
বাংলাদেশের শিক্ষার মান সব সময়ই খারাপ , এটা নতুন কিছু না । তবে পারিপার্শ্বিকতা দেখে মনে হচ্ছে বর্তমান অবস্থা একটু বেশী পরিমাণে খারাপ । আমাদের দেশের শিক্ষাকে সবসময়ই নিম্নমানের ধরা হয় । এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের শিক্ষাকে বিশ্বে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয় , আমাদের তার থেকে একটু নিচু মানের মনে করা হয় । আমাদের দেশের তিন বছরের গ্রাজুয়েশনকে বহির্বিশ্বে এডভান্স লেভেলের এইচ এস সি ধরা হয় , অপরপক্ষে ভারতের তিন বছরের গ্রাজুয়েশনকে গ্রাজুয়েশন হিসেবেই ধরা হয় । এটা বর্তমানের কথা বলছি না , বহু আগে থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে ।
শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে বেশ পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে , যেটা সব দেশেই হয় । কারণ যে কোন বিষয় নিয়ে প্রাটিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া ঐ ব্যবস্থার সুফল এবং কুফল সম্পর্কে সম্যক ধারনা নেয়া সম্ভব নয় । এই শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা সর্বত্র , সমালোচনা তো অবশ্যই দরকার । কিন্তু সমালোচনাটা করছে কারা সেটা দেখার বিষয় । এ নিয়ে তো বেশ ঝড় উঠেছে যেখানে সেখানে , যাদের এই ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান আছে তারা তো করছেই আর যাদের এতোটুকু জ্ঞান নেই তারাও মেতে উঠেছে , " হই হই হরতাল " মনবৃত্তি নিয়ে , যেটা তাদের দলাদলি করার জন্য বেশ মুখরোচক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে । যখন কেউ কিছু না বুঝে " হই হই হরতাল " শুরু করে দেয় তখনই একটা সুষ্ঠু লক্ষ পণ্ড হবার সম্ভাবনা থাকে । যেটা করেছে ঐ বেসরকারি টিভি চ্যানেল । একেবারেই নীতি বিবর্জিত একটি প্রোগ্রাম তারা সমগ্র জাতির সামনে তুলে ধরেছে বেশ কটি অল্প বয়সি ছেলেমের জীবনে কলঙ্ক লেপন করে ।
সৃজনশীল পদ্ধতিটি অত্যন্ত ভালো একটি পদক্ষেপ , কিন্তু সমস্যা হলো সর্বস্থরের শিক্ষকরাই এর যথাযথ ব্যবহার জানে না । আবার সরকার থেকে একটা টার্গেট থাকে প্রতিটি স্কুলের জন্য , যেই টার্গেট সম্পন্ন না করতে পারলে স্কুল গুলো বিভিন্ন রকম সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় । আর তখনই কিছু কিছু স্কুল অসৎ উপায়ে সেই টার্গেট ফুলফিল করতে চায় । এভাবেই শিক্ষার মান আরও খারাপ হতে থাকে । সরকার প্রদত্ত এই টার্গেট তো থাকবেই যেটা এগিয়ে নেবে শিক্ষা ব্যবস্থা , কিন্তু এই পদ্ধতি মনিটর করার জন্য কমিটি গুলো ঠিকঠাক কাজ করছে না বলে মনে হচ্ছে । এভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে ।
আমাদের দেশের একাডেমিক কারিকুলাম আরও পরিবর্তন করতে হবে । পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দুই ধরনের কারিকুলাম অনুসরণ করা হয় সরকারি ভাবে । একটার স্ট্যান্ডার্ড একাডেমিকালি অনেক উন্নত , উন্নত বলতে একটু কঠিন পদ্ধতি , যেটা শুধু তারাই নিতে পারবে যারা ঐ পদ্ধতি কোপ করতে পারবে অর্থাৎ যাদের ঐ পরিমাণ মেধা রয়েছে । আর , আরেকটা একটু সহজ পদ্ধতি - এটাও নির্ণয় করা হয় মেধার ভিত্তিতে । সাধারণত ঐ রাষ্ট্রের ভালো স্কুল বলে পরিচিত স্কুলেই ঐ কঠিন পদ্ধতি বহাল থাকে ।
ইংল্যান্ডে তিন ধরনের একডেমিক বোর্ড রয়েছে , যার প্রত্যেকটার একটার থেকে আরেকটার অনেক পার্থক্য । যেমন , সহজ , মধ্যম এবং কঠিন - এই ভাবে রয়েছে । " এডেক্সসেল" হলো সহজ , " এ কিউ এ" হলো মধ্যম এবং " ও সি র" হলো কঠিন । এই তিনটি বোর্ডেরই আবার আলাদা আলাদা স্তর রয়েছে - এটা স্কুল গুলো ঠিক করে কোন ছাত্রের জন্য কোনটা উপযোগী । কারণ সব ধরনের মানুষই এক রকমের মেধা নিয়ে জন্মায়নি , তাই কম মেধা সম্পন্ন ছাত্রের উপর কঠিন পদ্ধতি থাকাটা জুলুমের পর্যায়ে পরে । আবার সবার জন্য এক ধরনের সাধারণ পদ্ধতি বহাল থাকলেও সেটা একজন তুখড় মেধাবীর মেধাকে বাঁধা গ্রস্থ করা হয় , তাই এই বিভাজন । ইংল্যান্ডে তিন ধরনের স্কুল রয়েছে - একটা হলো সাধারণ স্কুল যেটা কম্প্রিহেন্সিভ স্কুল নামে পরিচিত এবং তারা সাধারণত সহজ এবং মধ্যম কারিকিউলাম বোর্ডের অধীনে থাকে । দ্বিতীয় স্কুল হলো গ্রামার স্কুল এবং তারা অত্যন্ত কঠিন " ও সি র " একাডেমিক পদ্ধতি অনুসরণ করে যেটা হলো অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ এর কারিকিউলাম । যার ফলে ঐ স্কুল গুলোর ছেলে মেয়েরা সাধারণত অক্সফোর্ড , কেম্রিজ সহ রাসেল গ্রুপের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে সক্ষম হয় যেগুলো দেশের সর্ব শ্রেষ্ঠ ইউনিভার্সিটি । আর তৃতীয় হলো প্রাইভেট স্কুল যেটা অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর প্রয়োজনীয়তাকে সূক্ষ্ম বিবেচনায় রেখে তার জন্য টেইলর মেইড কারিকিউলাম ঠিক করে থাকে । প্রতিটি কারিকিউলাম বোর্ডই সৃজনশীল কায়দায় চলে । আর বাংলাদেশে বহাল আছে সবার জন্য একি কারিকিউলাম যেটা সাইন্টিফিক্যালি ভুল একটি পদ্ধতি ।
এখন আসা যাক ঐ ভিডিও ক্লিপটির কথায় , দেশ জুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে , তা না হলে কোন সুস্থ নীতিমালা এই ধরনের ভিডিও তৈরিতে উৎসাহ প্রদান করতে পারে না । দেশে এখনো অস্তিত্বের লড়াই , ক্ষমতার বীভৎস লড়াই চলছে তাই এই স্পর্শকাতর বিষয় গুলো নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই । কোন সভ্য মানুষ এরকম আচরণ করতে পারে না । দেশে ডিফেমেশন আইনটি এখনও সঠিক ভাবে কাজ করে বলে মনে হচ্ছে না । ডিফেমেশন আইনটি একমাত্র সভ্য জাতিরাই অনুসরণ করে । ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে এটি শুধুই বিলাসিতা । যেখানে এখনো মানুষ মানুষের মুণ্ডু কেটে উল্লাস করে , সেখানে এই ধরনের সভ্যতা আশা করাটাই অন্যায় । ভাবতে কষ্ট হয় যে , এখনো মানুষের মন মানসিকতা ২০০ বছর পেছানো । মনে পরে যায় ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনের কথা যখন মানুষ " লুই দা সিক্সটিন" এবং " ম্যারি আন্টনেট" এর মুণ্ডু নিয়ে উল্লাস করেছিল ২০০ বছরেরও আরও আগে । তখন নানা প্রকার বিশৃঙ্খলা দেখে মানুষ সেটার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে হয়তো সমাজ ব্যবস্থার জন্য , গণতন্ত্রের জন্য , কিন্তু ওটা তো ছিল বর্বরচিত আচরণ । আমি এটা বলছি এই কারনে যে আমাদের মন মানসিকতা এখনো অনেক পেছনের দিকে আটকে আছে । শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করতে হবে , এটা ঠিক আছে , তাই বলে এভাবে -- মানুষের জীবন বিপন্ন করে ? তাও আবার ছোট ছোট কতগুলো জীবন নিয়ে , যারা তাদের জীবন শুরু করেছে মাত্র । জীবন শুরুতেই তাদের এভাবে আঘাত না করলেই কি হতো না ? শিক্ষা ব্যবস্থা খারাপ , কিন্তু এর দায়ভার তো নিশ্চয়ই তাদের না ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০১৭ দুপুর ২:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



