মুখে চুমু দিতে নেই। সুযোগ পেলে সেই সাপ ছোবল দেবে।’
মেনন আরও বলেন, ‘এই রায়ের ফলে মানুষের মনে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তা দূর করা প্রয়োজন। (প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারী ৫, অনলাইন সংস্করণ, ২০১৩)
এ সংবাদ প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দাবি করেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কারও সঙ্গে আঁতাত করে রাজনীতি করে না। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে বিচারকেরা যে রায় দিয়েছেন, তাতে আমরা সন্তুষ্ট না হলেও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করেছে।’ (প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারী ৬, ২০১৩)
ডেইলি স্টারকে দেয়া এ রায়ের প্রতিক্রিয়া অনেক লোক বলেন এরকম একটি রায়ের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একটি প্রাইভেট কারের চালক দেলওয়ার মনে করেন ’সরকার এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে আগামী নির্বাচন বিবেচনা করে।’ গাজী নামের একজন দর্জী বলেন, আমি জানি না কী বলব, আমি সত্যিই এই সকল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত রং বুঝতে পারি না। আরো অনেকে বলেন যে, এই বিচার আর ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং এটি রাজনৈতিক দলগুলোর খেলা মাত্র। (অনুদিত) সূত্র: ডেইলি স্টার, ফেব্রুয়ারী ৬, ২০১৩।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবি বলেন- The government might have made an underhand settlement with Jamaat for giving less punishment to Mollah through the ICT-2 for any political purpose. (দি ডেইলি স্টার, ফেব্রুয়ারী ৭, ২০১৩)
অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা যাই হোক- এ ঘটনা প্রমাণ করে তারা মনে করেন যে, সরকার বাহাদুর ইচ্ছা করলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের ধরন পাল্টে দিতে পারেন। তাদের অভিযোগের তীর কিন্তু ট্রাইব্যুনালের দিকে নয়, বরং সরকারের কিছু ’প্রভাবশালী’ ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সংসদের বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি টেলিভিশনের টকশো’তেও আলোচনা হয়।
এরপর আসি শাহবাগ স্কয়ার আন্দোলনে। একে তুলনা করা হচ্ছে মিশরের তাহরীর স্কয়ারের সাথে। কিন্তু এদুটি স্কয়ারের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। তাহরীর স্কয়ার ছিল সেখানকার ক্ষমতাশীন সরকারের বিরুদ্ধে আর শাহবাগ হলো আদালতরে একটি রায়ের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে এরকম আন্দেলন এই প্রথম। তারা দাবি করছে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজা পরিবর্তন করে ফাঁসি দিতে হবে। এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ডমেস্টিক আদালত)-এ যাদের বিচার হচ্ছে তাদের সবারই ফাঁসি তাদের দাবি। অন্যথায় ঘরে ফিরবে না হুশিয়ারি দিয়েছেন।
আন্দোলনটি শুরু হল যখন ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দন্ড দিয়ে তার দ্বিতীয় রায় ঘোষনা করল। তাদের দাবির সাথে আরো যোগ হয়েছে ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধের দাবি।
এখন কথা হলো তাদের দাবি কার কাছে। যদি ধরি, সরকারের কাছে- তবে তাদের ধারণাটি আরো শক্ত বলে মনে হচ্ছে যে, সরকার বাহাদুর ইচ্ছা করলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। একারণেই আন্দোলন করে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে সরকার ফাঁসির রায় দিতে বাধ্য হয়। যদি ধরি, তাদের ফাঁসির দাবি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের কাছে- তবে বর্তমান সরকার কর্তৃক গঠিত এ ট্রাইব্যুনালের প্রতি তাদের এই বিশ্বাস কম আছে বলে মনে হচ্ছে যে বিচারকেরা ন্যায় বিচার করবেন; তাই হয়ত তারা আন্দোলন করে বিচারকদের বাধ্য করতে চাচ্ছেন ফাঁসির রায় দিতে।
অন্যদিকে ২০০৯ সালে ট্রাইব্যুনালটি গঠনের পর থেকে আসামী পক্ষ, জামায়াত ও বিএনপি বরাবরই বলে আসছে যে বর্তমান সরকার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এই ট্রাইব্যুনাল বসিয়েছে। সরকার বিরোধীদলের নেতাদের ফাঁসি দেয়ার নীল নক্সা বাস্তবায়ন করতে চায় ট্রাইব্যুনালে-এর প্রতিবাদে জামায়াত সম্প্রতি হরতালও দিয়েছে। মোল্লার রায়ে সরকারের সেই নীল নক্সা প্রতিফলিত হয়েছে দাবি করে তার প্রতিবাদে আরেকদিন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছে দলটি। অর্থ্যাৎ তাদের অভিযোগের মূল কথা- ট্রাইব্যুনালের রায়ে সরকার প্রভাবিত করছে অথবা ট্রাইব্যুনালই সরকারের ’নীল নক্সা’ বাস্তবায়ন করছে। এবার তাদের অভিযোগের সাথে প্রকারান্তরে একমত পোষন করলেন সরকারদলীয় কয়েকজন এমপিসহ শাহবাগের আন্দোলনকারীরা।
যাই হোক, উভয় গোষ্ঠীর ধারণা বা অভিযোগের প্রকৃতি এক। তা হলো- সরকার বাহাদুর ইচ্ছা করলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের ধরন পাল্টে দিতে বা প্রভাবিত করতে পারেন। তবে, পার্থক্য হলো বিএনপি-জামায়াত বলছে সরকার বিরোধীদলকে রাজনৈতিকভাবে শায়েস্তা করছে আর কিছু সরকারদলীয় এমপিসহ অন্য গ্রুপটি বলছে সরকার আঁতাত করে সাজা কমিয়ে দিচ্ছে। আর এ কারণেই তারা যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন করছে।
সবমিলে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ’ট্রাইব্যুনাল সরকার কর্তৃক প্রভাবিত’-এ রকম ধারনা পোষনকারীর সংখ্যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেড়েই চলেছে যা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য শুভ লক্ষণ বলে মনে হয় না।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



