somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মিথ্যা ভালবাসা!!

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখনও পাখিদের ঘুম ভাঙ্গেনি। পাড়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসেনি আযানধ্বনি। রাতের স্নিগ্ধতা হারিয়ে চাঁদটা ক্লান্ত শরীরে নুঁয়ে পড়েছে পশ্চিমের আকাশে। নিদ্রাহীন চোখে জানালা খুলে বাইরে তাকায় সুষমা। গতকাল বিপ্লবের কথাটা মনে করে সারারাত তার ঘুম হয়নি। আলো-আধারের মাঝে দেখার মত তেমন কিছুই খুজে পেলনা। বিছানায় আর থাকতেও মন চায় না তার। ঘুম ছাড়া বিছানায় শুয়ে থাকা যায় কতক্ষণ? কিন্তু যাবে কোথায় সে, খুজে পায় না। একাকিত্বের অবসান ঘটানো যায় কিভাবে সেই ভাবনা থেকেই জানালা খুলে বাইরে তাকিয়েছিল সুষমা। হাসনাহেনা গাছে ফুল ফুটলে তার সুগন্ধ নেওয়া যেত মন ভরে, সেটাও নেই। পাশের কক্ষে বাবা মা ঘুমাচ্ছেন, তাই ইচ্ছা করলেও আলো জ্বালিয়ে বই পড়া সম্ভব নয়।

অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে একসময় ঠিকই মসজিদ থেকে ভেসে আসে আযানধ্বনি। একটু পরেই ওপাড়া থেকে শোনা যায় উলুধ্বনি। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দে রাতের নির্জনতা ভাঙ্গার সার্থক প্রয়াস চালাচ্ছে। দরজা খুলতেই আধো আলোয় চোখে পড়ে এক যুবক দাড়িয়ে আছে ঠিক দরাজার সামনে। ভয়ে চিৎকার দিতে গিয়েও আগে নিজেকে সামলে নেয় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে। দ্রুত হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ায় সুষমা বসে পড়ে সোফার উপর। অসুস্থ মাকে ডাক দিবে কিনা সে প্রশ্নই করতে থাকে নিজের নিকট। উত্তর খুজে পায় না। একবার ভাবে লাভটা কি লোক জানাজানি করে। বরং নানান মুখে নানা কথা শোভা পাবে তাকে ঘিরে। কেউই হয়তো বিষয়টি ভাল চোখে দেখবে না। এমনকি স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে তার। কিন্তু স্কুলে না গেলে বিপ্লবকে দেখবে কিভাবে সে। এতসব কিছু ভেবে সে সিদ্ধান্ত নেয় কাউকে কিছু না জানানোর। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর খুজে পায় না, কে এই যুবক?

প্রভাতী ট্রেনের ছন্দময় ঝিক-ঝিক শব্দে তন্দ্রাভাব কেঁটে যায় সুষমার। বাড়ির পাশ দিয়েই চলে গেছে ট্রেন লাইনটা। সোফায় গাঁ এলিয়ে দিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছে ঠাহর করতে পারেনি সে। বাইরের ভোরের আলোক রেখা জানালার সামান্য ফাঁকা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে এক নতুন আবহ্ সৃষ্টি করেছে। তড়িৎ সোফা থেকে উঠে মা বলে ডাক দেয় সুষমা। পাশের কক্ষ থেকে মা ছুটে আসেন হাতে চায়ের কাপ নিয়ে।
আমি ভেবেছি তুই এখনো উঠিসনি!
না মা আমি উঠেছি আগেই, কিন্তু.....
কি হয়েছে তোর, শরীর খারাপ করেনিতো? বলে কপালে হাত দেয় সুষমার মা।
না মা জ্বর-টর ওরকম কিছু না, রাতে ভাল ঘুম হয়নি তাই।
তা আমাকে ডাক দিসনি কেন?
ভাবলাম তোমার শরীরটা বেশী ভাল নেই, তাই তোমাকে ডাক দেওয়ার সাহস করিনি।
নে চা খেয়ে নে। হাত মুখ ধুয়ে একবারে গোসল করে বের হ্।

মা চলে যায় রান্না ঘরে। বাবার অফিসে যাওয়ার আগে নাস্তা প্রস্তুত করতেই মায়ের যত ব্যস্ততা। সাথে আবার দুপুরের খাবারটাও টিফিন বক্সে দিয়ে দিতে হবে। চায়ের কাপে মুখ দিয়ে ভাবে সুষমা, হায়রে জনম! মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মানো মানেই কুলহীণ কষ্টের নদীতে সাতার দেওয়া। জীবনে এরকম কত ঘটনাই মুখ বুজে হজম করতে হয়, তা শুধু মেয়েরাই জানে। কিন্তু সুষমার মন থেকে আলো আধারের মাঝে দেখা যুবকটি কে, সেই প্রশ্নটা বারবার উঁকি দিচ্ছে। বিষন্ন মন নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে গোসল সেরে বের হয় সুষমা। ততক্ষনে বাবা নাস্তার টেবিল থেকে ডাক দেয় সুষমাকে। বাবার সঙ্গে নাস্তা খেয়ে প্রস্তুত হয় স্কুলে যাওয়ার জন্য।

যথারিতী স্কুলে পৌছে বিপ্লবকে খুজতে থাকে সুষমা। গতকাল বিপ্লব যে কথাটি বলেছিল তার অর্থ জানতে হবে সুষমাকে। কিন্তু কোথাও খুজে পায় না বিপ্লবকে। তাহলে গেল কোথায়? বিপ্লবের সঙ্গে তার পরিচয় সেই ছোট বেলা থেকেই। একই সাথে স্কুলে লেখাপড়ার সুবাদে তাদের মধ্যে কখন যে বিনিসুতোর বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে তা কেউ জানেনা। তবে দু'জনার মধ্যে খুব বেশী কথা হয়নি কখনো। নিজেদের ভাললাগার কথাটিও কখনো প্রকাশ করেনি একে-অপরকে। কিন্তু একজনকে না দেখলে অপরজনের বুকে যে শুণ্যতার সৃষ্টি হয় তা অন্য কেউ কখনো জানতেও পারেনি। বিপ্লব স্কুলে না আসায় ক্লাসে মন বসেনা সুষমার। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে হৃদকম্পন।

বিষন্ন মনে স্কুল থেকে বের হয় সুষমা। সারাটা রাস্তায় বিপ্লবকে খুজেছে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে। না কোথাও পায় না খুজে তাকে। কারো নিকট বিপ্লবের কথা জিজ্ঞাসা করার সাহস হয়না তার। কে কি ভাববে সে ভয় আছে। বাড়ি ফিরে বিষন্ন মুখ দেখে কিছুটা আঁচ করতে পেরে প্রশ্ন করে সুষমার মা,
কি হয়েছে তোর?
রাতে ঘুম না হওয়ায় শরীরটা ভাল লাগছে না, মা,
খাবার খেয়ে শুয়ে পড়, আমি তোকে ঘুম পড়িয়ে দিচ্ছি,
না মা, দিনে ঘুমোলে শরীর আরো বেশী খারাপ করবে,
ঠিক আছে তুই না ঘুমোস আমি তোর সাথে গল্প করবো, নে আগে খেয়ে নে।

খাবার খেয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সুষমা। ছোট বেলায় একবার বিল থেকে শাপলা তুলেছিল বলে গাঁয়ের ছেলেরা তাকে শাপলা বালিকা বলে ডাকতো, এই কথা দিয়েই শুরু হয় মায়ের গল্প বলা। তারপর আরো অনেক গল্প। কিন্তু কোন গল্পেই সুষমার মনকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হচ্ছিল না। একসময় মা বললেন জানিস, আজ ওপাড়ার বিধান দাদারা রাতের অন্ধকারে দেশ ছেড়ে চলে গেছে? জমি জমা যা ছিল গোপনে বিক্রি করে গেছে। যাওয়ার সময় একটু বলেও গেলনা তারা। বলবেইবা কি করে! এক জমি ২/৩ জনের নিকট বিক্রি করে গেছে। প্রত্যেককে বলে গেছে, 'দাদা এই জমি বিক্রির কথা আর যেন কেউ না জানে'। এখন এক জমির ২/৩ জন মালিক দাড়িয়েছে। বিধান দাদার ছেলে বিপ্লব না তোদের সাথে পড়তো? তোদেরকেও মনে হয় বলে যায়নি, না?

প্রশ্নগুলির কি উত্তর দিবে ভেবে পায় না সুষমা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে আধো আলো-আধারে দাড়িয়ে থাকা একটি যুবক, যাকে সে রাতে দেখেছিল। মায়ের কথাগুলো শুনে সুষমার মনে হল বুকের উপর কেউ কুঠার দিয়ে আঘাত করছে। এই দেশ আমার দেশ। এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা কখনো ভাবতেই পারেনা সুষমা। স্কুলে ক্লাস শুরুর আগে এ্যাসেম্বিলিতে দাড়িয়ে যখন সকলে একসাথে জাতীয় সংগীত গাইতো, তখনতো সকলের সাথে বিপ্লবও গাইতো 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি'। তাহলে কি এতদিন বিপ্লব মিথ্যা বলেছে? এ দেশকে, এ দেশের মানুষকে কখনোই ভালবাসেনি? তাহলে স্কুলে গতকাল ক্ষমা চেয়েছিল কেন? এই মিথ্যা ভালবাসাই কি তার অপরাধ? প্রশ্নবানে নিজেকে জর্জরিত করে তুলে সুষমা। খুব ভোরে যে বালকটি এসেছিল দ্বারে সে বিপ্লব ছাড়া আর যে কেউ নয়, ততক্ষণে বুঝতে পেরে নিজেকেই অপরাধী মনে করে সুষমা!
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৫:৩৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×