ঠিক এমনটিই ঘটেছিল সাত্তার আলীর, যখন তিনি কাজ করছিলেন ইউপি'র সিনাউলি গ্রামে তার নিজের আখের ক্ষেতে। কিন্তু অশিক্ষিত সাত্তার আলী বুঝতেও পারেননি যে তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন 4,000 বছর আগেকার হরপ্পা সভ্যতার এক কবরস্থানের উপর।
বছর দেড়েক আগে সিনাউলি গ্রামের এক তরম্নণ, তাহির হোসেন এ সম্পর্কে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) কে জানায়। এএসআই '05 এর আগস্ট থেকে ধার্মাভীর শার্মার নেতৃত্বে পুরোদমে খননকাজ চালায় সেখানে। ধার্মাভীর শার্মা জানিয়েছেন, খননে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মধ্যে এমনকিছু রয়েছে যা আমাদের এশিয়ার ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
সিনাউলি থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো অন্যরকম গুরম্নত্ব বহন করে কেননা, ইউপি অঞ্চলে আবিষ্কৃত হরপ্পা সভ্যতার প্রথম কবরস্থান এটি। শুধু তাই নয়, এটাই প্রথম প্রত্নস্থান যেখানে সমাহিত কঙ্কালের পাশেই দুই অ্যান্টেনা বিশিষ্ট তরবারি পাওয়া গিয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে প্রত্নবস্তুগুলো তাম্র-সাংস্কৃতিক যুগের প্রতিনিধিত্ব করছে- যদিও এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। এ প্রত্নবস্তুগুলো কেবল এটাই প্রমাণ করছে যে, তাম্র সংস্কৃতির সাথে হরপ্পা সভ্যতার শেষ যুগের মানুষেরা ভালোই পরিচিত ছিলো।
এবারের এই খননকাজে প্রচুর প্রত্নবস্তু পাওয়া গিয়েছে। প্রায় 126 টি কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে সাত্তার আলীর আখ ৰেত থেকে। এ থেকে প্রত্নতাত্তি্বকেরা ধারণা করছেন যে, এখানে বেশ বড়োসড়ো এক মানব বসতি ছিলো। কঙ্কাল ও মৃৎপাত্রগুলো কিছু পাওয়া গিয়েছে ভাঙাচোরা অবস্থায়, আবার কিছু পাওয়া গিয়েছে সংরৰিত অবস্থায়।
প্রথমদিকে পাওয়া একটি কঙ্কালের দু'হাত ভর্তি ছিলো তামা দিয়ে তৈরি ব্রেসলেটে। এর কিছুদূরেই পাওয়া আরেকটি কঙ্কালের সাথে পাওয়া গিয়েছে পশুর কঙ্কাল। ধারণা করা হচ্ছে পশুর সাথে বলি হয়েছিলেন ঐ কঙ্কালের মালিকও। এছাড়াও সিনাউলির প্রায় নয় একর জায়গা জুড়ে পাওয়া যাচ্ছে হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট সম্বলিত পুঁতির মালা, তামার শিরস্ত্রাণ, সোনার তৈরি অলঙ্কার আর নৃতাত্তি্বক গুরুত্ব বহন করে এমন কিছু প্রত্নবস্তু।
এখানে প্রাপ্ত সকল নিদর্শন প্রমাণ করছে যে হরপ্পা সংস্কৃতির চূড়ানত্দ বিকাশ পর্বের মানুষদের বসতি ছিলো এখানে। আর এই চূড়ানত্দ বিকাশ পর্বের সময়কাল ছিলো খ্রিষ্ট পূর্ব 2000 অব্দের দিকে। তবে এখনো এলাকার কোন কার্বণ টেস্ট করা হয়নি। কার্বণ 14 টেস্টের মাধ্যমে সিনাউলির এই কবরস্থানের সঠিক সময়কাল প্রায় সুনিশ্চিতভাবে বলা যাবে। ড. শার্মা মনে করছেন, সিনাউলির এই নিদর্শনগুলো প্রমাণ করতে সৰম হবে যে, আর্যরা বহিভর্ারতীয় নয়। কেননা হরপ্পা পরবতর্ী সময়ে গড়ে ওঠা আর্যদের বৈদিক সভ্যতার শেকড়ের গন্ধ পাচ্ছেন তিনি এখানে। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, সবগুলো কঙ্কালই সমাহিত আছে উত্তর-দৰিণ দিক নির্দেশ করে। ঠিক যেমনটি বলা হয়েছে ঋগ্বেদ-এ।
কঙ্কালগুলোর মাথার কাছে পাওয়া গিয়েছে বেশ কিছু পাত্র। ধারণা করা হচ্ছে এই পাত্রে শস্যকণা, ঘি, দই, সোমরস ইত্যাদি উৎসর্গ করা হতো মৃতু্যদেবতা যমকে। মৃতদেহ সৎকারের এই আচার-বিধির উলেস্নখ রয়েছে আদি বেদ গ্রন্থ সাতপাঠ ব্রাক্ষ্মণ-এ।
অবশ্য সব ইতিহাসবিদ ধার্মভিীর শার্মা'র এই মতবাদ সমর্থন করছেন না। তারা মনে করছেন কার্বণ টেস্ট ছাড়াই এতো জলদি কোনরকম উপসংহারে উপনীত হওয়াটা ঠিক হবে না।
উত্তর প্রদেশ টু্যরিস্ট ডিপার্টমেন্ট, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া'র সাথে কথা বলেছে এবং মহাভারতের সাথে এর কোন যোগাযোগ আছে কীনা- সেটাও খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছে। কেননা, সিনাউলির পাশেই পানিপাট, সোনপাট ও হসত্দিনাপুর- মহাভারতে উলিস্নখিত তিনটি স্থান অবস্থিত।
অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করছেন সিনাউলি সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে বহু নতুন তথ্য ও তত্ত্ব প্রদানে সৰম হবে। কিনত্দু এজন্যে আমাদের আরো ধৈর্য্যধারণ করতে হবে। কেননা এখন পর্যনত্দ কবরস্থানের মাত্র ছোট্ট একটি অংশে অথর্াৎ সাত্তার আলীর ফসলি জমিতেই কেবল খনন কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। আর প্রায় নয় একর জায়গা জুড়ে এই কবরস্থানের বিসত্দৃতি- তাই পুরো এলাকাতে খনন না করে কোন স্থির সিদ্ধানত্দ নেয়া হবে বোকামি।
তবে এ এস আই এখানে কাজ শুরম্ন করার আগেই গ্রামের অধিবাসীরা বেশ কিছু মূল্যবান নিদর্শন সরিয়ে ফেলেছে। এর ফলে হয়তোবা গুরম্নত্বপূর্ণ কিছু সূত্র হারিয়েও যেতে পারে।
অনুবাদ:আল মারুফ
মূল: অতুল শেঠি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া
জুলাই 3, 2006।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



