উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেলে আনন্দেরও সীমা থাকে না। তবে পূরণ হওয়া সেই স্বপ্ন হঠাৎ নস্যাৎ হয়ে যাওয়ায় তা এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা স্নাতক ভর্তি পরীক্ষায় চূড়ান্ত উত্তীর্ণ হওয়া ৯৭৫ জন শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কখনো যা ঘটেনি, এবার সেটিই যেন ঘটল। ‘গ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা, প্রথম দফায় ফল, এরপর আবার মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ, সর্বশেষ ফল বাতিল করে আবার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত—সবই যেন এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
স্বপ্নভঙ্গের খবরে তাই শিক্ষার্থীরা ছিলেন ক্ষুব্ধ। গতকাল রোববার তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করেছেন। পরে তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে ফল বহাল রাখার দাবি জানান। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ফের পরীক্ষা নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ, যাঁরা ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁরা এত বেশি ভুল করে ফেলেছেন যে ফের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর এর মাধ্যমেই কেবল ন্যায়বিচার সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। যারা ভর্তি-প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে অনেক বেশি ভুল হয়ে গেছে। এখন স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই ফের পরীক্ষা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমেই সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমাদের হাতে অন্য কোনো উপায় নেই। কারণ, আগের ফল রাখলে অনেক শিক্ষার্থী বঞ্চিত হবে। কাজেই আমরা সবার জন্যই সমান সুযোগ রাখতে চাই। আমরা মনে করি, যারা মেধাবী তারা যতবারই ভর্তি পরীক্ষা দেবে ততবারই চান্স পাবে।’
কাদের ভুলে শিক্ষার্থীদের এমন ঘটনা ঘটল, জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। যেসব শিক্ষকের ভুলের কারণে এমনটি হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
স্বপ্নপূরণ ও স্বপ্নভঙ্গ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে গত ২৮ অক্টোবর ‘গ’ ইউনিটে ৯৭৫টি আসনের বিপরীতে ৩৮ হাজার ৮৫৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। ৩১ অক্টোবর ফল প্রকাশ করা হলে দুই হাজার ৭২৭ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। কিন্তু এই ফল নিয়ে অভিযোগ উঠলে ২ নভেম্বর পুনর্মূল্যায়িত ফল প্রকাশ করা হয়। সেখানে পাস করেন ছয় হাজার ৯৪ জন শিক্ষার্থী। তবে বাদ পড়ে যান প্রথমবার মেধাতালিকায় থাকা ১৯৪ জন শিক্ষার্থী।
ওই সময় বাণিজ্য শিক্ষা অনুষদের ডিন ও গ-ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার প্রধান সমন্বয়কারী জামাল উদ্দিন আহমেদ ফল পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বলেছিলেন, পরীক্ষা কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরপত্রের মোট ১২টি উত্তরে অসংগতি পায়। এর মধ্যে ছয়টি প্রশ্নে সঠিক উত্তরই ছিল না। আর বাকি ছয়টি প্রশ্নের মূল্যায়ন হয় ভুল উত্তর দিয়ে। সঠিক উত্তর না থাকা ছয়টি প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর সব পরীক্ষার্থীকেই দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে শনিবার রাতে ফল বাতিলের সিদ্ধান্তের পর থেকেই তাঁর মুঠোফোন বন্ধ। অনুষদের কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
ফল বাতিল, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা: ২ নভেম্বর দ্বিতীয়বার প্রকাশিত ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবার আবেদন করেন শতাধিক শিক্ষার্থী। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার রাতে ডিনস কমিটির জরুরি সভা ডাকা হয়। সেখানেই ফল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা বিক্ষোভ করেছেন।
গতকাল রোববার সারা দিন কয়েক শ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন। দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে তাঁরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। এ সময় বাতিল করা ফলাফলে মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনেরও হুমকি দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে রাখার পর তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও পুলিশের হস্তক্ষেপে স্থান ত্যাগ করেন।
নাজমুল সাকিব নামে এক ছাত্র প্রথম আলোকে বলেন, ৩১ অক্টোবরের প্রথম ফলাফলে তিনি ৩০১তম হন। এরপর পুনর্মূল্যায়িত ফল প্রকাশ করা হলে তিনি ১৫৭তম হন। সাকিব বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চিতভাবে ভর্তি হতে পারব ভেবে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৩৪৯তম হয়েও সেখানে ভর্তি হইনি। ২৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রবেশপত্র তুলিনি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও হয়ে গেছে। আমি এখন কী করব?
কাজ করেনি তদন্ত কমিটি: ‘গ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ভুল উত্তর দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং সঠিক উত্তরবিহীন প্রশ্নপত্র সরবরাহের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ৩ নভেম্বর কোষাধ্যক্ষ মীজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ১৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ করেনি কমিটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মীজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আরও তিনজন সদস্যকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার কমিটি প্রথমবারের মতো সভায় বসবে।
শিক্ষকদের ভুল: ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ সূত্রে জানা যায়, ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র তৈরিতে অনুষদের আটটি বিভাগের ১৬ জন শিক্ষক কাজ করেন। এর মধ্যে আটজন হলেন আটটি বিভাগের চেয়ারম্যান। অনুষদের ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের বাংলা ও ইংরেজি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের দুজন অভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে করানোর কথা। কিন্তু তাঁরা তা না করে অনুষদেরই দুজন শিক্ষককে দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেন। আর এ কারণেই প্রশ্নপত্রে ভুল হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান মীজানুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ভর্তি-প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত শিক্ষকেরা চরম দায়িজ্ঞানহীনভাবে কাজ করেছেন।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

