মানবাধিকার বর্তমান পৃথিবীতে খুবই উচ্চারিত ও আলোচিত একটি টার্ম। জাতিসঙ্ঘ হতে শুরু করে অনেক এন জি ও মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার। আমরা জানি, মানবাধিকার হল মানুষের সেইসব অধিকার যা মানুষ জন্মসূত্রে লাভ করে, যা ছাড়া একজন মানুষ তাঁর যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা। মানুষ তাঁর এই মানবাধিকার লাভ করে শুধুমাত্র একটি যোগ্যতায় আর তা হল সে মানুষ। মানবাধিকার মানুষকে কেউ দিতে পারেনা কারণ এটা তাঁর জন্মগত। কেউ কোন কারণে কেড়েও নিতে পারেনা। অর্থাৎ কোন কারণে, যেমনঃ লিংগ, বর্ণ, ধর্ম, জাতিভেদে তা নষ্ট হয়না। প্রতিটা মানুষ জন্মগতভাবেই মুক্ত, স্বাধীন, সমান।
মানবাধিকারের আধুনিক দলিলগুলোর মধ্যে ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস, ১৯৪৮ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই দলিলের ১ নং অনুচ্ছেদ বলছেঃ
All human beings are born free and equal in dignity and rights. They are endowed with reason and conscience and should act towards one another in a spirit of brotherhood.
প্রাচীন বা মধ্যযুগের দাসপ্রথা উচ্ছেদে যুগে যুগে বিদ্রোহ হয়েছে। বহু রক্তক্ষরণ হয়েছে। বর্তমান মানবাধিকারের চেতনা বা ধারণা প্রতিফলিত ও প্রতিষ্টিত হয়েছে মূলতঃ টমাস পেইন, স্টুয়ার্ট মিল, হেগেলের মত দার্শনিকদের দর্শনে।
মানবাধিকারের আধুনিক ধারণার কিছু সমালোচনাও রয়েছে। কার্ল মার্কস, জেরেমী বেনথামের মত কিছু দার্শনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, মানবাধিকারের আধুনিক ধারণার ফলে মানুষ বিশেষতঃ অধিকার বঞ্চিত মানুষ তাঁর অধিকার দাবী করতে ভুলতে বসেছে। যখন মানুষ তা দাবী করছে, তাঁকে বলা হচ্ছে, তোমার অধিকার দাবী করার কি আছে, তোমার তো জন্মসূত্রে অধিকার রয়েছেই।
আইন অবশ্য মানুষকে কিছু অধিকার দেয়। এই অধিকারগুলোর সাথে মানবাধিকারের কিছু গুণগত পার্থক্য রয়েছে, যদি ন্যারো সেন্সে চিন্তা করি। অনেকে বলেন, মানবাধিকার শুধু একটা ধারণা মাত্র, যা মানুষের প্রকৃত অধিকারকে পুরোপুরি প্রতিষ্টা করতে অক্ষম। মানবাধিকার নিয়ে যে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক দলিলগুলো রয়েছে, তা শুধু সরকার বা কর্তৃপক্ষকে তাঁর প্রজার বা নাগরিকের অধিকারগুলোকে প্রতিষ্ঠা করতে তাগিদ বা প্রেরণা দেয় মাত্র। সরকারগুলো সেইসব অধিকার রাষ্ট্রীয় আইনে উল্লেখ করে ও কিছু অধিকারকে নিশ্চয়তা দেয়, ঐ রাষ্ট্রের সক্ষমতা বা প্রকৃতি অনুযায়ী।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন হল সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ ঘোষণা দিচ্ছেঃ
“The Republic shall be a democracy in which fundamental human rights and freedoms and respect for the dignity and worth of the human person shall be guaranteed...”
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকারসমূহ’ শিরোনামে একটি চ্যাপ্টার রয়েছে। প্রধান প্রধান মৌলিক অধিকারগুলো হল, বাঁচার অধিকার, আইনের চোখে সমতার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, স্ব স্ব ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার ইত্যাদি।
এই অধিকারগুলো কিন্তু প্রায়শঃই চূড়ান্ত নয়। এদের উপর যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপ করা যায়। যেমনঃ আমার বাকস্বাধীনতা রয়েছে, তাই বলে আমি কি যা খুশি তাই বলতে পারি?
সংবিধানের ২য় ভাগে সন্নিবেশিত রয়েছে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ’। এই অধ্যায়েও কিন্তু আমাদের কিছু অধিকারের কথা রয়েছে। যেমনঃ শিক্ষালাভ বা কর্মের অধিকার, অন্ন বস্ত্রের অধিকার। এগুলো কিন্তু সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এগুলোই তো আমাদের মৌলিক চাহিদা। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র বা সংবিধান এগুলোর কোন নিশ্চয়তা দেয়না। রাষ্ট্র তাঁর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখায়। সরকার এগুলো প্রতিষ্ঠা বা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করে মাত্র।
মৌলিক অধিকার যদি কেউ লঙ্ঘন করে তাহলে যার ক্ষতি হলো সে আদালতে প্রতিকার চাইতে পারে। যেমনঃ যেমনঃ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় আমার প্রতি একটি বৈষম্য করা হল আমি আদিবাসী বলে, বা আমি কালো বলে। আমার বৈধ সম্পত্তি কেউ কেড়ে নিল। আমাকে অযৌক্তিকভাবে কেউ কোথাও আটকে রাখলো। তাহলে আমি আদালতে আইনের আশ্রয় নিতে পারি।
আবার ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ’ কিন্তু আইনের দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়। দেশের সব লোকের চাকরীর ব্যবস্থা হয়না। সব লোক শিক্ষা পায়না। তাই বলে তারা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিতে পারবেনা।
মোটা দাগে অধিকারগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়ঃ ১। অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার, ২। নাগরিক-রাজনৈতিক অধিকার। এদের মধ্যে কোন ধরণের অধিকারকে বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে আধুনিক বিশ্বে। জনগণকে অশিক্ষিত রেখে আইনের সমান আশ্রয় প্রতিষ্ঠা করে ফল পাওয়া যাবে কি? পেটে ক্ষুধা রেখে ভোটাধিকার নিশ্চিত করে লাভ কি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

