রাজনৈতিক দাবি আদায়ের অন্যতম মাধ্যম হরতাল-অবরোধ দেশের অসামান্য ক্ষতি ডেকে আনছে। সাধারণ মানুষের প্রাণহানী ছাড়াও ধ্বংস হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এমনিতেই আমরা দারিদ্রতায় তৃতীয় বিশ্বের কাতারে পড়ে আছি। এর উপর মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে রাজনীতিক দাবি আদায়ের অস্ত্র হরতাল-অবরোধ আমাদেরকে আরো পিছিয়ে দিচ্ছে। কিছুদিন পরপরই ফিরে আসছে হরতাল-অবরোধের মত এসকল ধ্বংসাত্মক রাজনীতিক কর্মসূচি। এমতাবস্থায় আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করার প্রস্তাবনা উঠছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে। অবশ্য এই দাবি নতুন নয়, অনেক দিন থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহল আলোচনা করে আসছিল। কিন্তু ইদানীং এসব কর্মকাণ্ড ঘনঘন ফিরে আসা ও এসবের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ চূড়ান্ত আকার ধারণ করায় বিষয়টি জোরালো আকার ধারণ করেছে। হরতাল-অবরোধ বন্ধে আইন করার ব্যাপারে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। তারা ইতোমধ্যে আইনি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি কমিটিও গঠন করেছে। এ বিষয়টির পক্ষে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও আলাপ-আলোচনা উঠছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যখন যে দল ক্ষমতায় যায় তখন সে দলই নিজেদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে এ ধরনের কথা বলে থাকে। কিন্তু তারাই যখন আবার বিরোধীদলে অবস্থান নেয় তখন উল্টো দাবি করে বলে থাকে যে হরতাল-অবরোধ করে দাবি আদায় তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সুতরাং আপাতত ক্ষমতাসীন দল হরতাল-অবরোধের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও বিরোধী পক্ষ তা মানতে চাইবে না। তাছাড়া যদি এসবের আইন করাও হয় তাতেই বা কী লাভ? হরতাল-অবরোধে মানুষের জান-মালের ক্ষতি হওয়া, নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হওয়া, বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হওয়ার মত এই বিষয়গুলোর প্রতি বিরোধীপক্ষ কি সজাগ নয়? এদেশে তারাও কি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা পরিচালনা করেন না? অবশ্যই যারা বিরোধী দলে থাকে এদেশে তাদেরও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। তাদেরও ক্ষতি হয়। তাদের স্বজনদেরও প্রাণহানী ঘটে। তারপরও জেনে বুঝেই তারা এসব চালিয়ে যান। এক কথায় বলতে গেলে যেহেতু ক্ষমতায় গেলে তারা হরতাল-অবরোধের ক্ষতিকর দিক বুঝতে পারেন, সেহেতু বিরোধী দলে গেলেও তারা সেটা অবশ্যই বোঝেন। কিন্তু বুঝেও তারা গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে সেই অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন। সুতরাং নতুন করে আইন বানিয়ে তাদের মূল্যবোধে, বিশ্বাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করা যাবে কী? যেহেতু তারা এসবের ক্ষতিকর দিক বুঝেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তোয়াক্কা না করে সুযোগ পেলেই মানুষের ক্ষতি করে, সেহেতু আইন করা হলে সেই আইনকেও তারা তোয়াক্কা করবে না এটা জোর দিয়ে বলা যায়।
সুতরাং যতদিন রাজনীতিক নেতা-কর্মীরা নৈতিকভাবে এসব কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করে তা থেকে নিজেদেরকে বিরত না রাখবে, ততদিন শক্তিশালী আইনও তাদেরকে বিরত রাখতে পারবে না। যারা নিজেদের মনের আইন, বিবেক ও মূল্যবোধকে অস্বীকার করে মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে না, তাদের জন্য রাষ্ট্রের কঠিন আইনও বড় ধরনের কোন বাধা নয়। তাই আগে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। অবশ্য আইনেরও দরকার আছে, তবে তাকে চলতে হবে মূল্যবোধের সমান্তরালে। মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে যেসব মজ্জাগত অপরাধী থাকে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হতে হবে আইনের কঠোরতা। অন্যথায় সে আইন পরিণত হবে বিরোধীপক্ষকে নির্মূলে ক্ষমতাশীলদের অস্ত্রে। বিরোধীরা যাকে কখনোই সম্মান করবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


