কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির এক গ্রামের মেয়ে শাপলা। বাবা দিনমজুর। বড় একটা ভাই আছে, এদিক ওদিক করে কিছু আয়ের চেষ্টা করে। খুব ছোট আরেকটা বোন আছে শাপলার। ব্র্যাকের স্কুলে যায়। অভাবের সংসার। শাপলা তাই গার্মেন্টসে চাকরী করতে যায়। গাজীপুরের মাস্টারবাড়ী।
সেখানে পরিচয় হয় জামালের সাথে। জামাল ভাব জমাতে চায়। শাপলা দেখতে খারাপ না। স্বাস্থ্য ভালো। জামাল তার উপর নজর দেয়; রঙ্গীন স্বপ্ন দেখায়। চাকরীর ফাঁকে সে শাপলাকে টুকটাক আর্থিকভাবে সাহায্য করে। শাপলাও ঘর বাঁধার স্বপন দ্যাখে।
এরপর দুজনে বিয়ে করে। বিয়ের পরপর শাপলা আবিষ্কার করে জামালের আগের ঘরের একটা বৌ ছিল, মারা গেছে টাইফয়েডে, একটা দেড় বছরের বাচ্চা মেয়ে রেখে। জামালের প্রতারণা শাপলা মুখ বুঁজে সহ্য করে। বাচ্চা মেয়ে টুনিকে প্রথম প্রথম তার পর মনে হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে সে বাচ্চাটাকে আপন করে নেয়। টুনি তার মা-কে খুঁজে পায়।
বছর ঘুরে গেছে। জামাল চায়নি, শাপলা সন্তান জন্ম দিক। এর মধ্যে জামাল মৌলভীবাজারের আনজু নামে এক মেয়ের সাথে ভাব করছে। ঘরের লক্ষীকে তার এখন ভালো লাগেনা। মোবাইলে আনজুর সাথে কুটুস কুটুস আলাপ করে। শাপলা টের পায়। জামালের পায়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। জামাল শাপলাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। শাপলা আনজুর মোবাইল নাম্বার যোগাড় করে। আনজুকে তার সংসার না ভাঙ্গতে অনেক অনুরোধ করে।
জামাল খেপে যায়। শাপলার উপর চলে নির্যাতন। শাপলার মন ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়। টুনিকে নিয়ে চলে আসতে চায় বাবার ভিটেবাড়ি। কিন্তু টুনিকে জোর করে রেখে দেয় জামাল। টুনি মা’ মা’ বলে চিৎকার করতে থাকে। শাপলার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মনে হয়। টুনিকে ছাড়া সে কিভাবে বাঁচবে।
বাবার বাড়ী আসলে শাপলাকে নিয়ে মহাসমস্যায় পড়ে যায় শাপলার বাবা। জামালকে মোবাইল করে, নিজে গিয়ে অনুরোধ করে। জামালের মন গলাতে পারেনা। টুনির জন্য শাপলার মন ছটফট করে। রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় বার বার।
ইতিমধ্যে শাপলাকে রেজিশট্রি ডাকযোগে তালাক দেয় জামাল হোসেন। শাপলার বাবাকে কে যেন পরামর্শ দেয় মামলা করতে। শাপলা বাদী হয়ে কোর্টে যৌতুক আর ভরণপোষণের মামলা করে।
মামলার খরচ যোগাতে হিমশিম খায় শাপলার বাবা। আদালত কেন জানি শুধু তারিখ ফেলে লম্বা লম্বা। উকিল ধমকায় বেশী করে টাকা নিয়ে আসতে। শাপলার বাবার মেজাজ খারাপ হয় নিজ মেয়ে শাপলার উপর।
যাহোক, আদালতে শাপলা সাক্ষী দেয়। আসামী জামালের উকিল সাহেব জেরা করেন। তিনি বলেন, “আগের ঘরের বাচ্চা আপনার সহ্য হয়নাই, এইটা নিয়া বনিবনা না হওয়ায় আসামী আপনাকে তালাক দিয়েছে। তালাকের নোটিশ পেয়ে আক্রোশে এই মিথ্যা যৌতুকের মামলা করেছেন”। এটা শুনে শাপলা এজলাসের ভিতর কাঁদতে শুরু করে। উকিল ম্যজিস্ট্রেটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “হুজুর দ্যাখেন, ফরিয়াদী মেকী কান্না আর আবেগ দেখাতে চাচ্ছে”।
তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট ভাবেন, আসামীর উকিলের কথাই ঠিক। তালাক পেয়ে যৌতুকের মামলা করেছে, আসলে যৌতুকের কোন ব্যাপার নাই, আসামীর আগের ঘরের বাচ্চা বাদীর সহ্য হয়নাই, এইটা নিয়া বনিবনা না হওয়ায় যত সমস্যা হয়েছে।
শাপলা বুঝতে পারে কেউ তাকে বুঝতে পারছেনা। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, আমার কিছুই চাইনা, স্বামী সংসার কিছুইনা, ভরণপোষণ দেনমোহর আমার দরকার নাই। আমার খালি টুনিরে ফিরায়া দ্যান স্যার। আমি আপনাগোর পায়ে পড়ি, আমার টুনিরে ফিরায়া দ্যান।
উকিলরা শাপলাকে ধমক দেন, “এই চুপ চুপ”।
তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট এজলাসের ভেতরকার পরিবেশ নষ্টের জন্য প্রচন্ডভাবে বিরক্তবোধ করেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

