কালকে ভয়াবহ গরমের একটা দিন গেলো। যারা আমার মতো জ্যাম আর বাসের ভীড়ে দুই ঘণ্টা বসে থেকে গন্তব্য পৌঁছান তারা আশা করি তা টের পেয়েছেন। সেই অবস্থা পার করে যখন ঘরে পৌঁছালাম, তখনই মনে পড়লো আবার বাইরে বের হতে হবে। গত পরশু কিনে রাখা ফিল্টারের ছাকঁনিটা পাল্টাটে হবে। এমনিতেই মেজাজটা তেতে ছিলো গরমে আরও তিরিক্ষি হয়ে গেলো। গরমে-ঘামে-ভীড়ে সিদ্ধ হয়ে বাসায় ফিরে একটাই চাওয়া ছিলো আর সেটা হলো ঠাণ্ডা পানি একটা লম্বা গোসল দেওয়া। তা না করে এখন যেতে হবে দোকানে, করতে হবে দোকানদারের সাথে খ্যাঁচ খ্যাঁচ। এতই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো আর মেজাজ খারাপ হলে যা হয়, কখনই তা চেপে রাখতে পারি না। সামনে ছিলো আম্মু রাগ গিয়ে পড়লো তাঁর ওপরই (যদিও আম্মুর ওপর রাগ হবার কোন কারণই নেই, জিনিসটা কিনে এনেছি আমিই)। যাই হোক, মেজাজ দেখিয়ে বের হয়ে গেলাম কাজ শেষ করতে। কাজ শেষ করে ফিরেই দেখি আম্মুই আমার রুমে দাঁড়িয়ে আছে ঠাণ্ডা শরবতে একটা মগ হাতে নিয়ে। এই হলো আমার মা।
সাত সকালেই উঠেই বার হতে ঘর থেকে। প্রতিদিনই বের হই ৭টায়। কোনরকমে ঘুম থেকে উঠেই, ঘুম ঘুম চোখে রেডি হয়ে বের হতে হয়। সেই ছোটবেলা থেকেই সাত সকালে স্কুল, তারপর কলেজ তারপর ইনিভার্সিটি তার পর পরই চাকরি, সবই সকালে। কোনদিন এমন হয়নি বের হবার আগে টেবিলে নাস্তা ছিলো না। প্রতিদিনই নাস্তাটা টেবিলে রেডি পেয়েছি, চায়ের কাপটা পিরিচ দিয়ে ঢাকা পেয়েছি। আমার হয়তো কোন কোন দিন দেরি হয়ে যায় ঘুম থেকে উঠতে কিন্তু আম্মুর তা কোনদিনই হয়নি। কখনো এটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাও করিনি। সবসময় পেয়ে পেয়ে মনে হয়েছে এটাই তো স্বাভাবিক। এর পেছনে আম্মুর শ্রম আর নিষ্ঠাকে কী নিষ্ঠুরের মতো করেই না অবজ্ঞা করে গেছি !!!
আমরা অনেক গুলো ভাই-বোন, আমি ছাড়া সবাই পড়া-লেখা করে। সারাদিন তাই আম্মুর নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও নাই। এই ওকে স্কুলে নিয়ে গেলো তো আর একজনকে গোসল করানোর সময় হয়ে গেলো তারপর আবার তাকে স্কুলে পাঠানো। ২য় জনকে স্কুলে পাঠাতে পাঠাতেই ১ম জনকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়ে যায়। অন্যদের কলেজ, পরীক্ষা, স্যারের বাসায় পড়া এইসব তো আছেই সারাদিন ধরে। সারাটা দিন আমার মায়ের তাই কোন ফুসরত নেই। এভাবেই চলছে দিন। কোন কিছুতেই আমাদের যেন অসুবিধা না হয় তারই নিরন্তর চেষ্টা আম্মুর। কোনদিনও তো ভাবি না, এই শ্রমটার কতখানি মূল্য দিতে পারছি আর কতখানি সার্থক করে তুলতে পারছি। তারপরও আম্মুর ক্লান্তি নাই। এইসব চিন্তাও বোধ হয় করে না কখনো। কী পেলো আর কী পাওয়ার কথা ছিলো। আমরা সন্তানেরা কতই না নিষ্ঠুর সেই মায়ের সাথে একটু বসে কথা বলারও সময় নেই আমাদের।
কালকে মা দিবসে সবাই কত কিছু তো করলো, অনেক কিছুই লিখলো আর আমি ঘরে ফিরেই বিশ্রী একটা মেজাজ দেখালাম। আমি জানি আম্মু হয়তো কিছুই মনে রাখবে না, হয়তো এটাকে দোষও ধরবে না। মায়েরা তো এমনি হয়। তারপরও ক্ষমা চাচ্ছি আম্মু তোমার কাছে। আমার সব ভাই-বোনের পক্ষ থেকে। যত অপরাধই করি না কেন, তুমি শুধু পাশে থেকো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

