আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অভিযোগের শুনানি অব্যাহত রয়েছে। সরকারপক্ষের আনীত অভিযোগের বিরুদ্ধে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট তাজুল ইসলাম প্রথম পর্যায়ে অভিযোগ খন্ডনের যুক্তি প্রদর্শন শেষ করেছেন। সরকারপক্ষের পাল্টা যুক্তিও শুরু হয়েছে। আগামীকাল পুনরায় সরকারপক্ষ বক্তব্য রাখবেন। অভিযোগ শুনানিকালে এডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছেন, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগই আনতে পারেনি প্রসিকিউশন পক্ষ। কাজেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোন অভিযোগ দায়ের হতে পারে না। ১৯৭১ সালের কথিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হোক। তার বক্তব্যকে সমর্থন করে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির বলেছেন, শতভাগ ভেগ তথ্য বলে তাজুল যে অভিযোগ করেছেন তা পুরোপুরি সত্য। যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার একটিরও সুনির্দিষ্ট দিন, তারিখ, অপরাধের ধরন ইত্যাদি অভিযোগপত্রে উল্লেখ নেই।

গতকাল সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির ও বিচারপতি এ কে এম জহিরের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উপস্থিতিতে তার আইনজীবী এডভোকেট তাজুল ইসলাম গতকাল তার অসমাপ্ত বক্তব্য শুরু করেন। সরকারপক্ষের আনীত ৩১টি অভিযোগের জবাবে তিনি ৭৯টি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, আমার মক্কেল সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার শতভাগই অসত্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ইত্যাদির যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার একটি ঘটনারও সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় উল্লেখ নেই। সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না থাকলে আমার মক্কেল কিভাবে ডিফেন্ড করবেন যে ঐদিন তিনি আসলে কোথায় ছিলেন, কি কাজে ব্যস্ত ছিলেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর তিনি যুক্তিতর্ক প্রদর্শন শুরু করেন। ঐদিন ৫৫টি যুক্তি প্রদর্শনের পর আদালত মুলতবি করা হয়। গতকাল তিনি তার বাকী যুক্তিগুলো তুলে ধরেন। বেলা ১২টার পরে সরকারপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর এস হায়দার আলী পাল্টা যুক্তি প্রদর্শন শুরু করেন। দুপুরে সোয়া ১ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে আবার সোয়া ২টায় ট্রাইব্যুনাল বিচারিক কার্যক্রম শুরু করলে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তিনি বক্তব্য রাখেন।
এডভোকেট তাজুল ইসলাম মাওলানা সাঈদীকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, অনিশ্চিত তথ্য অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ঐ আইনে স্বাক্ষরকারী দেশ। তিনি এ প্রসঙ্গে আইসিসিপিআর এর বিভিন্ন ধারা, নুরেমবার্গ ট্রায়ালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারের রায় নজীর হিসেবে উপস্থাপন করেন যার কপিও ৩ বিচারক ও সরকারপক্ষের আইনজীবীদের সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ৮ মাসের যে কোন একদিন এক ব্যক্তির হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট সময়, স্থান, তারিখ এখানে উল্লেখ নেই। ৯ মাসে অসংখ্য নারী ধর্ষিতা হয়েছে, গণহত্যা হয়েছে, অগ্নিসংযোগ হয়েছে। এর সাথে মাওলানা সাঈদী জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। কিন্তু কোন তারিখের কোন ঘটনায় তিনি জড়িত তা উল্লেখ নেই। সেই ঘটনায় ভিকটিমই বা কে তাও উল্লেখ নেই। এই ধরনের অস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কোন অভিযোগ গঠন হতে পারে না। এটা আইসিসিপিআর-এর লংঘন যা বাংলাদেশ মানতে বাধ্য। দেশীয় আইন, সংবিধান, কোনটিতেই এভাবে অস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন সমর্থন করে না। তিনি জোর করে মানুষকে হিন্দু থেকে মুসলমান বানিয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। কিন্তু কবে, কাকে, কোথায় করা হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। এভাবে ৭টি অপরাধ সংঘটনের জন্য ৩৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর প্রতিটি অভিযোগই ভিত্তিহীন। পর্যাপ্ত তথ্য, প্রমাণ উপাত্ত এতে নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া চার্জ গঠন হলে সেটা সুবিচার হবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি ট্রাইব্যুনালের আইনের অপর্যাপ্ততার কথা তুলে ধরে বলেন, অপরাধ সঠিকভাবে সংগায়ন প্রয়োজন। ট্রাইব্যুনালের আইন কভার না করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন কি বলে সেটা দেখতে হবে। সব আইনেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগই চার্জ গঠনের ভিত্তি বলে উল্লেখ আছে।
বেলা ১২ টায় প্রসিকিউটর এস হায়দার আলী ইতোপূর্বে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে এবং তাজুল ইসলামের যুক্তির বিপক্ষে শুনানি শুরু করেন। দুপুর ১টা থেকে সোয়া ২টা পর্যন্ত বিরতি বাদে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তিনি শুনানি করেন। তিনি বলেন, যথেষ্ট তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগ আনা হয়েছে। ৪০ বছর আগের ঘটনা আমরা যতটুকু তথ্য জোগাড় করেছি সেটা কম নয়। সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় অনেকেরই মনে নেই। তবে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ লুটতরাজ ঐ ৯ মাসে সারা দেশেই হয়েছে। পিরোজপুরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগও সুনির্দিষ্টই আছে। সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। এ পর্যায়ে বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির বলেন, তাজুল ইসলাম বলেছেন যে শতভাগ অস্পষ্ট তথ্য। সেই অভিযোগ পুরোপুরি সত্য। এর বিরোধীতা করেন হায়দার আলী। তিনি বলেন, ৯ মাসের আক্রমণগুলো ছিল সিরিজ আক্রমণ। তবে বিচারপতির প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে তিনি ভিন্ন প্রসঙ্গে বলতে থাকেন। তিনি বলেন, ৩ জনের একটি গ্রুপ ছিল যার নেতা ছিলেন সাঈদী। বিচারপতির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাকী ২ জন মারা গেছে। আরবি ও উর্দু ভাষার পারদর্শী হওয়ার কারণে মাওলানা সাঈদীর ভূমিকাই ছিল মুখ্য। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তার বক্তব্য শুধরে নিয়ে বলেন, পাকিস্তানী বাহিনী উর্দু ভাষী হওয়ায় তিনি তাদের সাথে কমিউনিকেট করার পারদর্শী ছিলেন। আদালত আরো জানতে চান যে ৩ জনের নেতা যে তিনি ছিলেন তার প্রমাণ কি?
প্রসিকিউটর হায়দার আলী গতকাল দুই দফায় প্রায় আড়াই ঘণ্টা বক্তব্য রাখার পর বেলা ৩টা ৩৫ মিনিটে আদালত মূলতবী ঘোষণা করা হয়। আজই শুনানির দিন ধার্য করতে চাইলে অন্য মামলায় ব্যস্ত থাকার কথা জানান তাজুল ইসলাম। ফলে মঙ্গলবার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
প্রেসব্রিফিং-এ এডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, আইন ও বিধিতে অপূর্ণতা রয়েছে। এজন্য আমরা আন্তর্জাতিক আইন এবং বিভিন্ন দেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজীর তুলে ধরেছি। অপরাধ সঠিকভাবে সংগায়িত না হলে বিচার হতে পারে না। বাংলাদেশ সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশান মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সময় ভিকটিমের নাম, স্বাক্ষীর নাম উল্লেখ করা ছাড়া অভিযোগ গঠন হতে পারে না। ঘটনাস্থল, সময়, তারিখ ইত্যাদি কিছুই সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগে বলা হয়নি। সুতরাং এইসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। এতে প্রমাণ হয় মাওলানা সাঈদী সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া প্রয়োজন।
প্রসিকিউটর হায়দার আলী প্রেসব্রিফিং-এ বলেন, চার্জ গঠনের মত যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি আছে। আদালত অপূর্ণ, অনির্দিষ্ট অভিযোগের ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন করেছে সে সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে এস হায়দার আলী বলেন, আদালত চূড়ান্ত রায় দেয়ার আগ পর্যন্তও তথ্য জানতে চাইতে পারে এবং প্রশ্ন করতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





